সমস্ত বিতর্ক ও সামাজিক গোঁড়ামির দেয়াল ভেঙে কলম্বিয়ার জাতীয় সংসদে সিনেটর হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেছেন সাবেক প্রাপ্তবয়স্ক ছবির অভিনেত্রী ডেইসি আলিজান্দ্রা ওমানিয়া অরতিজ। বামপন্থী রাজনৈতিক দল ‘হিস্টোরিক প্যাক্ট’-এর প্রার্থী হিসেবে দেশটির রাজধানী বোগোটা থেকে তিনি জয়লাভ করেন।
গত ২০ জুলাই (সোমবার) এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে তিনি শপথ নেন। নীল ছবির শিল্পে কাজ করা তরুণ-তরুণী ও প্রাপ্তবয়স্ক কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য শ্রম অধিকার প্রতিষ্ঠা, সামাজিক সুরক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আদায়ের সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার নিয়েই রাজনীতিতে তার এই ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন।
৩৩ বছর বয়সী এই রাজনীতিক বিনোদনজগতে ‘আমারান্তা হ্যাংক’ নামে পরিচিত হলেও পেশাগত জীবনের শুরুতে তিনি একজন পেশাদার সাংবাদিক ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি অ্যাডাল্ট কনটেন্ট ক্রিয়েশনে যোগ দেন এবং সেখানে মাত্র দুই বছর কাজ করার পর রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। নির্বাচন চলাকালে এক প্রচারণামূলক ভিডিওতে ওমানিয়া বলেন, এই ইন্ডাস্ট্রির নারীরা বছরের পর বছর ধরে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষাহীনতায় ভুগছেন। কারণ ভুল তথ্য, কুসংস্কার এবং সামাজিক দ্বিমুখী নীতির কারণে কেউই এই খাতটিকে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের মধ্যে আনার উদ্যোগ নেয়নি। তিনি আরও জানান, অন্যান্য স্বাভাবিক পেশার মতো এই খাতের কর্মীদের জন্যও নির্দিষ্ট নীতিমালা ও সঠিক শ্রম অধিকার নিশ্চিত করাই তার প্রধান লক্ষ্য।
বিগত জীবনের কাজের কারণে নির্বাচনজুড়ে তীব্র সমালোচনা ও কটাক্ষের মুখোমুখি হতে হলেও তা দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবিলা করেছেন ওমানিয়া। নিজের রাজনৈতিক অবস্থান পরিষ্কার করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, যে নারী একসময় প্রাপ্তবয়স্ক বিনোদনশিল্পে যুক্ত ছিলেন, তিনি কেন জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না? তিনি যোগ করেন, আমার এই জীবন অভিজ্ঞতা আমাকে সামাজিক বৈষম্য, স্বাধীনতার লড়াই এবং সাধারণ অর্থনীতির বাস্তবতা গভীরভাবে বুঝতে শিখিয়েছে। আর এই যুক্তিগুলোকেই আমি এখন সরাসরি আইনসভার বিতর্কে তুলে ধরার অঙ্গীকার করছি। আসল সমস্যা হলো, সমাজ আড়ালে প্রাপ্তবয়স্ক ছবি উপভোগ করে, কিন্তু ক্ষমতার আসনে আমাদের মতো মানুষদের কথা বলার অধিকার দিতে চায় না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ওমানিয়া রাজনীতিতে আসা প্রথম অ্যাডাল্ট তারকা নন। ইতালি পার্লামেন্টের সাবেক নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি ইলোনা স্ট্যালের (মঞ্চনাম ‘চিকিওলিনা’) উদাহরণ টেনে ওমানিয়া নিজেকে সেই ধারারই অংশ বলে উল্লেখ করেন। তা ছাড়া ইতালির মোয়ানা পজ্জি কিংবা ২০১৮ সালে ব্রাজিলের সাঁও পাওলো থেকে নির্বাচিত ফেডারেল ডেপুটি আলেকজান্দ্রে ফ্রোতার মতো ব্যক্তিত্বরাও অতীতে এই শিল্প থেকে এসে সফল রাজনীতি করেছেন।
নিজের বিজয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ওমানিয়া বলেন, রাজনৈতিক রূপান্তরের একটি বড় প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা পৌঁছাতে এখনও দীর্ঘ পথ বাকি। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, পরিবর্তনটি ইতিবাচকভাবে শুরু হয়েছে।
কেবল প্রাপ্তবয়স্ক শিল্পের কর্মীদের অধিকার রক্ষাই নয়, ওমানিয়ার রাজনৈতিক কর্মসূচিতে স্থান পেয়েছে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন ও যৌন নির্যাতন প্রতিরোধের মতো বৈশ্বিক ইস্যুগুলোও। কলম্বিয়ার দারিদ্র্যপীড়িত কুভুটা অঞ্চলে বেড়ে ওঠা ওমানিয়ার শৈশব ও কৈশোর ছিল কঠিন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে একটি নাইটক্লাবে কাজ শুরু করলেও লেখার প্রতি ছিল তার প্রবল ঝোঁক। তবে পরবর্তীতে রাজনীতিকেন্দ্রিক কলাম লেখার কারণে তাকে প্রাণনাশের হুমকির মুখেই পড়তে হয়েছিল। অবশেষে নীল ছবির একটি শুটিংয়ে সহশিল্পীদের এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া এবং সেখানে নানা অনিয়মের কথা জানতে পেরে তিনি সেই জগত চিরতরে ত্যাগ করে জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করার কঠোর সিদ্ধান্ত নেন।
সূত্র: এওএল