নবাব সিরাজউদ্দৌলার উত্তরসূরিদের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ও অধিকারের প্রশ্ন

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন। পলাশীর রণাঙ্গনে পরাজয়ের পর দীর্ঘ দুইশত বছর ইংরেজদের গোলামির জিঞ্জিরে আবদ্ধ ছিল এই উপমহাদেশ। আজ আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক হলেও, যে নবাব এই মাটির জন্য প্রথম জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তার বংশধরেরা আজ কতটা মূল্যায়িত? ২৩ জুন পলাশী দিবসের প্রাক্কালে এই প্রশ্নটি আবারও সামনে এসেছে। বাংলাদেশে আজ ইতিহাস বিকৃতি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা আর উদাসীনতার এক অদ্ভুত মিশেলে উপেক্ষিত রয়ে গেছেন শেষ স্বাধীন নবাবের উত্তরসূরিরা।

সারাবাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নবাব সিরাজউদ্দৌলার নবম বংশধর নবাবজাদা আলি আব্বাসউদ্দৌলা যে মর্মবেদনা ও আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন, তা আমাদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক দীনতাকেই ফুটিয়ে তোলে।

সম্মাননার বদলে নিপীড়ন:

নবাব সিরাজউদ্দৌলার নবম বংশধর নবাবজাদা আলি আব্বাসউদ্দৌলা আক্ষেপ করে বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশ তাদের রাজপরিবারকে সম্মান দিলেও বাংলাদেশে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে সম্মান তো দূরের কথা, উলটো তাদের নানাভাবে উত্ত্যক্ত করে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার, পাকিস্তান সরকার আমাদেরকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার এবং পরবর্তীতে হিন্দুস্থান সরকার এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ আমাদেরকে স্বীকৃতি ও সম্মাননা দিয়েছেন। আমাদেরকে স্বাধীন বাংলাদেশে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সরকার স্বীকৃতি দিয়েছেন। কিন্তু আমরা স্বীকৃতি চাইনি, নবাব বংশধরদের একটা সম্মানজনক অবস্থানে নেওয়ার বিষয়টি আমি চেয়েছি।’

নবাবজাদা আলি আব্বাসউদ্দৌলার অভিযোগ, বিগত দীর্ঘমেয়াদি হিন্দুস্থান সমর্থিত আওয়ামী সরকারের আমলে নবাবের পরিবারকে ন্যূনতম রাষ্ট্রীয় সম্মান দেওয়া তো দূরের কথা, বরং নানাভাবে হেনস্তা ও উত্ত্যক্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘যখনই আমি নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে নিয়ে কাজ করা এবং জনসমক্ষে প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরা শুরু করি, তখন তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী আমাকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ভাবতে শুরু করে। নবাবের স্মৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষা করতে গিয়ে চরম আক্রোশের শিকার হতে হয় আমার পরিবারকে। ২০১৭ থেকে ২০২০ সালে আমার আব্বা- নবাবের অষ্টম বংশধর বিশিষ্ট প্রকৌশলী সৈয়দ গোলাম মোস্তফাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে একাধিকবার সড়ক দুর্ঘটনার মুখোমুখি করানো হয়। একটা বয়োবৃদ্ধ মানুষকে বারবার গাড়ি দিয়ে ধাক্কা দিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল, যার দায় রাষ্ট্র কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। ২০২০ সালের পবিত্র রমজান মাসে ঈদ পূর্ববর্তী দিনে হিন্দুস্থান সরকারের ইন্ধনে আমাদের ফ্ল্যাটে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।’

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে রাজবংশদের সম্মাননায় আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে?:

ঐতিহাসিক ও বিশ্লেষকদের মতে, বিগত দুইশত বছরের ঔপনিবেশিক শাসন এবং পরবর্তীকালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে বাংলার আসল ইতিহাস বারবার বিকৃত হয়েছে। ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মতে, বাংলার প্রকৃত ইতিহাস বছরের পর বছর ধরে বিকৃত করা হয়েছে। যার ফলে জাতি তার শ্রেষ্ঠ বীরদের সঠিক মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে।

ইতিহাস ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুহাম্মদ তারিক চৌধুরী বলেন, ‘যেহেতু আমরা নবম বংশধর দেশপ্রেমী আব্বাসউদ্দৌলাকে পেয়েছি, আমরা একটু সারা বিশ্বের দিকে তাকাই, জাপানের সম্রাট রাজাকে দেখি বা ব্রিটেনে যদি দেখি, তারা কিন্তু একটা ক্ষমতাও ভোগ করছে, আবার সম্মানও পাচ্ছে, দুদিক থেকেই। আবার অন্যদিক থেকে যদি আমরা ইউরোপে তাকাই যেমন স্পেন, পর্তুগাল, সুইডেন, এসব দেশের রাজা বা রানি কিন্তু এখনো আছেন। জাতি বা রাষ্ট্র তাদেরকে সম্মান দেয় এবং সম্মানের জায়গায় ধরে রেখেছে। ঠিক একইভাবে পাকিস্তান সরকারও কিন্তু জাতীয়ভাবে তৎকালীন যে মুঘল সম্রাটের অধীনে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুসলিম রাজারা ছিল, তাদেরকে সাংবিধানিকভাবে সাপোর্ট দিচ্ছে। যেমন তারা চিকিৎসা ফ্রি করে দিয়েছে, লেখাপড়া ফ্রি করে দিয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে দুর্ভাগ্য এবং দুঃখজনক ঘটনা আমরা বাংলাদেশি না নবাব পরিবারের জন্য কিছু করতে পেরেছি , না ঢাকার তরুণ নবাব আলি আব্বাসউদ্দৌলার জন্য কিছু করতে পেরেছি।’

নবাব সিরাজউদ্দৌলার উত্তরসূরিকে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার আহ্বান:

নবাব সিরাজউদ্দৌলার ৮ম ও ৯ম বংশধর পিতা পুত্র ইঞ্জিনিয়ার সৈয়দ গোলাম মোস্তফা ও নবাবজাদা আব্বাসউদ্দৌলাদের দৃঢ়তা ও দেশপ্রেমের প্রশংসা করে এ বিষয়ে গবেষক ও বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ মুহাম্মদ নুরুল হুদা ডিউক সারাবাংলাকে বলেন, ‘এটা তো পৃথিবীর প্রতি জায়গাতেই আছে। আপনি দেখবেন যে রাজ পরিবারকে আলাদাভাবে তারা সম্মানিত করে, তাদেরকে ক্ষমতা অংশীদার করে, তাদের পরামর্শ নেয়, তাদের পরামর্শে রাষ্ট্র চলে, শুধু ব্যতিক্রম আমরা বাংলাদেশেই দেখছি যে, যে রাজপরিবার বাংলা, বিহার, উড়িষ্যাকে চালিয়েছে, তাদেরকে মাইনাস করে আমরা রাষ্ট্র পরিচালনা করছি। এতে তো আমরা উপকৃত হচ্ছে না, আরও আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি, তো এইগুলা চিন্তা করে আমি মনে করব, তাদেরকে রাজকার্যে, রাষ্ট্রের কার্যে, রাষ্ট্র পরিচালনায় অবিলম্বে সম্পৃক্ত করা হোক।’

তিনি আরও বলেন, ‘নবম বংশধরের জন্য আমাদের অবশ্যই করণীয় ছিল যে তারা যেহেতু রাজবংশ, রাজবংশের রাজত্ব তারা পরিচালনা করবে। আমি নতুন সরকার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে বলবো- নবাব সিরাজউদ্দৌলা প্রজন্ম আব্বাসউদ্দৌলাকে সত্যিকারভাবে মর্যাদা দিয়ে যদি দেশ পরিচালনা করার সুযোগ দেওয়া যায়, সেটা অনেক সম্মানজনক হবে। যদিও উনারা উপদেষ্টা পরিষদও গঠন করে ফেলেছেন। আমি বলবো যে নবাবজাদা আলি আব্বাসউদ্দৌলাকেও, উপদেষ্টা পরিষদে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য। অতএব তাকে যদি আমরা উপদেষ্টা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করি, পরবর্তী সরকার আসলে সেই সরকারের সাথে অন্তর্ভুক্ত করি, সেটা অনেক সম্মানজনক হবে।’

রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ও পুনর্বাসনের রূপরেখা: বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাবনা

বিশিষ্টজন ও গবেষকদের তরফ থেকে নবাবের পরিবারের জন্য বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট দাবি ও প্রস্তাবনা উঠে এসেছে:

নবাব পরিবারের জন্য প্রস্তাবিত রাষ্ট্রীয় অধিকার।
জাতীয় উপদেষ্টা পরিষদে অন্তর্ভুক্তকরণ (যোগ্যতার ভিত্তিতে)।
জাতীয় দিবসসমূহে (স্বাধীনতা, বিজয়, ঈদ) রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণ।
সরকারি প্লট বা বাসস্থান বরাদ্দ ও সম্মানজনক সাইনবোর্ড স্থাপন।
রাষ্ট্রীয়ভাবে মাসিক সম্মাননা ভাতা ও চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিতকরণ।
অধ্যাপক ডক্টর রমিত আজাদ, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, ইতিহাস ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক এ প্রসঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্মরণ করিয়ে দেন। জিয়াউর রহমান যেভাবে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে ভারত থেকে বাংলাদেশে এনে জাতীয় কবির মর্যাদা দিয়েছিলেন, পুনর্বাসনের জন্য ধানমন্ডিতে বাড়ি এবং সরকারি ভাতার ব্যবস্থা করেছিলেন, ঠিক একই মডেলে নবাব সিরাজউদ্দৌলার প্রকৃত বংশধর নবাবজাদা আলি আব্বাসউদ্দৌলাকেও মূল্যায়ন করা উচিত।

রমিত আজাদ বলেন, ‘নবাবের উত্তরসূরিরা আজ যদি চরম অর্থকষ্টে, অবহেলায় ও অমর্যাদায় দিনাতিপাত করেন, তবে সেটি কোনো ব্যক্তির ব্যর্থতা নয়, বরং গোটা জাতির জন্য একটি চরম ‘ডিসক্রেডিট’ বা কলঙ্কের বিষয়। তাদের বাসস্থানের সামনে যদি একটি রাষ্ট্রীয় সাইনবোর্ড থাকে যে ‘এখানে নবাবের উত্তরসূরিরা বাস করেন’, তবে তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল হিসেবে গণ্য হবে।’

শেষ কথা

পলাশী দিবসের এই ঐতিহাসিক ক্ষণে দাঁড়িয়ে আজ নীতিনির্ধারক ও সুশীল সমাজের কাছে একটিই বড় প্রশ্ন, রাষ্ট্র কি আসলেই এই রাজবংশ বাংলার ঐতিহ্যবাহী নবাব পরিবারকে তাদের প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা ফিরিয়ে দেবে? নাকি রাজনৈতিক স্বার্থে ইতিহাসের পাতা থেকে তাদের ‘মাইনাস’ বা মুছে ফেলার এই দীর্ঘদিনের অন্যায় ধারা চলতেই থাকবে?

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন