বাংলা সাহিত্যের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের সঙ্গে ময়মনসিংহের ত্রিশালের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও আবেগময়। তাঁর শৈশব-কৈশোরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কেটেছে এ জনপদে। ত্রিশাল শুধু তাঁর অস্থায়ী আশ্রয়স্থল ছিল না; বরং এখানকার প্রকৃতি, জনজীবন, লোকসংস্কৃতি, সংগীতধারা ও গ্রামীণ পরিবেশ তাঁর মানস গঠনে বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল। আজও ত্রিশালের মানুষ নজরুলকে নিজেদের ঘরের মানুষ বলেই মনে করেন। স্থানীয় স্মৃতি, গবেষণা ও বিভিন্ন সূত্রে ত্রিশাল-পর্বকে নজরুলজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, ১৯১৪ সালের জুন মাসে নজরুল ত্রিশালে আসেন এবং ১৯১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এখানে অবস্থান করেন। তাঁকে ত্রিশালের কাজীর শিমলা গ্রামে নিয়ে আসেন দারোগা কাজী রফিজউল্লাহ। এ সময়ই নজরুল পূর্ববঙ্গের প্রকৃতি, ভাষা, মানুষের জীবনযাপন ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হন। পরে তিনি দরিরামপুর স্কুলে ভর্তি হন এবং সেখানকার পাঠজীবন তাঁর প্রতিভা বিকাশে ভূমিকা রাখে। তাঁর ছাত্রজীবন সম্পর্কে স্থানীয়ভাবে নানা স্মৃতিচারণা প্রচলিত আছে, যেগুলোতে তাঁর মেধা, দ্রুত অনুধাবনক্ষমতা ও সাহসী স্বভাবের উল্লেখ পাওয়া যায়।
কাজী রফিজউল্লাহর পরিবারের সঙ্গে নজরুলের পরিচয়ের পেছনে তাঁর ভাই কাজী আবুল হোসেনের নামও আলোচনায় আসে। বিভিন্ন স্মৃতিতে বলা হয়, ছাত্রজীবনে আবুল হোসেনের সঙ্গে নজরুলের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে এবং সেখান থেকেই রফিজউল্লাহ পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় হয়। এসব স্মৃতির কিছু অংশ মৌখিক বয়ানে সংরক্ষিত, তাই সবকিছু দলিলভিত্তিক না হলেও এ কথা নিশ্চিত যে ত্রিশালে নজরুল একটি সহায়ক পারিবারিক ও শিক্ষাগত পরিবেশ পেয়েছিলেন। আর্থিক সংকট তাঁর শিক্ষাজীবনে বারবার বাধা সৃষ্টি করেছিল; সেই প্রেক্ষাপটে ত্রিশালের এই আশ্রয় তাঁর জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
ত্রিশালে অবস্থানকালে নজরুল প্রথমে কাজীর শিমলা গ্রাম থেকে দরিরামপুর স্কুলে যাতায়াত করতেন। সে সময় গ্রামীণ সড়কব্যবস্থা অত্যন্ত অনুন্নত ছিল। বর্ষাকালে কাদা, জলাবদ্ধতা ও দুর্ভোগের মধ্যে তাঁকে স্কুলে যেতে হতো। পরে দূরত্ব ও যাতায়াতের কষ্টের কারণে তিনি বটতলা নামাপাড়ার বিচুতিয়া ব্যাপারীর বাড়িতে জায়গির বা লজিংয়ে থাকতেন বলে স্থানীয় সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। এই বটতলা অঞ্চল পরবর্তীকালে নজরুল-স্মৃতিবাহী স্থান হিসেবে বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। ত্রিশালের বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন, লোককথা ও সাংস্কৃতিক বয়ানে এ এলাকার গুরুত্ব এখনো অটুট।
ত্রিশালের সঙ্গে নজরুলের সম্পর্কের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো এখানকার লোকজ পরিবেশ। স্থানীয় লোকজনের মুখে মুখে শোনা যায়, তিনি বটগাছতলায় বসে বাঁশি বাজাতেন, সুতিয়া নদীর পাড় ধরে হাঁটতেন, গ্রামীণ সুর ও মানুষের জীবনযাপন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন। এমনও বলা হয় যে তিনি যাত্রাপালা, কবির লড়াই ও লোকসংগীতের আসরে আকৃষ্ট হতেন। এসব স্মৃতির সবটুকু নথিভুক্ত না হলেও, এগুলো নিয়ে ত্রিশালের মানুষের মনে নজরুলকে ঘিরে যে আবেগ ও ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে, তার পরিচায়ক। নজরুলের কাব্যে লোকজ সুর, মানবিক বোধ ও মাটির গন্ধের যে শক্তিশালী উপস্থিতি দেখা যায়, তার পেছনে এমন অভিজ্ঞতার ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না।
ত্রিশালে নজরুলের পড়াশোনাও বেশ ভালো চলছিল বলে বিভিন্ন স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে। স্থানীয়ভাবে এমন কথাও প্রচলিত আছে যে কোনো এক শিক্ষকের সঙ্গে মনোমালিন্যের জেরে তিনি গভীর অভিমানে ত্রিশাল ত্যাগ করেন এবং পরে আর ফিরে আসেননি। যদিও এ ঘটনার পূর্ণ দলিলভিত্তিক ব্যাখ্যা পাওয়া কঠিন, তবু এটুকু স্পষ্ট যে ত্রিশাল তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। কারণ, পরবর্তী জীবনে তিনি ময়মনসিংহের প্রতি মমতা ও ঋণস্বীকারের কথা স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেছেন।
১৯২৬ সালের ১৭ জানুয়ারি ময়মনসিংহ টাউন হলে জেলা কৃষক ও শ্রমিক সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার জন্য কাজী নজরুলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। অসুস্থতার কারণে তিনি উপস্থিত হতে পারেননি, তবে ময়মনসিংহের প্রতি তাঁর টান ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে একটি আবেগঘন বার্তা পাঠান। সেখানে তিনি লিখেছিলেন যে তাঁর বাল্যকালের অনেকগুলি দিন বৃহত্তর ময়মনসিংহের বুকে কেটেছে এবং সেই স্মৃতি তাঁর মনে আজও উজ্জ্বল। এ বক্তব্য নজরুলের ত্রিশাল-সংযোগের ঐতিহাসিক মূল্য আরও দৃঢ় করে।
বর্তমান ত্রিশাল তাই শুধু একটি উপজেলা নয়; এটি নজরুলস্মৃতির এক জীবন্ত ভূখণ্ড। কাজীর শিমলায় নজরুল স্মৃতিকেন্দ্র, বটতলা-নামাপাড়ায় স্মৃতিবাহী স্থান এবং দরিরামপুর স্কুল-সংলগ্ন নজরুলচর্চা—সব মিলিয়ে ত্রিশাল জাতীয় কবির স্মৃতিকে বহন করে চলেছে। এখানকার মানুষ নজরুলজয়ন্তী উদ্যাপন, আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সংগীত ও নাটকের মাধ্যমে তাঁর স্মৃতিকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে দিচ্ছে।
ত্রিশালের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক অর্জন নিঃসন্দেহে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারি ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, এর প্রাথমিক দাবি উত্থাপিত হয়েছিল বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিদ্বৎসমাজ ও সাংস্কৃতিক মহল থেকে। পরে এটি ২০০৪ সালে একটি প্রকল্প হিসেবে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২০০৬ সালে জাতীয় সংসদে প্রণীত আইনের মাধ্যমে এটি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয় এবং পরের বছর ১ জুন শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে। বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠার সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। ফলে ত্রিশালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনি স্বীকৃতি, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা বিএনপি সরকারের আমলেই সম্পন্ন হয়, এ কথা ঐতিহাসিকভাবে উল্লেখযোগ্য। সরকারি ওয়েবসাইটে ২০০৬ সালের ৯ মে সরকার কর্তৃক প্রতিষ্ঠার কথাও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়টি ত্রিশালের বটতলা এলাকায় প্রতিষ্ঠিত, যেখানে নজরুল তাঁর শৈশবের বহু দিন কাটিয়েছিলেন। এটিকে প্রথমে সংস্কৃতিকেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ভাবা হলেও, ২০০৬ সালের আইনের মাধ্যমে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। এ প্রতিষ্ঠান এখন সাহিত্য, সংস্কৃতি, সমাজবিজ্ঞান, বিজ্ঞান, প্রকৌশল, ব্যবসায় শিক্ষা ও আইনসহ বহু শাখায় উচ্চশিক্ষা দিচ্ছে। ফলে ত্রিশালে নজরুলের স্মৃতি শুধু আবেগের বিষয় হয়ে নেই; তা এখন শিক্ষা, গবেষণা ও জাতীয় সাংস্কৃতিক চেতনার একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ত্রিশাল কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের একটি স্বল্পস্থায়ী হলেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। এখানে তিনি পেয়েছিলেন শিক্ষার সুযোগ, সংগ্রামের অভিজ্ঞতা, লোকজ জীবন ও সংস্কৃতির স্বাদ এবং এমন এক পরিবেশ, যা তাঁর সৃষ্টিশীল মানসকে সমৃদ্ধ করেছিল। আজকের ত্রিশালও সেই ঐতিহ্য বহন করছে স্মৃতিচিহ্ন, গবেষণা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। তাই ত্রিশালের ইতিহাসে নজরুল যেমন অবিচ্ছেদ্য, স্মৃতির ভেতর জীবন্ত এক জনপদ। তেমনি নজরুলচর্চার পরিসরেও ত্রিশালের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে।
