- Dainiksylhet.com - https://dainiksylhet.com -

অমর একুশে; শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় ভাষা শহিদদের স্মরণ

আজ মহান একুশে ফেব্রুয়ারি, শহীদ দিবস। ভাষার লড়াইয়ে মাথা নত না করার দিন। ভাষা শহীদদের স্মরণে জাতি পালন করছে দিবসটি। একইসঙ্গে জাতিসংঘের উদ্যোগে বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে যথাযথ মর্যাদায় পালিত হবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।

বাঙালির আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার লড়াকু ইতিহাসের অমর একুশের ৭৫ বছর পূর্ণ হলো আজ। ১৯৫২ সালের এই দিনে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে যারা স্বাধীন বাংলাদেশের ভিত্তি রচনা করেছিলেন, সেই বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধায় নত হচ্ছে জাতি।

প্রথম প্রহরে শ্রদ্ধা নিবেদন

শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে দিবসের কর্মসূচি শুরু করেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, ঢাকায় বিদেশি দূতাবাসের প্রতিনিধিরা, একুশে উদ্‌যাপন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, দফতর ও সংস্থার প্রতিনিধিরা এবং রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনের পর নির্ধারিত ধারাক্রম অনুযায়ী অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানান। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অতিরিক্ত ৩০ মিনিট নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রাখে। পরে শহীদ মিনার এলাকা সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।

রাষ্ট্রপতির বাণী

শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেন, “স্মৃতিবিজড়িত এই দিনে আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি মাতৃভাষা বাংলার অধিকার আদায়ে জীবন উৎসর্গকারী ভাষা শহীদ রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার, শফিউরসহ নাম না-জানা শহীদদের। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আমি বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষী জনগণ ও জাতিগোষ্ঠীকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।”

মহান ভাষা আন্দোলনকে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমাদের নিজস্ব জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটে। ভাষা আন্দোলন ছিল জাতিসত্তা, স্বকীয়তা ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার আন্দোলন। আমাদের স্বাধিকার, মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে অমর একুশের চেতনাই যুগিয়েছে অফুরন্ত প্রেরণা ও অসীম সাহস।”

তিনি আরও বলেন, “মহান একুশের চেতনাকে ধারণ করে পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষাভাষী ও সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্মানবোধ জাগ্রত হোক, দেশ ও জাতির কল্যাণ নিশ্চিত হোক— মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে এ কামনা করি।”

প্রধানমন্ত্রীর বাণী

দিবসটি উপলক্ষে দেশবাসী ও বিশ্বের সব ভাষাভাষী মানুষকে শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক বিশেষ বিবৃতি দেন। তিনি বলেন, “একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতীয় জীবনের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় এবং গৌরবের প্রতীক। ৫২-এর ভাষা আন্দোলন কেবল ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠাই করেনি, বরং বাঙালির স্বাধিকার, গণতন্ত্র ও সাংস্কৃতিক চেতনার ভিত্তিকে মজবুত করেছে। একুশের এই রক্তাক্ত পথ ধরেই মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা অর্জন করেছি বাংলাদেশের স্বাধীনতা।”

তিনি আরও বলেন, “১৯৭১ সালের স্বাধীনতা অর্জন এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে আমরা একটি স্বনির্ভর, নিরাপদ ও মানবিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়তে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আসুন, আমরা সর্বস্তরে বাংলা ভাষার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করি এবং বিশ্বের সকল বিপন্ন ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে সচেষ্ট হই।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, জনগণের অধিকার ও সমতা প্রতিষ্ঠাই ছিল একুশের মূল চেতনা। এ চেতনাকে ধারণ করে দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম পার হয়ে দেশে আজ গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। গণতন্ত্রের এই অগ্রযাত্রাকে সুসংহত করতে বর্তমান সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”

একুশের প্রেক্ষাপট: রক্তঝরা সেই দিন

১৯৫২ সালের এই দিনে তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ‘উর্দু হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ ঘোষণার প্রতিবাদে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে বাংলার ছাত্রসমাজ। সব বাধা উপেক্ষা করে মিছিল বের করলে পুলিশের গুলিতে রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার ও শফিউরসহ নাম না-জানা অনেকে শহীদ হন। তাঁদের আত্মত্যাগ পরবর্তীকালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র অর্জনের প্রেরণা জুগিয়েছিল।

দিবসের কর্মসূচি

শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা বিধিমালা অনুযায়ী অর্ধনমিত থাকবে। পতাকার সঠিক মাপ ও উত্তোলনের নিয়ম সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতে বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার, বেসরকারি টেলিভিশন ও বেতার এবং প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রচার চালানো হবে। জাতীয় কর্মসূচির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজস্ব কর্মসূচি প্রণয়ন করে দিবসটি পালন করবে। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি উদ্‌যাপন করবে।

একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনার চত্বর ও আজিমপুর কবরস্থান এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। অতিরিক্ত জনসমাগম নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সব সরকারি-বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল, বাংলাদেশ বেতার ও কমিউনিটি রেডিও একুশের অনুষ্ঠানমালা প্রচার করবে।

ঢাকার বিভিন্ন সড়কদ্বীপ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থান বাংলাসহ দেশের অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর বর্ণমালা সম্বলিত ফেস্টুনে সজ্জিত করা হবে। ভাষা শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনায় দেশের সব মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও উপাসনালয়ে প্রার্থনার আয়োজন করা হবে। সংবাদপত্রগুলো প্রকাশ করবে বিশেষ ক্রোড়পত্র।

গণযোগাযোগ অধিদফতর ট্রাকের মাধ্যমে ভ্রাম্যমাণ সংগীতানুষ্ঠান এবং নৌযানে ঢাকা শহরসংলগ্ন নৌপথে সঙ্গীতানুষ্ঠানের আয়োজন করবে। জেলা-উপজেলায় থাকবে ভ্রাম্যমাণ চলচ্চিত্র প্রদর্শন। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনসমূহেও যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি উদ্‌যাপিত হবে।

বাংলাদেশ শিশু একাডেমি শিশুদের নিয়ে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, ছড়া ও কবিতা পাঠ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে। দিবসটি উপলক্ষে বাংলা একাডেমি আয়োজন করবে একুশে বইমেলা। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইনস্টিটিউট, ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশ নেবে।

বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর ও অধীনস্থ শাখা জাদুঘর, শিল্পাচার্য জয়নুল লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর, বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের প্রত্নস্থান ও জাদুঘরসমূহ শিশু-কিশোর, শিক্ষার্থী, প্রবীণ ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য ওই দিন বিনা টিকিটে উন্মুক্ত থাকবে। জাতীয় জাদুঘর ও স্বাধীনতা জাদুঘরে প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন, ভাষা আন্দোলনবিষয়ক নিদর্শন প্রদর্শনী, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের গ্রাফিতি অঙ্কন ও প্রদর্শন, শিশু-কিশোরদের সুন্দর বাংলা হাতের লেখা প্রতিযোগিতা এবং সেমিনারের আয়োজন করা হবে। গণগ্রন্থাগার অধিদফতর বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং আলোচনা সভার আয়োজন করবে।

এ ছাড়া দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও নিজ নিজ কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি পালন করবে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন