- Dainiksylhet.com - https://dainiksylhet.com -

অস্ট্রেলিয়া থেকে মুখ ফেরাচ্ছেন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা

বিদেশে উচ্চশিক্ষার গন্তব্য হিসেবে অস্ট্রেলিয়াকে ঘিরে যে আকর্ষণ ছিল, তাতে বড়সড় ফাটল ধরেছে। মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে দেশটিকে প্রথম পছন্দের তালিকায় রাখার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে। ভিসার নিয়মে পরিবর্তন, আবেদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং পড়াশোনা শেষে চাকরি পাওয়ার অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষা খাতে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ। আর এই পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় শক্ত অবস্থান নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডা।

শিক্ষা ও অভিবাসনবিষয়ক প্রতিষ্ঠান আইডিপি এডুকেশনের নতুন পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে এমন চিত্র। তথ্য অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের মধ্যে এখন চারজনের একজনেরও কম অস্ট্রেলিয়াকে প্রথম পছন্দ হিসেবে বিবেচনা করছেন। ছয় মাস আগেও এ হার ছিল তিনজনের একজনের বেশি। এটি কেবল পছন্দ বদলের পরিসংখ্যান নয়, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আকর্ষণে অস্ট্রেলিয়ার অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। কারণ বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে একটি দেশের আকর্ষণ নির্ভর করে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের মানের ওপর নয়, বরং ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা, পরিবারের সঙ্গে থাকার সুযোগ, পড়াশোনার ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের ওপরও। বিশ্বের মেধাবী শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার প্রতিযোগিতায় একসময় এগিয়ে থাকা অস্ট্রেলিয়ার জন্য এ পরিস্থিতিকে বড় সতর্কসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অভিবাসন নীতির কড়াকড়িতে কমছে আগ্রহ

অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাতে। লেবার পার্টি, কোয়ালিশন ও ওয়ান নেশন—তিন পক্ষের রাজনৈতিক অবস্থান ও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগের মধ্যে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ সংকুচিত করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন মন্ত্রী টনি বার্কের ঘোষিত নতুন ব্যবস্থায় বিদেশ থেকে উচ্চশিক্ষা নিতে আসা শিক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আনার সুযোগে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি করা হয়েছে। নীতিমালার এমন পরিবর্তনে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে পড়াশোনার সিদ্ধান্ত নিতে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় ধরে পরিকল্পনা করেন। সেই পরিকল্পনার মধ্যে বারবার পরিবর্তন এলে তাঁরা বিকল্প দেশ বেছে নিতে পারেন।

ভিসা ফিই হয়ে উঠছে বড় দেয়াল

অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে যাওয়ার ব্যয়ও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে ভিসা ফি বাড়ানোর পর স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য তা ২ হাজার ৫০০ ডলার এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ৫ হাজার ৭৫০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এতে অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনার প্রাথমিক খরচ আরও বেড়েছে। এর সঙ্গে বাসাভাড়া, খাবার, যাতায়াত ও অন্যান্য জীবনযাত্রার ব্যয় যুক্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য দেশটি ক্রমেই ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। শুধু ব্যয় বৃদ্ধি নয়, ভিসা প্রত্যাখ্যানের হারও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। প্রতিবেদনের তথ্যে বলা হয়েছে, অস্ট্রেলিয়ায় ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার ২৪ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যা গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এক দশক আগে এ হার ছিল ৭ দশমিক ৯ শতাংশ।

প্রতিযোগীরা এগোচ্ছে, পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা

অস্ট্রেলিয়ার জনপ্রিয়তা কমার বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বেড়েছে। আইডিপির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ৫৪ শতাংশ সম্ভাব্য শিক্ষার্থী এখনও অস্ট্রেলিয়াকে সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করছেন। তবে এ হার পাঁচ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে দ্রুত এগিয়ে আসছে যুক্তরাজ্য।
আইডিপি এডুকেশনের চিফ পার্টনার অফিসার সাইমন এমেট এএপিকে বলেন, বিশ্বের সেরা শিক্ষার্থীদের সামনে অনেক বিকল্প রয়েছে। অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তাঁরা অন্য গন্তব্যের দিকে ঝুঁকে পড়েন। একবার সেই সিদ্ধান্ত নিলে তাঁদের আগের পছন্দে ফিরিয়ে আনা কঠিন।

তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি, যাতে কোনো পদক্ষেপ অতিরিক্ত কঠোর হয়ে না যায়। ভিসা প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনতে গিয়ে সম্ভাব্য শিক্ষার্থীদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্তের ওপর কী প্রভাব পড়ছে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমিয়ে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা দেশগুলোর জন্য কানাডার পরিস্থিতিকে সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন এমেট। তাঁর মতে, কানাডায় কঠোর পদক্ষেপের পর আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভর্তি ২৯ শতাংশ কমে গেছে।

এ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে অস্ট্রেলিয়াকেও নীতিমালার ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। কারণ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয় বাড়ান না; তাঁরা দেশটির অর্থনীতি, শ্রমবাজার ও আন্তর্জাতিক শিক্ষাব্যবস্থারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

অস্ট্রেলিয়ায় থেকেও স্বস্তিতে নেই শিক্ষার্থীরা

শুধু নতুন শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমছে, এমন নয়, দেশটিতে বর্তমানে অবস্থানরত আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জীবনও কঠিন হয়ে উঠছে। আইডিপির জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, খণ্ডকালীন কাজ পাওয়া কিংবা পড়াশোনা শেষে চাকরি খোঁজা তাদের প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি কঠিন। এ ছাড়া প্রতি তিনজনের মধ্যে একজনেরও বেশি শিক্ষার্থী জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন।

ফলে উচ্চশিক্ষার জন্য অস্ট্রেলিয়াকে বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে এখন শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের মান বা ডিগ্রির মূল্য নয়, বরং ভিসার নিশ্চয়তা, চাকরির সুযোগ এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সব মিলিয়ে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার প্রতিযোগিতায় অস্ট্রেলিয়ার সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ। নীতিমালার ঘনঘন পরিবর্তন, বাড়তি ব্যয় ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে উঠতে না পারলে দেশটির শিক্ষা খাতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন