বোরো উৎপাদিত সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার অন্যতম প্রধান হাওর শনি ও মাটিয়ান হাওর। চলতি মৌসুমে আম্মকখালী ও আলমখালী বাঁধ নির্মাণ না হওয়ায় মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এই হাওরের হাজার হাজার কৃষকের কষ্টে ফলানো ফসল পাহাড়ি ঢলে পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় আশংকায় উৎবেগ আর উৎকণ্ঠা দিন পাড় করছেন।
উপজেলার দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের মাড়ালা এলাকায় আম্মকখালি ও দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়নে আলমখালী বাঁধ অসম্পূর্ণ ও দুর্বল বাঁধ ঘিরে পাহাড়ী ঢলে ভেঙে ফসল তলিয়ে যাওয়ায় আশঙ্কা তৈরী হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে,অনিয়ম,অব্যবস্থাপনা এবং বাঁধে পর্যাপ্ত মাটি ব্যবহার না করায় বাঁধটি এখনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় এলাকাবাসী ও ইউপি সদস্য জুয়েল মিয়া।
শনির হাওরের কৃষক কালসম মিয়া,সাকিল মিয়াসহ অনেকেই জানান, প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বোরো ধান চাষ হয় শনি হাওরটিতে। স্থানীয় খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতেও ভূমিকা রাখে। ফসল ডুবির ঘটনা ঘটলে না খেয়ে থাকতে হবে ছেলে মেয়েকে নিয়ে।
মাটিয়ান হাওরের কৃষক ফারুক মিয়া, লতিফ মিয়াসহ কৃষকদের দাবি,বাঁধ নির্মাণ কাজ অনেক আগেই শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো তা সম্পন্ন হয়নি। বর্ষা মৌসুম ঘনিয়ে আসার আগেই কাজ শেষ না হওয়ায় তাদের মধ্যে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে। বাঁধ ভেঙে গেলে হাওরের হাজার হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে ফসলহানি ঘটবে।
হাওর পাড়ে বাসিন্দাগন বলছেন,শুধু শনির হাওর নয়,টাঙ্গুয়ার হাওর,মাটিয়ান হাওরসহ আশপাশের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁধের কাজ দায়িত্বশীলদের দায়িত্বহীনতায় এখনোও চলমান রয়েছে। যা কাবিটা নীতিমালার বর্হিভূত। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব কাজ শেষ না হওয়ায় সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বহীনতার ফল। দ্রুত বাঁধ নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করে হাওরের ফসল রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন,শুরু থেকে তারা কাজের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও অসচ্ছ প্রক্রিয়ায় হাওরে কাজ শুরু করে, যার ফলে নিজেদের লাভের জন্য সকল উপজেলায় বহুবার অনেক পিআইসি পরিবর্তন হয়েছে। মাঠে পিআইসিরা বলছেন বিল পাইছেন ৪২% আবার পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে কাজ শেষ ৯২% তাহলে পিআইসিদের বক্তব্য তো সত্য নয় যে টাকা পায়নি এর কারণে কাজ পিছাইছে, কাজের মান খারাপ হইছে।
তিনি আরও বলেন,পানি উন্নয়ন বোর্ডের এমন উপস্থাপনের কারনে কোথাও তো পিআইসিদের দেখছিনা বিলের জন্য চাপ দিতে।আমাদের কাছে মনে হয় এখানেও গভীর কিছু লুকায়িত আছে, না হয় একজন পিআইসি এতো টাকার কাজ করাইছেন কিন্তু বিল পান নি অথচ কাজ শেষ বলছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। তার মানে কাজের তুলনায় বরাদ্দ বেশি তাই টাকা দেরিতে দিলেও সমস্যা নাই বিষয়টি কি এমন ?।
তাহিরপুর উপজেলার পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্ব থাকা এসও মনির হোসেন জানান,আলমখালী ছাড়া প্রতিটি বাঁধের মাটির কাজ শেষ। আর আলমখালির কাজ কেউ করতে চায়নি আর মাটি না পাওয়ায় দেরি হয়েছে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে এই বাঁধের কাজ শেষ হয়ে যাবে। এছাড়া উপজেলার অন্যান্য বাঁধের মাটির কাজ করে অন্যান্য কাজ চলমান রয়েছে। তবে টাকা ছাড় না দেয়ার কাজের গতি কমিয়ে দিয়েছে পিআইসির দায়িত্ব প্রাপ্ত্যরা।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোডের প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার জানান, বৃষ্টি থাকার কারণে আম্মকখালী বাঁধের কাজ বন্ধ ছিল। এখন আবহাওয়া ভালো থাকায় দু’একদিনের মধ্যেই কাজ শুরু করে অতিদ্রুতই কাজ শেষ করা হবে। তবে এই বাঁধে মেয়াদ আছে জুন পর্যন্ত। এবং আলমখালী বাঁধে মাটি না পাওয়ায় কাজ বন্ধ আছে। মাটি পেলে এই বাঁধ দুদিনেই শেষ হয়ে যাবে। কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
হাওরাঞ্চলের কৃষকরা বলছেন, এখনই দুর্বল ফসলরক্ষা বাঁধগুলো মেরামত ও কঠোর তদারকি না করলে সামান্য পাহাড়ি ঢলেই সুনামগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরের বোরো ধান হুমকির মুখে পড়বে। ফলে হাওরের কৃষকদের মনে এখন বৃষ্টি নিয়ে যেমন আশা, তেমনি শিলাবৃষ্টি ও সম্ভাব্য ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি নিয়ে বাড়ছে অনিশ্চয়তা।
প্রসঙ্গত গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর হাওরের বাঁধের কাজ শুরু করে ২৮ ফেব্রুয়ারি শেষ করার কথা ছিল কাবিটা নীতিমালা অনুযায়ী। কিন্তু এই সময়ে এসেও বাধের কাজ শেষ না হওয়ায় আরো ১৫ দিন সময় বাড়ানো হলেও বাঁধের কাজ বাকি রয়েই গেছে। চলতি বছর ৭১০টি প্রকল্পের মাধ্যমে জেলার অর্ধশত হাওরে ৬০৩ কিলোমিটার ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ বাস্তবায়ন হচ্ছে ১৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে। জেলার ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ধান উৎপাদন করা হয়।
