পৃথিবীর সবচেয়ে রাজকীয় শহর

ইউরোপের মানচিত্রে এমন কিছু শহর আছে, যাদের দিকে তাকালেই ইতিহাস কথা বলে। সেই তালিকার শীর্ষেই আছে ভিয়েনা—অস্ট্রিয়ার রাজধানী। প্রাসাদ, সংগীত, স্থাপত্য আর অভিজাত সংস্কৃতির এক অনন্য মেলবন্ধনে ভিয়েনাকে বহুদিন ধরেই বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে রাজকীয় শহর। কিন্তু এই রাজকীয়তার শিকড় কোথায়?

ভিয়েনার রাজকীয় যাত্রা শুরু মধ্যযুগে। প্রায় সাত শতাব্দী ধরে ইউরোপ শাসন করেছে শক্তিশালী হ্যাবসবুর্গ সাম্রাজ্য। এই সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র ছিল ভিয়েনা। অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড—বর্তমান অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, চেক রিপাবলিক এবং ইতালির একাংশ—এই শহর থেকেই শাসিত হতো। ইউরোপ যখন যুদ্ধ, কূটনীতি আর ক্ষমতার পালাবদলে উত্তাল, ভিয়েনা তখন ছিল সম্রাটদের সিদ্ধান্তের নীরব মঞ্চ।

ভিয়েনাকে বলা হয় ‘প্রাসাদের নগরী’। শহরের হৃদয়ে অবস্থিত হফবুর্গ প্যালেস ছিল হ্যাবসবুর্গ সম্রাটদের প্রধান বাসভবন। এখানেই গড়ে উঠেছে রাজকীয় দরবার, গ্রন্থাগার ও ঐতিহাসিক আর্কাইভ। অন্যদিকে, শহরের প্রান্তে অবস্থিত শোনব্রুন প্যালেস ইউরোপীয় বারোক স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন। এখানকার বিস্তৃত বাগানে হেঁটেছেন কিংবদন্তি সম্রাজ্ঞী মারিয়া থেরেসা। এই প্রাসাদগুলো আজও ভিয়েনার রাজকীয় ঐতিহ্যের জীবন্ত সাক্ষ্য।

সংগীত ভিয়েনার আত্মা। তাই একে ডাকা হয় ‘City of Music’। এখানেই সৃষ্টি হয়েছে মোজার্ট–এর অমর সুর, আর বেটোফেন–এর সময় বদলে দেওয়া সিম্ফনি। বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ অপেরা মঞ্চ ভিয়েনা স্টেট অপেরা আজও রাজকীয় গাম্ভীর্যে সংগীতপ্রেমীদের মুগ্ধ করে। এখানে সংগীত বিলাসিতা নয়, বরং ঐতিহ্য।

ভিয়েনার ক্যাফে সংস্কৃতি শহরটির আরেকটি অনন্য পরিচয়। শতাব্দীপ্রাচীন ক্যাফেগুলোতে বসে লেখক, দার্শনিক ও শিল্পীরা গড়ে তুলেছেন চিন্তার নতুন জগৎ। এক কাপ কফি আর এক টুকরো সাচার টর্টের সঙ্গে সময় যেন ধীর হয়ে আসে। এই ক্যাফে সংস্কৃতিকে স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো—বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে।

স্থাপত্যে ভিয়েনা এক চলমান ইতিহাস। বারোক, রোকোকো ও নিও-ক্লাসিক্যাল ধারার অনবদ্য সব স্থাপনা একসাথে দেখা যায় রিংস্ট্রাসে এলাকায়। পার্লামেন্ট ভবন, জাদুঘর, অপেরা হাউস—সবই রাজকীয় মাপে নির্মিত।

সময় বদলেছে, কিন্তু ভিয়েনা তার আত্মা হারায়নি। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা আর ঐতিহ্যের নিখুঁত ভারসাম্যে এই শহর বারবার নির্বাচিত হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বসবাসযোগ্য শহর হিসেবে। শান্ত, নিরাপদ, সংস্কৃতিময়—ভিয়েনা প্রমাণ করে, রাজকীয়তা সবসময় উচ্চকণ্ঠে নয়; কখনো কখনো নীরব উপস্থিতিতেই সবচেয়ে বেশি মহিমান্বিত।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন