পরিবারের ৮ সদস্যকে নিয়ে একসঙ্গে চিরঘুমে বাড়ির অভিভাবক

মোংলা উপজেলা মাঠ। সারি সারি রাখা ৯টি খাটিয়া। খাটিয়ার মধ্যে কফিনবন্দি বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাক, তার দুই ছেলে সাব্বির ও আব্দুল্লাহ, এক মেয়ে ঐশী, ৪ নাতনি আরফা, ইরান, ফাহিম, আলিফ ও পুত্রবধূ পুতুলের মরদেহ। জানাজা শেষে পাশাপাশি দাফন করা হয় তাদের। বাড়ির অভিভাবক আব্দুর রাজ্জাক যেন সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে ঘুমালেন!

শুক্রবার (১৩ মার্চ) জুমার নামাজের পর মোংলা উপজেলা মাঠে জানাজা শেষে তাদের মোংলা পোর্ট পৌর কবরস্থানে দাফন করা হয়।

গত রাতে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও রামপাল হাসপাতাল থেকে মরদেহগুলো এনে গোসল শেষে সকাল থেকে একে একে তাদের উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন মাঠে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়। আর কনে পক্ষের বাড়ি কয়রায় ও রামপালের চালকসহ ৫ জনকে তাদের নিজ নিজ এলাকায় দাফন করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার বিকেলে বাগেরহাটের রামপালে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় ঘটে। এদিকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ থেকে মৃত ব্যক্তিদের প্রতিজনকে ৫ লাখ টাকা করে অনুদান দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। সরকারিভাবে আরও অনুদান দেয়া হবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম।

পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায়, বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বিকেলে খুলনা-মোংলা মহাসড়কের রামপাল উপজেলার বেলাই ব্রিজ এলাকায় একটি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। মোংলা থেকে খুলনার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া একটি স্টাফবাহী বাসের সঙ্গে বরযাত্রীবাহী একটি মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই বেশ কয়েকজন নিহত হন এবং হাসপাতালে নেওয়ার পথে বাকিরা মারা যান। সব মিলিয়ে বর-কনে সহ মোট ১৪ জন এ দুর্ঘটনায় মৃত বরণ করে।

নিহতদের মধ্যে ৯ জনই ছিলেন মোংলা পোর্ট পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাকের পরিবারের সদস্য। নিহতরা হলেন-আব্দুর রাজ্জাক, তার দুই ছেলে সাব্বির ও আব্দুল্লাহ, এক মেয়ে ঐশী, ৪ নাতনি আরফা, ইরান, ফাহিম ও আলিফ। এছাড়া তার এক পুত্রবধূ পুতুল বেগম নিহত হয়। কয়রা উপজেলার কনের দাদি, নানী, বোন ও কনে এবং রামপাল উপজেলার মাইক্রোবাস চালক এ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান।

মোংলায় নব বর সাব্বির ও তার বাবা আব্দুর রাজ্জাকসহ পরিবারের ৯ জনের মরদেহ শুক্রবার ভোরে মোংলার শেহালাবুনিয়ায় শহরের ৮নং ওয়ার্ডে নিজ বাড়িতে পৌঁছালে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। শুক্রবার জুমার নামাজের পর মোংলা উপজেলা মাঠে তাদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং মোংলা পৌর কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন করেণ মৃত্যু রাজ্জাকের আত্মীয় ও রাজনৈতিক দল বিএনপির উপজেলা ও পৌর নেতাকর্মীরা।

অন্যদিকে, কনে মিতু, তার বোন, নানী ও দাদির মরদেহ খুলনার কয়রা উপজেলার নাকশা গ্রামে নেওয়া হয়। সেখানে শুক্রবার সকাল ১০টায় জানাজা শেষে তাদের নিজ বাড়িতে দাফন সম্পন্ন হয়েছে। মাইক্রোবাস চালককে দাফন করা হয় রামপালের তার নিজ বাড়িতে।

মোংলায় একই পরিবারের ৯ জন নিহত হওয়ার মোংলা উপজেলা মাঠে নামাজে জানাজায় অংশ নেয় মোংলা-রামপাল বাগেরহাট-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম, বাগেরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মঞ্জুরুল হক রাহাত, বাগেরহাট জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির অ্যাডভোকেট মাওলানা আ. ওয়াদুদ, বাগেরহাট জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন, জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ হাছান চৌধুরী, সহকারী পুলিশ সুপার রিফাতুল ইসলাম, পৌর বিএনপির সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র আলহাজ মো. জুলফিকার আলী, সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান মানিক, উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. আ. মান্নান, সাধারণ সম্পাদক আবু হোসেন পনিসহ অর্ধলক্ষাধিক লোক এ জানাজায় অংশ নেয়।

এসময় মোংলা-রামপাল বাগেরহাট-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, মোংলা-খুলনা সড়কে যে সড়ক দুর্ঘটনা হয়েছে এটি দুঃখ জনক। এব্যাপারে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। এছাড়া সড়কে দুর্ঘটনা এড়াতে এখন থেকে কঠোর ভাবে কাজ করা হবে। সড়ক দুর্ঘটনায় হিতদের বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে প্রতেককে ৫ লাখ টাকা করে অনুদান দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে মোংলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে তাদের সব কাগজপত্র জমা দিয়ে এ টাকা গ্রহণ করার জন্য বলা হয়েছে। এছাড়া সরকারিভাবে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে এবং নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে সহায়তা দেয়া হবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম।

দুর্ঘটনার পর খুলনা-মোংলা মহাসড়কে প্রায় দুই ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ ছিল। ফায়ার সার্ভিস ও হাইওয়ে পুলিশ উদ্ধার কাজ চালানোর পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

পুলিশ জানিয়েছে, ঘাতক বাসদুটিকে সড়ক থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে এবং ঘটনসার সুষ্ঠু তদন্ত ও মামলার প্রক্রিয়া চলছে। এ ঘটনায় বাগেরহাট ও মোংলা এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসছে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন