বৈশাখে মৌলভীবাজারের কাউয়াদিঘি হাওরের বিস্তৃত বুকজুড়ে আবাদ করা বোরো ক্ষেতে পাকা ধানের সমারোহ দেখার অপেক্ষায় ছিলেন কৃষক। এখন সেখানে বিস্তীর্ণ জলরাশি। যে দিকে চোখ যায় সে দিকেই পানি থই থই করছে। এই পানির নিচে তলিয়ে আছে কৃষকের স্বপ্ন। পরিবারের সারা বছরের খাদ্যের যোগান নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা।
গত ১৭ এপ্রিল থেকে কয়েক দিনের বৃষ্টিতে জেলার কাউয়াদিঘি হাওরের কয়েক হাজার হেক্টর জমির কাঁচা-পাকা ধান তলিয়ে যায়। এতে হাওরপারের কৃষকের ঘরে ঘরে ফসল হারানোর শোক বিরাজ করছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জলাবদ্ধতার কারণে জেলার চার হাজার ২০৬ হেক্টর জমির ফসল একেবারে বিনষ্ট হয়েছে। এছাড়া পানিতে তলিয়ে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার হেক্টর জমির ফসল আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে ২৫ হাজারের বেশি কৃষক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
বৃহস্পতিবার কাউয়াদিঘী হাওরপারে গিয়ে দেখা যায়, আকাশে খানিকটা রোদের দেখা মিলতেই বুকসমান পানিতে নেমে কৃষকরা কাস্তে হাতে ধান কাটছেন। ডুব দিয়ে পানির তল থেকে ধান আনতে প্রাণপণ চেষ্টা করছেন তারা। অন্যদিকে বাড়ির উঠান, সরকারি রাস্তায় মাড়াই করা ধান শুকাতে ব্যস্ত কিষানি। ফসল হারানোর দীর্ঘশ্বাসের মাঝে পরিবারের সারা বছরের অন্ন জোগানোর কঠিন জীবনযুদ্ধে লিপ্ত তারা।
রাজনগরের হাওরপারের কাদিপুর গ্রামের মিজু মিয়া জানান, রোদের দেখা মিলেছে। তাই কিছু মানুষ হাওরে ডুবে যাওয়া ক্ষেত থেকে ধান কেটে আনার জোর চেষ্টা করছেন। পানির তলে ধান নেতিয়ে গেছে। গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে ধান কেটে কলার ভেলায় রেখে আঁটি বেঁধে নৌকায় রাখা হচ্ছে। সারাদিনে ৪-৫ জন মিলে এক কিয়ারের (৩০ শতক) তিন ভাগের একভাগ জমির ধানও কাটা যায় না। পরিবারের দু-এক মাসের খোরাকির ধান জোগানোর চেষ্টায় দিন-রাত পানির সঙ্গে যুদ্ধ চলছে।
কাউয়াদিঘি হাওরপারের ফতেপুর ইউনিয়নের হামিদপুর গ্রামের বাসিন্দা ব্যাংক কর্মকর্তা জুনেদ আহমদ জানান, মনু প্রকল্প হওয়ার পর থেকে কাউয়াদিঘি হাওরের বুলাইয়া বিল এলাকার জমির কোনো দিন পানিতে ভেসে যায়নি। এবার তাদের ১৪ বিঘা জমির ৭-৮ বিঘার ফসল পানিতে ডুবে গেছে। প্রতিবছর জমি বর্গা দিয়েও পরিবারের সারা বছরের খোরাকির ধান হতো। পাশাপাশি ৪০-৫০ হাজার টাকার ধান বিক্রিও করতে পারতেন। এ বছর যে ধান পেয়েছেন তাতে ৩-৪ মাসও যাবে না। তিনি আরও জানান, তলিয়ে যাওয়া ফসলি জমিতে বুকসমান পানি। তিনি বর্গাচাষিসহ আশপাশের অন্য চাষিদের জমির ধান কেটে নিতে বলেছেন।
কৃষি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, কাউয়াদিঘি হাওরাঞ্চলে ৬ হাজার হেক্টর বেশি জমিতে এ বছর বোরো আবাদ করা হয়েছে। আবাদি জমির অধিকাংশ ফসল ঘরে তোলা যায়নি। কৃষকরা যেটুকু ধান কাটতে পেরেছেন তাও রোদের অভাবে ধানে ঘেরা (অঙ্কুর) গজিয়ে প্রচুর ধান বিনষ্ট হয়েছে।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার হাওরপারের গ্রাম মিরপুর, চাঁনপুর, শেওয়াইজুড়ীসহ বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে নাকে ভাসছিল ধান ও খড় পচা গন্ধ। কিষান-কিষানিদের অনেকে ধানের আবর্জনা ছাড়িয়ে শুকানোর চেষ্টা করছেন। বাড়ির উঠান, সড়ক, উঁচু পতিত জায়গা, যে যেখানে পারছেন চাটাই ফেলে ধান শুকাচ্ছেন। চাঁনপুর গ্রামের কানন বালা জানান, তিনি বর্গাচাষি। ১২-১৪ কিয়ার জমিতে ধান আবাদ করেছিলেন। সব ধান তলিয়ে যাওয়ায় এখন পরিবার নিয়ে কী খেয়ে বাঁচবেন চিন্তায় আছেন। পাশাপাশি জমি আবাদ করতে গিয়ে প্রচুর টাকা ঋণ করেছেন। এই টাকা কীভাবে পরিশোধ করবেন ভেবে পাচ্ছেন না।
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা এই মুহূর্তে দেওয়া কঠিন। ধারণা করা হচ্ছে, কৃষকের ফসলহানির পরিমাণ টাকার অঙ্কে ক্ষতির পরিমাণ ৮০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
