চোখের সামনে হঠাৎ একটি বানর আপনার মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে গাছের ডালে উঠে গেল। ফোন ফেরত পেতে হলে তাকে দিতে হবে খাবার। আপনি কলা এগিয়ে দিলেন, বানরটি ফোন ফেরত দিল। মানুষের চোখে ঘটনাটি ব্ল্যাকমেইল মনে হতে পারে, কিন্তু এমন ঘটনা নিছক গল্প নয়; ইন্দোনেশিয়ার বালির উলুওয়াতু মন্দির এলাকায় ম্যাকাক বানরের এমন আচরণ নিয়ে গবেষণা হয়েছে।
আবার আফ্রিকার কালাহারি মরুভূমিতে এমন এক পাখি আছে, যে অন্য প্রাণীর কষ্টার্জিত খাবার নিজের করে নিতে কখনো কখনো প্রতারণার আশ্রয় নেয়। ফর্ক-টেইলড ড্রঙ্গো অন্য প্রাণীর কাছাকাছি থেকে হঠাৎ বিপদসংকেত দেয়। তখন ভয় পেয়ে ওই প্রাণী খাবার ফেলে সরে গেলে সেই খাবার চলে যায় ড্রোঙ্গোর পেটে।
সমুদ্রেও একই ধরনের কৌশল দেখা যায়। কোনো পাখি কষ্ট করে মাছ ধরেছে, আরেক পাখি তাকে আকাশে তাড়া করে সেই মাছ ফেলে দিতে বাধ্য করছে। নিচে অপেক্ষা করছে ছিনতাইকারী। মাছ নিচে পড়লেই দখল নেবে সে। তাহলে কি প্রাণীরাও ছিনতাই করে?
বৈজ্ঞানিকভাবে সরাসরি এমন বলা ঠিক হবে না। কারণ মানুষের মতো ছিনতাই, ব্ল্যাকমেইল বা জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের সঙ্গে প্রাণীর আচরণ এক করে দেখার মতো প্রমাণ নেই। তবে প্রাণিজগতে এমন কিছু আচরণ আছে, যেগুলো মানুষের চোখে চাঁদাবাজি, প্রতারণা, ছিনতাই বা জিম্মি করার মতো মনে হয়। এসব আচরণের পেছনে রয়েছে টিকে থাকার কঠিন প্রতিযোগিতা। কম পরিশ্রমে বেশি খাবার পাওয়া, শক্তি সাশ্রয় করা কিংবা অন্যের দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া প্রকৃতিতে এসবও বেঁচে থাকার কৌশল।
ইন্দোনেশিয়ার বালির বিখ্যাত উলুওয়াতু মন্দির শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বা ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত নয়; সেখানকার ম্যাকাক বানরও পর্যটকদের কাছে বেশ আলোচিত। মানুষের আনাগোনার সঙ্গে অভ্যস্ত এসব বানর সুযোগ পেলেই পর্যটকদের চশমা, টুপি, জুতা, মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন জিনিস নিয়ে পালাতে পারে। কিন্তু আসল চমক শুরু হয় এরপর। কিছু বানর জিনিসটি নিয়ে দূরে বসে থাকে। পর্যটক বা মন্দিরের কর্মীরা খাবার দিলে সেটি ফেরত দেওয়ার মতো আচরণ করে। অর্থাৎ, একটি বস্তু নিয়ে তার বিনিময়ে খাবার পাওয়ার সম্পর্কটি তারা শিখে ফেলতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, উলুওয়াতুর লং-টেইলড ম্যাকাকদের মধ্যে মানুষের বিভিন্ন জিনিসের প্রতি আগ্রহ এবং খাবারের বিনিময়ে বস্তু ফেরত দেওয়ার আচরণ রয়েছে। কোন বস্তু মানুষের কাছে বেশি মূল্যবান, সে বিষয়েও অভিজ্ঞ বানরদের আচরণে পার্থক্য দেখা যেতে পারে। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে বানরটি মানুষের মতো করে মোবাইল ফোনের দাম হিসাব করছে। বরং অভিজ্ঞতা থেকে সে শিখছে কোন জিনিস নিলে মানুষের কাছ থেকে বেশি খাবার পাওয়া যায়।
এখানে চুরি থেকে আচরণটি আলাদা হয়ে যায়। এটি এক ধরনের শেখা বিনিময় আচরণ। বারবার একই অভিজ্ঞতা হলে বানর বুঝতে পারে, মানুষের কাছ থেকে খাবার পাওয়ার জন্য কোন বস্তুটি ধরে রাখা বেশি লাভজনক। এ কারণে উলুওয়াতুর বানরদের ‘মাফিয়া’ বলা মজার উপমা হতে পারে, কিন্তু বিজ্ঞানের ভাষায় এটি মূলত শেখা আচরণ, বস্তু বিনিময় এবং খাদ্য অর্জনের কৌশল।
প্রাণীদের মধ্যে প্রতারণার অন্যতম উদাহরণ ফর্ক-টেইলড ড্রঙ্গো পাখি। আফ্রিকার কালাহারি অঞ্চলে এই পাখিকে মীরকাটসহ বিভিন্ন প্রাণীর আশপাশে দেখা যায়। কোনো প্রাণী খাবার সংগ্রহ করলে ড্রঙ্গো কখনো কখনো এমন শব্দ করে, যা শিকারির উপস্থিতির সতর্কসংকেতের মতো শোনায়। মীরকাট বিপদ মনে করে খাবার ফেলে নিরাপদ জায়গায় সরে গেলে ড্রঙ্গো খাবারটি খেয়ে নেয়। সহজ ভাষায় বললে, অন্য প্রাণী খাবার সংগ্রহ করল, ড্রঙ্গো তাকে ভয় দেখিয়ে সরিয়ে দিল, এরপর খাবারটি নিজের করে নিল। তবে ড্রঙ্গোর কৌশল শুধু মিথ্যা সংকেতের ওপর নির্ভর করে না। প্রকৃত শিকারি দেখা দিলেও তারা সতর্কসংকেত দিতে পারে। ফলে অন্য প্রাণীরা ড্রঙ্গোর সব সংকেতকে মিথ্যা ধরে উপেক্ষা করতে পারে না। আর এটাই ড্রঙ্গোর প্রতারণাকে কার্যকর করে তোলে।
একবার মিথ্যা সংকেত দিয়ে খাবার পাওয়া গেলেও বারবার প্রতারণা করলে অন্য প্রাণীরা হয়তো তার সংকেতকে গুরুত্ব দেওয়া বন্ধ করে দেবে। তাই সত্যিকারের বিপদের সময়ও সংকেত দেওয়ার ক্ষমতা ড্রঙ্গোর কৌশলকে আরও কার্যকর করে।
প্রাণিজগতের আরেকটি পরিচিত কৌশলের নাম অন্যের খাবার ছিনিয়ে নেওয়া। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ক্লেপ্টোপ্যারাসিটিজম। অর্থাৎ, নিজে খাবার সংগ্রহ না করে অন্য প্রাণীর সংগৃহীত খাবার দখল করে খাওয়া। সমুদ্রের ওপরে ফ্রিগেট পাখি ও স্কুয়া পাখির মধ্যে এমন আচরণ দেখা যায়।
একটি পাখি কষ্ট করে মাছ ধরেছে। মাছটি নিয়ে সে উড়ে যাচ্ছে। তখন ফ্রিগেট পাখি তাকে পেছন থেকে তাড়া করতে পারে। বারবার চাপ সৃষ্টি, ধাক্কা বা আক্রমণের মাধ্যমে মাছটি ফেলে দিতে বা মুখ থেকে বের করে দিতে বাধ্য করলে অন্য ফ্রিগেট পাখি সেটি কুড়িয়ে নেয়।
স্কুয়া পাখিও একই ধরনের কৌশলের জন্য পরিচিত। এখানে কোনো জিনিস জিম্মি করা হচ্ছে না। কিন্তু কৌশলটির মূল হিসাব খুব সহজ, নিজে মাছ ধরতে যে সময় ও শক্তি লাগত, তা ব্যয় না করে অন্যের ধরা মাছটি দখল করে নেওয়া। প্রকৃতিতে শক্তি সাশ্রয়ও বেঁচে থাকার বড় বিষয়। তাই সুযোগ থাকলে অন্যের খাবার ছিনিয়ে নেওয়াও কিছু প্রাণীর জন্য লাভজনক কৌশল হয়ে উঠেছে।
হায়েনার নাম উঠলেই অনেকের মনে আসে সিংহের শিকার কেড়ে নেওয়া প্রাণী। বাস্তবতা অবশ্য এতটা সরল নয়। স্পটেড হায়েনা নিজেরাও দক্ষ শিকারি। অনেক সময় দলবদ্ধভাবে শিকার করে তারা খাবার সংগ্রহ করে। আবার সুযোগ পেলে অন্য প্রাণীর শিকার থেকেও খাবার নেয়। একইভাবে সিংহও হায়েনার কাছ থেকে খাবার ছিনিয়ে নিতে পারে।
শুধু হায়েনা সিংহের খাবার চুরি করে এমন একতরফা প্রমাণ নেই। বরং দুই প্রজাতির মধ্যে খাবার নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা চলে। এখানে কার দল বড়, কারা সংখ্যায় বেশি, কারা শারীরিকভাবে শক্তিশালী এবং পরিস্থিতি কেমন এসবের ওপর নির্ভর করতে পারে শেষ পর্যন্ত খাবার কার দখলে থাকবে। প্রকৃতির নিয়মে তাই প্রশ্নটা অনেক সময় ‘কে কার খাবার চুরি করল’ নয়; বরং কে কম ঝুঁকিতে বেশি শক্তি অর্জন করতে পারল।
একটি পাখি যদি খাবার ধরতে ১০ মিনিট পরিশ্রম করে, আর অন্য একটি পাখি কয়েক মিনিট তাড়া করে সেই খাবারটি ছিনিয়ে নিতে পারে, তাহলে দ্বিতীয় পাখিটির শক্তি ও সময় দুটিই বেঁচে যায়। তবে এর ঝুঁকিও আছে। যে প্রাণীর কাছ থেকে খাবার ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে, সে প্রতিরোধ করতে পারে। ফলে আক্রমণ, আঘাত বা শক্তি ব্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়। এ কারণে প্রকৃতিতে সবসময় অন্যের খাবার ছিনিয়ে নেওয়াই লাভজনক নয়। কখন নিজে শিকার করা ভালো, কখন অপেক্ষা করা ভালো আর কখন অন্যের কাছ থেকে খাবার দখলের চেষ্টা করা যায় এসবের ওপরও প্রাণীর টিকে থাকা নির্ভর করতে পারে। ফলে অন্যের খাবার ছিনিয়ে নেওয়ার আচরণকে শুধু ‘চুরি’ হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যায় না। এটি অনেক ক্ষেত্রে খাদ্য সংগ্রহের বিকল্প কৌশল।
প্রাণীদের ‘ব্ল্যাকমেইল’ আসলে কতটা সত্য?
এবার প্রশ্ন আসতে পারে প্রাণীরা কি সত্যিই ব্ল্যাকমেইল করতে পারে? এখানে বিজ্ঞানের উত্তর বেশ সতর্ক। মানুষের ব্ল্যাকমেইল বলতে বোঝায়, কারও ক্ষতি করার ভয় বা কোনো গোপন তথ্য প্রকাশের হুমকি দিয়ে তার কাছ থেকে সুবিধা আদায় করা। প্রাণীদের মধ্যে এমন জটিল সামাজিক ও মানসিক প্রক্রিয়ার প্রমাণ খুব সীমিত। তবে প্রাণীরা একে অন্যের আচরণকে প্রভাবিত করে এমন উদাহরণ অনেক। এ কারণে মানুষের ভাষায় এসব আচরণকে ‘ব্ল্যাকমেইল’ বা ‘ছিনতাই’ বলা আকর্ষণীয় হলেও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিটি ঘটনাকে আলাদা করে ব্যাখ্যা করা জরুরি। প্রকৃতিতে এটি অপরাধ নয়, টিকে থাকার কৌশল। মানুষের সমাজে এগুলো অপরাধ। কিন্তু বন্যপ্রাণীর জগতে নৈতিকতা বা আইনের সেই কাঠামো নেই। সেখানে টিকে থাকার প্রশ্নটাই সবচেয়ে বড়। যে প্রাণী কম শক্তি খরচ করে খাবার পেতে পারে, শিকারির হাত থেকে বাঁচতে পারে কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছ থেকে সম্পদ দখল করতে পারে সেই আচরণ তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়াতে পারে।
ঢাকা কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক শরীফা সুলতানা বলেন, মানুষের চোখে প্রাণীদের কিছু আচরণকে ‘প্রতারণা’ বা ‘ছিনতাই’ মনে হলেও বৈজ্ঞানিকভাবে এগুলোকে মানুষের অপরাধের সঙ্গে তুলনা করা ঠিক নয়। ড্রঙ্গোর মিথ্যা বিপদসংকেত দিয়ে অন্য প্রাণীর খাবার হাতিয়ে নেওয়া কিংবা ম্যাকাকের মানুষের জিনিস নিয়ে খাবারের বিনিময়ে ফেরত দেওয়ার মতো আচরণ প্রাণীর শেখার ক্ষমতা ও পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর দৃষ্টান্ত। প্রাণীরা মানুষের মতো অর্থনৈতিক মূল্য বোঝে না; বরং অভিজ্ঞতা থেকে কোন আচরণে খাবার বা সুবিধা পাওয়া যায়, তা শিখে নেয়।
অধ্যাপক শরীফা সুলতানার মতে, এসব আচরণকে খাদ্য সংগ্রহ, শক্তি সাশ্রয়, প্রতিযোগিতা ও টিকে থাকার বিবর্তনীয় কৌশল হিসেবে দেখাই বৈজ্ঞানিকভাবে বেশি যুক্তিযুক্ত।
