সিলেটের বিয়ানীবাজার পৌরশহরের শ্রীধরা ও কসবা ত্রিমুখী বাজারে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সরকারি সবজি শেড এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের আওতায় বাস্তবায়নাধীন লাইভস্টক অ্যান্ড ডেইরি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (এলডিডিপি) অধীনে নেওয়া এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও এখনো পুরোপুরি কাজ শেষ হয়নি। বিদ্যুৎ ও স্যানিটারি ব্যবস্থার কাজ অসম্পূর্ণ রয়েছে, অধিকাংশ দোকানকোঠা বন্ধ এবং নির্মিত স্থাপনাগুলোও প্রত্যাশিতভাবে ব্যবহার হচ্ছে না। ফলে বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয়ে নেওয়া প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গ্রামীণ ও স্থানীয় বাজারগুলোতে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে পশু জবাই, মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কৃষিপণ্য বিক্রির সুযোগ তৈরি করার লক্ষ্যে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে এ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। সিলেটের কয়েকটি পৌরশহরের পাশাপাশি বিয়ানীবাজারেও প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। শুরুতে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ কোটি ১৭ লাখ টাকা। পরবর্তীতে দুই দফায় ব্যয় বৃদ্ধি করে তা প্রায় ১ কোটি ৯৭ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের শুরু থেকেই নির্মাণকাজের মান নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের পাশাপাশি কাজেও ছিল ব্যাপক অনিয়ম। শ্রীধরা বাজারে শুরু হওয়া প্রকল্পের অসমাপ্ত অংশ পরবর্তীতে কসবা ত্রিমুখী বাজারের নদী ভরাট করা অংশে নির্মাণ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে প্রকল্প পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগও দেওয়া হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগ ও আপত্তি উপেক্ষা করেই তৎকালীন পৌর কর্তৃপক্ষের তদারকিতে প্রকল্পের কাজ চালিয়ে নেওয়া হয় বলে স্থানীয়দের দাবি।
প্রকল্পের আওতায় কসবা ত্রিমুখী বাজারের অংশে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে পশু জবাই, মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ভবিষ্যতে মাংস বিদেশে রপ্তানির উপযোগী অবকাঠামো তৈরির পরিকল্পনা ছিল। একই সঙ্গে বাজারে কৃষিপণ্য ও সবজি বিক্রির জন্য শেড নির্মাণ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না বলে অভিযোগ স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের।
সরেজমিনে শ্রীধরা বাজারের প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নির্মিত শেডের কয়েকটি অংশে মাছ ও সবজি বিক্রি হলেও অধিকাংশ দোকানকোঠা বন্ধ রয়েছে। কসবা ত্রিমুখী বাজারের অংশের অবস্থাও প্রায় একই। সেখানে এখনো বিদ্যুতের কাজ শেষ হয়নি এবং স্যানিটারি ব্যবস্থার কাজও অসমাপ্ত রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পের প্রায় ২০ শতাংশ কাজ এখনো বাকি রয়েছে। ফলে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্থাপনাগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না।
স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, “দুই বাজারের স্বাভাবিক পরিবেশ ও সৌন্দর্য নষ্ট করে সরকারি অর্থ ব্যয় করে যে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে, সেটি যদি মানুষের কোনো কাজে না আসে, তাহলে এত টাকা খরচ করার উদ্দেশ্য কী? মাসের পর মাস সবজি মার্কেট বন্ধ পড়ে আছে। এতে ব্যবসায়ী কিংবা সাধারণ মানুষ কেউই উপকৃত হচ্ছেন না।”
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্পের ঠিকাদার হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তি ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময় থেকে পলাতক রয়েছেন। এছাড়া প্রকল্প পরিচালক মো. আব্দুর রহীমের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা রয়েছে বলেও সূত্রে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও মামলার বিস্তারিত তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
বিয়ানীবাজার পৌরসভার প্রকৌশল অফিসের কর্মকর্তা মামুন আহমদ বলেন, “এই প্রকল্পের কার্যক্রম সম্পর্কে প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের দায়িত্বশীলরা ভালো বলতে পারবেন। আমার দপ্তরে এ বিষয়ে কোনো তথ্য নেই।”
বিয়ানীবাজার উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ডা. মোহাম্মদ আব্দুস শহিদ হোসেন বলেন, “প্রকল্পটি হস্তান্তর করা হলে আমাদের অফিসে কাগজপত্র থাকার কথা। মনে হচ্ছে, প্রকল্পটি এখনো হস্তান্তর হয়নি। প্রকল্পের মেয়াদও শেষ হয়েছে। অন্যান্য উপজেলায় এ প্রকল্প শেষ হলেও বিয়ানীবাজারে কেন শেষ হয়নি, তা খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে।”
প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সরকারি এই প্রকল্প এখন কার্যত অর্ধসমাপ্ত ও অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সরকারি অর্থে নির্মিত এ স্থাপনার নির্মাণকাজ, প্রকল্পের স্থান নির্বাচন, ব্যয় বৃদ্ধি, ঠিকাদারি প্রক্রিয়া, কাজের মান এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের পুরো বিষয়টি যথাযথভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের প্রশ্ন, বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্প শেষ পর্যন্ত জনগণের কাজে আসবে, নাকি আরেকটি পরিত্যক্ত সরকারি স্থাপনা হিসেবেই পড়ে থাকবে—এখন সেটিই দেখার বিষয়।
