প্রথমবার এমপি হয়েই মন্ত্রিত্ব পেলেন মেয়র আরিফুল চৌধুরী

সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক)-এর ওয়ার্ড কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েই জনপ্রতিনিধি হিসেবে লম্বা রেসের ঘোড়া হিসেবে প্রমাণ দেন আরিফুল হক চৌধুরী। সেই ধারাবাহিকতায় একাধিকবার নির্বাচিত হয়েছেন সিসিকের মেয়র।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার কিছুদিন আগে দলীয় নির্দেশে সিলেট-৪ আসনে প্রার্থী হন আরিফুল। বলা চলে সবার শেষে নির্বাচনী মাঠে নেমে সবচেয়ে বড় ব্যবধানের জয় কুড়িয়ে নেন তিনি।

সেই আরিফুল হক এবার হচ্ছেন পূর্ণমন্ত্রী। তাকে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

আজ মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিষয়টি কালের কণ্ঠকে নিজেই নিশ্চিত করেছেন বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সিলেটের এই জনপ্রিয় নেতা।

নির্বাচনে সিলেট-৪ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আরিফুল হক চৌধুরী পান এক লাখ ৮৮ হাজার ৩৪৬ ভোট পান।

তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর মো. জয়নাল আবেদীন দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পান ৬৯ হাজার ৯৭৫ ভোট। দুই প্রার্থীর মধ্যে ভোটের ব্যবধান ছিল এক লাখ ১৮ হাজার ৩৭১।

এর আগে ২০০৩ সালে সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন আরিফুল। কাউন্সিলর থাকা অবস্থায়ই তিনি বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়ে সবার মনোযোগ কাড়েন।

এসময় তিনি নগর উন্নয়ন ও পরিকল্পনা কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি তৎকালীন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের পরম আস্থাভাজন হয়ে উঠেন। সেই সূত্রে সিলেটের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন তিনি।

বিএনপি সরকারের পতনের পর ওয়ান-ইলেভেনের পটভূমিতে আরিফুল কারাবরণ করেন। তবে নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির বাধা ডিঙিয়ে তিনি ফের নিজের অবস্থান শক্ত করেন।

২০১৩ সালে সিলেট সিটি করপোশেন নির্বাচনে তৎকালীন সিটি মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের বিপরীতে প্রার্থী হন। সিসিকের প্রতিষ্ঠাকালীন মেয়র ও একাধিকবারের নির্বাচিত জনপ্রিয়ে পৌর মেয়র ও পরবর্তীতে সিটি মেয়র বদরউদ্দিন কামরানকে হারিয়ে রীতিমতো চমক সৃষ্টি করে সিলেটের মেয়র হন আরিফুল হক। পরবর্তী নির্বাচনেও তিনি কামরানকে পরাস্ত করে দ্বিতীয় মেয়াদে সিসিক মেয়র হন।

মেয়রের দায়িত্ব পালনকালে আরিফুল আমূল পরিবর্তন আনেন সিলেট নগরে। তাঁর নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম সড়কগুলো সম্প্রসারণের পাশাপাশি নগরের ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়। দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালীদের দখলে থাকা ছড়া ও খাল উদ্ধারসহ নানা কাজ করে ব্যাপক প্রসংশিত ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। ২০২৩ সালের সিসিক নির্বাচনে তাঁর প্রার্থী হওয়ার কথা থাকলেও দলের সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি মেয়র পদ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-১ আসনে দলের মনোনয়ন চান আরিফুল হক চৌধুরী। দল এ আসনে না দিলে তিনি অন্য কোনো আসনে নির্বাচন না করার সিদ্ধান্তের কথা জানান। কিন্তু একেবারে শেষ মুহূর্তে গত ৫ নভেম্বর সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নির্দেশে তিনি নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে সিলেট-৪ আসনে প্রার্থী হন। একেবারে সবার শেষে মাঠে নেমে আরিফুল সিলেটে জামায়াতের অন্যতম শক্তিশালী প্রার্থী জয়নাল আবেদীনকে বিপুল ভোটে হারিয়ে সংসদীয় ভোটের মাঠেও চমক দেখান।

আরিফুল হক চৌধুরী ১৯৫৯ সালের ২৩ নভেম্বর সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা সফিকুল হক চৌধুরী এবং মা আমিনা খাতুন। তিন সন্তানের জনক আরিফুল হক ছাত্রজীবনেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠালগ্নে জাতীয়বাদী ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হন। তিনি সিলেট জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক, এরপর সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি, সিলেট জেলা বিএনিপর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক, সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক, সিলেট মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক, জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সাবেক বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন কমিটির বিভাগীয় আহ্বায়কসহ সিলেটের নানা সামাজিক ও সাংষ্কৃতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।

নিজের এতদূর আসার পেছনে জনগণের ভালোবাসাকেই সবচেয়ে বড় শক্তি বলে মনে করেন আরিফুল। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘আমি জনগণের সেবক হতে চেয়েছি। জনগণ সব সময় আমার পাশে ছিলেন। যখনই তাদের কাছে গেছি, তারা অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছেন, আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন।’ তিনি বলেন, ‘নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও দল আমার প্রতি আস্থা রেখেছে, যা আমাকে সবসময় শক্তি যুগিয়েছে। আজ আমি যতটুকু হতে পেরেছি, তার পেছনে সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব আমার দল ও জনগণের। তাদের কাছে আমি আজীবন ঋণী।’

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন