বর্তমান আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা মানুষকে অনেক সুবিধা দিয়েছে, কিন্তু মানুষের প্রতি মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত দায়িত্ববোধকে অনেকাংশে সংকুচিতও করেছে। ফলে আমরা পাশাপাশি বাস করি, কিন্তু একসঙ্গে বাস করি না।
অথচ এমনটি সবসময় ছিল না। একসময় বাংলার জনপদে প্রতিবেশী মানে ছিল প্রয়োজনে প্রথম আশ্রয়, বিপদে প্রথম সহায় এবং আনন্দের প্রথম অংশীদার। নতুন ফসল উঠলে তার ভাগ পৌঁছে যেত পাশের বাড়িতে, অসুস্থতার খবর শুনে মানুষ খোঁজ নিতে ছুটে যেত, কোনো ঘরে শোক নেমে এলে পুরো পাড়া যেন সেই বেদনার ভার ভাগ করে নিত। সমাজ তখন শুধু বাড়িঘরের সমষ্টি ছিল না; ছিল পারস্পরিক মমত্ব, দায়িত্ব ও সহমর্মিতার এক জীবন্ত সংস্কৃতি।
ইসলাম যখন মানবসমাজকে নতুন করে গড়ে তোলার আহ্বান জানায়, তখন এই মানবিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা করে। প্রতিবেশীর প্রতি সদাচরণকে শুধু সামাজিক সৌজন্য হিসেবে নয়, বরং ঈমানের অংশ এবং সভ্যতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে ঘোষণা করে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক কোরো না। আর সদ্ব্যবহার করো পিতা-মাতার সঙ্গে, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে, এতিমদের সঙ্গে, মিসকিনদের সঙ্গে, নিকট প্রতিবেশীর সঙ্গে এবং দূরবর্তী প্রতিবেশীর সঙ্গে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৩৬)
এই আয়াতের ভাষা গভীরভাবে লক্ষ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আল্লাহ তাআলা তাঁর ইবাদতের নির্দেশ দেওয়ার পরপরই মানুষের অধিকারের কথা উল্লেখ করেছেন। যেন মানুষের কাছে এ কথাই পৌঁছে দেওয়া হয়েছে যে, আকাশের রবের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করতে চাইলে মাটির মানুষের প্রতিও দায়িত্বশীল হতে হবে। স্রষ্টার প্রতি আনুগত্য এবং সৃষ্টির প্রতি মমত্ব—ইসলামের দৃষ্টিতে এ দুটো কখনো পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ছিল এই শিক্ষার সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি।
তিনি এমন এক সমাজ গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে একজন মানুষের মর্যাদা শুধু তার ইবাদত দ্বারা নয়, তার সামাজিক আচরণ দ্বারাও মূল্যায়িত হতো। প্রতিবেশীর অধিকারের ব্যাপারে তাঁর উদ্বেগ এতটাই গভীর ছিল যে, আবদুল্লাহ ইবন ওমর (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘জিবরাইল (আ.) আমাকে প্রতিবেশীর ব্যাপারে এত বেশি উপদেশ দিতে থাকলেন যে, আমার ধারণা হয়েছিল তিনি হয়তো প্রতিবেশীকেও উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেবেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬০১৪, সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬২৪)
হাদিসের এই ভাষা শুধু একটি নির্দেশনা নয়; এটি একটি সভ্যতার রূপরেখা। যে সমাজে প্রতিবেশীর অধিকারকে এত গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেখানে সামাজিক বিচ্ছিন্নতার সুযোগ খুব কমই থাকে।
মদিনার সমাজ ছিল সেই আদর্শের বাস্তব রূপ। সেখানে মানুষ কেবল নিজেদের ঘর নির্মাণ করেনি। তারা নির্মাণ করেছিল পারস্পরিক আস্থা ও দায়িত্ববোধের এক অনন্য সংস্কৃতি। একজন ক্ষুধার্ত থাকলে অন্যজন তৃপ্তির সঙ্গে আহার করাকে লজ্জার বিষয় মনে করত। একজন অসুস্থ হলে তার খোঁজ নেওয়া ছিল নৈতিক কর্তব্য। একজন মুসাফিরের আগমন মানে ছিল নতুন এক দায়িত্বের সূচনা।
এই সামাজিক চেতনার প্রতিফলন আমরা খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগেও দেখতে পাই। ইতিহাসবিদ মুহাম্মদ ইবন জারির আত-তাবারি তাঁর তারিখুর রুসুল ওয়াল মুলূক গ্রন্থে এবং ইবনুল জাওজি তাঁর মানাকিবে ওমর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) প্রায়ই রাতের অন্ধকারে মানুষের অবস্থা জানার জন্য বের হতেন। এক রাতে তিনি দূর থেকে শিশুদের কান্নার শব্দ শুনলেন। কাছে গিয়ে দেখলেন, একটি হাঁড়িতে শুধু পানি ফুটছে। অসহায় মা সন্তানদের সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য এমনটি করছেন, যাতে তারা ঘুমিয়ে পড়ে। ঘরে খাবার নেই।
ঘটনাটি শুনে ওমর (রা.) বায়তুল মাল থেকে খাদ্য এনে নিজ কাঁধে বহন করেন। তাঁর সহযোগী যখন খাদ্যের বস্তা বহনের প্রস্তাব দেন, তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘কিয়ামতের দিন আমার বোঝাও কি তুমি বহন করবে?’ এটি শুধু আবেগময় একটি কাহিনি নয়; এটি ইসলামী সমাজদর্শনের এক জীবন্ত দলিল। এখানে শাসক, প্রতিবেশী এবং সমাজ—সবাই এক বৃহত্তর নৈতিক দায়িত্বের অংশ।
মহান মুসলিম মনীষী আবু হামিদ আল-গাজ্জালী তাঁর ইহইয়াউ উলূমিদ্দিন গ্রন্থে প্রতিবেশীর অধিকারের আলোচনা করতে গিয়ে একটি সূক্ষ্ম বিষয়ের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘প্রতিবেশীর হক শুধু তাকে কষ্ট না দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তার কষ্টকে উপলব্ধি করা, প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানো, তার ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা এবং তার সম্মান রক্ষা করাও এর অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ ইসলামের শিক্ষা নিষ্ক্রিয় সহাবস্থানের নয়; বরং সক্রিয় সহমর্মিতার শিক্ষা।
উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংস্কারক শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী তাঁর হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ গ্রন্থে শরিয়তের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন, ইসলামের বহু বিধান মূলত মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করার জন্য প্রণীত। সমাজে আস্থা, সহযোগিতা এবং দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করা শরিয়তের অন্যতম মৌলিক লক্ষ্য।
চতুর্দশ শতাব্দীর চিন্তাবিদ ইবন খালদুন তাঁর বিখ্যাত আল-মুকাদ্দিমাহ গ্রন্থে লিখেছিলেন, কোনো সভ্যতার প্রকৃত শক্তি তার সেনাবাহিনী বা সম্পদে নয়; বরং মানুষের পারস্পরিক সংহতিতে। ইতিহাসের বহু শক্তিশালী সাম্রাজ্য বাহ্যিক জৌলুস থাকা সত্ত্বেও পতনের মুখে পড়েছে, কারণ তাদের সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে গিয়েছিল।
আজকের পৃথিবীর দিকে তাকালে তাঁর এই বিশ্লেষণ নতুন করে ভাবায়। আধুনিক মানুষ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সংযুক্ত, কিন্তু একই সঙ্গে বেশি নিঃসঙ্গ। যোগাযোগের মাধ্যম বেড়েছে, অথচ যোগাযোগের উষ্ণতা কমেছে। সামাজিক মাধ্যমের বন্ধু তালিকা দীর্ঘ হয়েছে, কিন্তু বিপদের সময় দরজায় কড়া নাড়ার মানুষ কমেছে।
আধুনিক মুসলিম চিন্তাবিদ মালেক বেননবী তাঁর রচনায় সভ্যতার সংকটকে মূলত নৈতিক ও সামাজিক সংকট হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, যখন সমাজ থেকে পারস্পরিক দায়িত্ববোধ হারিয়ে যায়, তখন বস্তুগত উন্নতি থাকলেও সভ্যতার ভেতরকার প্রাণশক্তি ক্ষয় হতে শুরু করে।
সম্ভবত এ কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতিবেশীর নিরাপত্তাকে ঈমানের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহর শপথ! সে মুমিন নয়। আল্লাহর শপথ! সে মুমিন নয়। আল্লাহর শপথ! সে মুমিন নয়। সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন, কে সে? তিনি বললেন, যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০১৬)
এই হাদিসে শুধু ক্ষতির কথা বলা হয়নি; বলা হয়েছে নিরাপত্তার কথা। একজন মানুষের উপস্থিতি কি তার আশপাশের মানুষের জন্য স্বস্তির কারণ, নাকি উদ্বেগের কারণ—ইসলাম সেই প্রশ্নটিই সামনে নিয়ে আসে।
আজ যখন পরিবার ছোট হচ্ছে, আত্মীয়তার বন্ধন দুর্বল হচ্ছে এবং মানুষ ক্রমশ ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে, তখন প্রতিবেশীর হক নিয়ে ইসলামের শিক্ষা নতুন তাৎপর্য লাভ করে। কারণ সুস্থ সমাজ গড়ে ওঠে শুধু আইন দিয়ে নয়, মানুষের হৃদয়ে দায়িত্ববোধ জাগ্রত হওয়ার মাধ্যমে। সভ্যতার স্থায়িত্ব শেষ পর্যন্ত ইট-পাথরের উপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে মানুষের পারস্পরিক আস্থার উপর। যে সমাজে প্রতিবেশীর দরজা প্রয়োজনে খোলা থাকে, যেখানে দুর্বল মানুষ নিজেকে একা মনে করে না, যেখানে মানুষের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার সংস্কৃতি জীবিত থাকে—সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী সমাজ। প্রতিবেশীর হক আদায় নিছক একটি নৈতিক শিক্ষা নয়; এটি একটি সভ্যতার আত্মরক্ষার সংগ্রাম। কারণ মানুষ একা বাঁচার জন্য সৃষ্টি হয়নি। তার জীবন পূর্ণতা পায় তখনই, যখন নিজের ঘরের আলো কিছুটা হলেও পাশের ঘরের অন্ধকার দূর করতে পারে।
