প্রাথমিক সমাপনী (পঞ্চম শ্রেণি) পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগেই ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি কার্যক্রম- একটি বিতর্কিত চর্চা আবারও আলোচনায় এসেছে। চুনারুঘাটসহ হবিগঞ্জ জেলার বিভিন্ন সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এ বছরও দেখা গেছে একই চিত্র। ফল প্রকাশ না হলেও ভর্তি ফরম বিতরণ শেষ, অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী মনোনয়ন ও ভর্তি কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের অভিযোগ, এই নিয়মের সূচনা হয়েছিল আগের সরকার আমলে, ২০২১ সালে কেন্দ্রীয়ভাবে জারি করা এক নির্দেশনার মাধ্যমে। তখন সেটিকে ‘অস্থায়ী সিদ্ধান্ত’ বলা হলেও পরবর্তী সময়ে তা স্থায়ী রূপ নেয়। তবে ওই নির্দেশনার কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা বা সংশোধন আজও পাওয়া যায়নি। চুনারুঘাট উপজেলার একাধিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অভিভাবক জানান, তাঁদের সন্তানের পঞ্চম শ্রেণির ফল এখনো প্রকাশ হয়নি। অথচ হবিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, চুনারুঘাট পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, ডিসিপি উচ্চ বিদ্যালয়, রাজার বাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বিজ্ঞপ্তি টাঙিয়ে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানানো হয় আজ ২১ ডিসেম্বর ভর্তির শেষ তারিখ। এতে অনেই আজ ভর্তিও করেন।
অভিভাবক লাইজু বেগম বলেন, তাঁর মেয়ের পঞ্চম শ্রেণির ফল আগামী ৩০ ডিসেম্বর প্রকাশ হওয়ার কথা। কিন্তু ভর্তি ফরম সংগ্রহ করতে গিয়ে জানতে পারেন, ফরম বিতরণ শুরু হয়েছিল ১২ ডিসেম্বর এবং এক সপ্তাহ আগেই শেষ হয়েছে। ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভর্তির সময় নির্ধারণ করা হয়। তাঁর প্রশ্ন, ফল প্রকাশের আগেই যদি ভর্তি নির্বাচন সম্পন্ন হয়, তাহলে মেধার মূল্য কোথায়? একই ধরনের অভিযোগ করেন অভিভাবক জাহাঙ্গীর আলম। তাঁর মতে, ফল প্রকাশের আগেই ভর্তি চূড়ান্ত হলে দরিদ্র ও সাধারণ পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীরা ন্যায্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক বলেন, ফল ছাড়া ভর্তি মানেই মেধাভিত্তিক মূল্যায়ন থেকে সরে আসা। কিন্তু এই বিষয়ে শিক্ষকরা প্রকাশ্যে কথা বলার সুযোগ পান না। শিক্ষাবিদ উপাধ্যক্ষ মোজাম্মেল হক বলেন, যে নিয়ম মেধা ও ন্যায়ের বিরুদ্ধে যায়, তা যে সরকারের আমলেই হোক না কেন, পুনর্বিবেচনা জরুরি। সচেতন নাগরিক সাইফুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে লটারির পদ্ধতি প্রয়োগ করা হচ্ছে। এতে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী বাদ পড়ে যাচ্ছে, আবার তুলনামূলক কম সক্ষম শিক্ষার্থীরা সুযোগ পাচ্ছে। এতে শিক্ষার মান ও ন্যায্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
হবিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. খলিলুর রহমান বলেন, ফলের আগে ভর্তি করার নিয়ম নেই- এটি তিনি স্বীকার করেন। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুযায়ী লটারির মাধ্যমে প্রাথমিক মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে। ফল প্রকাশের পর কেউ অকৃতকার্য হলে ওয়েটিং লিস্ট থেকে ভর্তি দেওয়া হবে। চুনারুঘাট উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কাওছার শোকরানা বলেন, বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার আওতায় পড়ে এবং সংশ্লিষ্টরা বাধ্য হয়েই তা বাস্তবায়ন করছেন। অন্যদিকে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নাজনীন সুলতানা জানান, পঞ্চম শ্রেণির ফল প্রস্তুত করতে সময় লাগে এবং আগামী ৩০ ডিসেম্বর মা সমাবেশের মাধ্যমে ফল প্রকাশ করা হবে। ফল প্রকাশের আগে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনার কোনো সিদ্ধান্ত তাঁদের দপ্তর নেয়নি। জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফরিদা নাজমিন বলেন, ২০২১ সাল থেকে মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী ভর্তি কার্যক্রম চলছে। তবে ফল প্রকাশের আগে ভর্তি নিয়মসম্মত কি না- এ প্রশ্নে তিনি স্পষ্ট মন্তব্য এড়িয়ে যান।
হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক আবু হাসনাত মোহাম্মদ আরেফীন বলেন, ফল প্রকাশের আগে ভর্তি করার কোনো নিয়ম নেই। বিষয়টি জেলা প্রশাসনের নজরে এসেছে এবং প্রাপ্ত অভিযোগগুলো পর্যালোচনা করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা হবে। ফল প্রকাশের আগেই ভর্তি সংক্রান্ত যেকোনো আনুষ্ঠানিক বা আধা-আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম প্রশাসনিক অনিয়মের শামিল। এতে সমান সুযোগ ও মেধাভিত্তিক নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হয়, যা সংবিধানের মৌলিক নীতির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
আইনজীবী শফিউল আলম আজাদের মতে, নীতির অস্পষ্টতা রেখে ভর্তি কার্যক্রম চালালে এর দায় শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ওপরই পড়ে। এতে শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়। পঞ্চম শ্রেণির ফল প্রকাশের আগেই ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি শুধু একটি প্রশাসনিক ত্রুটি নয়; এটি শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি। স্বচ্ছ নীতিমালা, লিখিত নির্দেশনা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এই অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে। এখন প্রশ্ন- বিতর্কিত এই নিয়ম সংস্কারে বর্তমান প্রশাসন কি কার্যকর পদক্ষেপ নেবে?
