রোজা ফরজ হওয়ার হিকমত ও তাৎপর্য

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের বিশ্বাস হলো, শরিয়তের বিধি-বিধান তথা আল্লাহর আদেশ-নিষেধ ও নির্দেশনাগুলো হিকমত (প্রজ্ঞা) ও মাসলাহাতের (কল্যাণ) ধারক। আল্লাহ নিজের জ্ঞান ও প্রজ্ঞার আলোকে বান্দার কল্যাণেই শরিয়তের বিধান দান করেছেন। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেছেন, ‘মহান আল্লাহ তাঁর সব কাজই নিজের প্রজ্ঞার আলোকে করেন। তিনি কোনো অন্যায় ও অনর্থক কাজ করেন না।’ (ফিকহুল আকবর)

সে হিসেবে বলা যায়, রমজানের রোজা পালনের মধ্যেও বান্দার প্রভূত কল্যাণ নিহিত আছে।

রোজার উপকার ও তাৎপর্য

রমজান মাসে সিয়াম সাধনার কয়েকটি উপকার ও তাৎপর্য বর্ণনা করা হলো—

১. আল্লাহর আনুগত্য ও সন্তুষ্টি অর্জন : বান্দার প্রতিটি ইবাদতের প্রধান উদ্দেশ্য আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রকাশের মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করা। রোজার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর প্রতি সর্বোচ্চ আনুগত্য প্রকাশ করে। কেননা প্রবৃত্তির তাড়না থাকার পরও সে গোপনেও আল্লাহর অবাধ্য হয়ে পানাহার করে না।এ জন্য আল্লাহ বলেছেন, ‘মানবসন্তানের প্রতিটি আমল তার জন্য, শুধু রোজা আমার জন্য এবং আমিই তার প্রতিদান দিই। নিশ্চয়ই সে আমার জন্য খাবার ও পানীয় পরিহার করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৮৯৪)

২. তাকওয়া অর্জন : রোজা পালনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া অর্জন করা। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘হে মুমিনরা! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমনি ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পারো। (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৮৩)

প্রাজ্ঞ আলেমরা বলেন, তাকওয়া হলো প্রতি কাজের আগে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির বিবেচনা করা এবং আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন এমন কাজগুলো পরিহার করা।

৩. মন্দ প্রবৃত্তি থেকে বেঁচে থাকা : শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভি (রহ.) বলেছেন, মানুষের ভেতরের পাশবিক প্রবৃত্তি মানুষকে মানবিক গুণাবলি অর্জন করতে এবং ফেরেশতা স্বভাবের অনুসণ করতে বাধা দেয়। মানুষ যখন ক্ষুধা-পিপাসা অবলম্বন করার মাধ্যমে, নারীর সাহচর্য ত্যাগ করে এবং নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পাশবিক প্রবৃত্তিকে দুর্বল করে এবং আত্মসংযম অর্জন করে; আর এটাও রোজার অন্যতম উদ্দেশ্য। এ জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে মিথ্যা কথা, মন্দ কাজ ও মূর্খতা ত্যাগ করতে পারল না, তার পানাহার ত্যাগে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৯০৩)

৪. আল্লাহর স্মরণ ও ইবাদত : অধিক ভোজন, ভোগ-বিলাসিতা মানুষকে আল্লাহর স্মরণ ও ইবাদত থেকে বিমুখ করে। ইসলাম বছরের সব সময় পরিমিত খাবার গ্রহণ করতে বলেছে এবং রমজানে এক মাস সিয়াম সাধনার নির্দেশ দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আদম সন্তান পেটের চেয়ে নিকৃষ্ট কোনো পাত্র পূর্ণ করে না। অথচ আদম সন্তানের জন্য মেরুদণ্ড সোজা থাকে এমন কয়েক লোকমা খাদ্যই যথেষ্ট। অগত্যা যদি খেতেই হয়, তাহলে পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাদ্যের জন্য, অপর তৃতীয়াংশ পানীয়ের জন্য এবং বাকি তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য রাখবে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৩৮০)

৫. আত্মিক পরিশুদ্ধি লাভ : যেহেতু ভোজন, ভোগ ও বিলাসিতা মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ করে, তাই এর মাধ্যমে বান্দার অন্তর কলুষিত হয়। বিপরীতে বান্দা যখন পাশবিক চাহিদাগুলো পরিহার করে তখন তার আত্মা পরিশুদ্ধ হয়। আবু সুলাইমান দারানি (রহ.) বলেন, ‘যখন নফস ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত থাকে তখন অন্তর স্বচ্ছ ও কোমল থাকে। আর যখন খাবারে পরিপূর্ণ ও পরিতৃপ্ত থাকে তখন অন্তর অন্ধ থাকে।’ (জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম : ৯/২৬)

৬. আল্লাহর নিয়ামতের উপলব্ধি: সিয়ামের অন্যতম একটি হিকমত হলো, এর মাধ্যমে ধনী ব্যক্তি তার প্রতি আল্লাহর দেওয়া ধন-সম্পদের মর্যাদা বুঝতে পারে। যেহেতু আল্লাহ তাআলা তাকে খাদ্য, পানীয় ও স্ত্রীর মতো নিয়ামত প্রদান করেছেন, যা থেকে সৃষ্টি জগতের অনেকেই বঞ্চিত রয়েছে। রোজা রাখার পর সে বঞ্চিত মানুষের কষ্ট উপলব্ধি করতে পারে। ফলে সে তাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে, যদ্বারা তারা নিজেদের লজ্জা নিবারণ করবে ও ক্ষুধা মেটাবে।

৭. আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশিক্ষণ: রোজা ফরজ হওয়ার একটি হিকমত হলো এটি আত্মনিয়ন্ত্রণের অনুশীলন। মানবজীবনে সৌভাগ্য অর্জন করতে হলে আত্মনিয়ন্ত্রণের কোনো বিকল্প নেই। পবিত্র কোরআনের একাধিক আয়াতে মানুষকে আত্মনিয়ন্ত্রণ অর্জনে উৎসাহিত করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে স্বীয় প্রতিপালকের সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে এবং প্রবৃত্তি থেকে নিজেকে বিরত রাখে, জান্নাতই হবে তার আবাস।’ (সুরা : নাজিয়াত, আয়াত : ৪০-৪১)

৮. শয়তানের প্রভাব কমে : হাদিসে এসেছে, রমজান এলে শয়তান বন্দি হয়। এর একটি ব্যাখ্যা হলো মানুষের ওপর শয়তানের প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা কমে। কেননা হাদিসে এসেছে, ‘শয়তান আদম সন্তানের রক্তের সঙ্গে শিরা-উপশিরা দিয়ে চলাচল করে।’ (সহিহ বুখারি)

রোজা রাখলে ক্ষুধা-তৃষ্ণার কারণে মানুষের রক্ত চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে পড়ে। ফলে দেহের অভ্যন্তরে শয়তানের চলাচলের পথ সংকীর্ণ হয়ে যায়।

৯. চারিত্রিক রক্ষাকবচ : রোজা মানুষের চরিত্র রক্ষায় সহায়তা করে। এ জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) যুবকদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘হে যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি বিবাহ করতে সক্ষম, সে যেন বিয়ে করে। কেননা তা দৃষ্টি অবনত রাখে ও লজ্জাস্থান হেফাজত করে। আর যে বিবাহ করতে সক্ষম নয়, সে যেন সিয়াম পালন করে। কেননা সিয়াম তাকে কামভাব থেকে বিরত রাখবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৯০৫)

১০. স্বাস্থ্যগত উপকার : ডা. তাসনিম জারা তাঁর এক আলোচনায় রোজার সাতটি উপকারের কথা বলেছেন। সেগুলো হচ্ছে—১. তারুণ্য ধরে রাখা, ২. শরীরের চর্বি কমান, ৩. পেটের স্বাস্থ্য ভালো হওয়া, ৪. ওজন কমানো, ৫. রক্তে সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ, ৬. কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ, ৭. ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণ।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন