সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলায় মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ঘটে যাওয়া দুটি পৃথক হত্যাকাণ্ডে জনমনে শোক, ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। এক ঘটনায় বাবার হাতে প্রাণ হারিয়েছে ১৭ বছরের এক কিশোরী, অন্য ঘটনায় পাওনা টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে নিহত হয়েছেন এক ব্যবসায়ী। প্রথম ঘটনায় অভিযুক্ত বাবাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ, আর দ্বিতীয় ঘটনায় অভিযুক্ত এখনও পলাতক।
পুলিশ জানায়, কিশোরী রায়কা আক্তার রিয়া (১৭) হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ও তার বাবা আবু বক্কর (৪৫)-কে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় গ্রেফতার করা হয়েছে। সিলেটের পুলিশ সুপার ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপারদের সার্বিক নির্দেশনা ও তদারকিতে পরিচালিত অভিযানে তাকে আটক করা হয়। রবিবার আদালতে হাজির করা হলে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
নিহত রিয়া গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঢাকা দক্ষিণ ইউনিয়নের উত্তর রায়গড় এলাকার সিএনজিচালক আবু বক্করের মেয়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, শুক্রবার (১০ জুলাই) জুমার নামাজের সময় নানাবাড়ির পুকুরঘাটে গোসল করতে গেলে তার বাবা ধারালো দা দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করেন। হামলায় রিয়ার ডান হাতের কবজি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং ঘাড়সহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত লাগে। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। হত্যার পর আবু বক্কর পালিয়ে গেলেও পরে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট ও স্থানীয় সূত্র জানায়, অল্প বয়সে রিয়া ভাদেশ্বর এলাকার শাহিন আহমদের সঙ্গে পরিবারের অমতে বিয়ে করেছিলেন। পরে দাম্পত্য কলহের কারণে তিনি বাবার বাড়িতে ফিরে এসে নানাবাড়িতে বসবাস শুরু করেন। সম্প্রতি আবারও স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলে পরিবারে নতুন করে বিরোধ সৃষ্টি হয়। স্থানীয়দের ধারণা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, সামাজিক চাপ ও সম্মানহানির আশঙ্কাসহ বিভিন্ন বিষয় এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে হত্যার প্রকৃত কারণ তদন্ত শেষে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
এ ঘটনায় নিহতের মা বাদী হয়ে বিয়ানীবাজার থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুজাফর মোহাম্মদ মাহফুজুল কবির জানান, গ্রেফতারকৃত আসামিকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, শনিবার (১১ জুলাই) রাত আনুমানিক ৮টার দিকে উপজেলার তিলপাড়া ইউনিয়নের বিবিরাই বাজারে পাওনা টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ী আলী হোসেন (৪০) নিহত হন।
নিহত আলী হোসেন স্থানীয় বাসিন্দা নজির উদ্দিনের ছেলে। তিনি ‘আলী হোসেন ভ্যারাইটিজ স্টোর’ নামে একটি দোকান পরিচালনার পাশাপাশি ডিজেল ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ট্রাক্টরচালক শাহিনুল ইসলামের কাছে বাকিতে দেওয়া ডিজেলের পাওনা টাকা চাইতে গেলে দুজনের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। একপর্যায়ে শাহিনুল ইসলাম আলী হোসেনকে ঘুষি মারলে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার করার চেষ্টা করলেও ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুজাফর মোহাম্মদ মাহফুজুল কবির জানান, আলী হোসেন হত্যা মামলায় বিয়ানীবাজার থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। ঘটনার পর থেকেই শাহিনুল ইসলাম পলাতক রয়েছেন। পুলিশ, তাকে গ্রেফতারের জন্য অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
পরপর দুটি হত্যাকাণ্ডে বিয়ানীবাজারজুড়ে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা দ্রুত দুই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ করে অভিযুক্তদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, পারিবারিক বিরোধ কিংবা সামান্য আর্থিক লেনদেন—কোনো কারণেই এমন নৃশংস প্রাণহানি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
