পবিত্র রমজান বিদায় নিতে চলেছে। কিন্তু আমাদের সামনে রেখে যাচ্ছে অশ্রুসিক্ত কিছু রাত, দীর্ঘ সিজদার অনেক স্মৃতি, কোরআনের সুরে ভেজা হৃদয় আর আল্লাহর কাছে ফিরে আসার এক গভীর অনুভূতি। আজ যে হাতগুলো ইফতারের আগে দোয়ায় রবের দরবারে মিনতি ভরে উত্তিত হয়, যে চোখগুলো তাহাজ্জুদের নীরবতায় অশ্রুসজল হয়, যে হৃদয় গুনাহ থেকে ফিরে আসার প্রতিজ্ঞায় দৃঢ়তা ধারণ করে চলতে চাইছে। সেই অবস্থান কি রমজান শেষেও থাকবে? নাকি ঈদের আনন্দের ভিড়ে ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাবে সেই আত্মশুদ্ধির আলো?
মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বলেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো। ” (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৩)
রমজানের ল লক্ষ্যই ছিল এই তাকওয়া অর্জন। কিন্তু তাকওয়া যদি শুধু একটি মাসে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা পূর্ণতা পায় না। বরং তাকওয়া হলো এমন এক গুণ, যা মুমিনের প্রতিটি দিন ও প্রতিটি কাজে প্রতিফলিত হওয়া উচিত।মহান আল্লাহ আরো বলেন, “আর তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করো, যতক্ষণ না তোমার কাছে মৃত্যু আসে।” (সুরা হিজর, আয়াত: ৯৯)
এই আয়াত আমাদের স্পষ্ট করে দেয় যে, ইবাদতের কোনো ‘শেষ’ নেই। রমজান শেষ হলেও বান্দার ইবাদত শেষ হতে পারে না। বরং রমজান আমাদের শিখিয়ে দিয়েছে কিভাবে বছরের বাকি সময়গুলোতেও আল্লাহর পথে অবিচল থাকা যায়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, “আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো তা-ই, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে কম হয়। (বুখারি, হাদিস: ৬৪৬৪)
এই হাদিসে আমলের ধারাবাহিকতার গুরুত্ব অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। রমজানে আমাদের অনেকেই অনেক ইবাদত করছি। কিন্তু আসল সফলতা হলো সেই আমলগুলোকে রমজানের পরেও অব্যাহত রাখা, যদিও তা অল্প পরিমাণে হয়।
আরেক হাদিসে এসেছে, “যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখার পর শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখে, সে যেন সারা বছর রোজা রাখল।” (মুসলিম, হাদিস: ১১৬৪)
এটি আমাদের জন্য একটি বাস্তব উদাহরণ; কীভাবে রমজানের পরও আমলের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা যায় এবং তা আল্লাহর কাছে কত মূল্যবান।
প্রিয় পাঠক, রমজান আমাদের পরিবর্তনের একটি সুযোগ দিয়েছিল। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- আমরা কি সেই পরিবর্তনকে ধরে রাখতে পারব? নাকি আবার পুরনো জীবনে ফিরে যাব? মনে রাখতে হবে, ঈমান স্থির নয়; এটি বাড়ে ও কমে। যত্ন না নিলে এটি দুর্বল হয়ে পড়ে।
চলুন আমরা প্রতিজ্ঞা করি যে, প্রতিদিন অন্তত অল্প সময়ের জন্য হলেও কোরআনের সঙ্গে থাকব, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত যথাসময়ে আদায় করব, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করব এবং আল্লাহর স্মরণে নিজেদের হৃদয়কে জীবিত রাখব।
প্রিয় পাঠক! আসুন আজ, এই মুহূর্তে নিজেকে একটি প্রশ্ন করি: “রমজানের যে আমি আছি, রমজানের পরও কি আমি সেই আমি হিসেবে থাকব? নাকি নিজেকে হারিয়ে ফেলব? যদি উত্তর ‘না’ হয়, তবে এখনই সময় দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করার। এখনই সময় ইবাদতে ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রত্যয় গ্রহণ করার।
আসুন, আমরা রমজানকে বিদায় না দিয়ে; রমজানের শিক্ষা, রমজানের আমল, রমজানের সেই পবিত্র অনুভূতিকে সারা জীবনের সঙ্গী করে নিই। আল্লাহ আমাদের সবাইকে আমলের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার তাওফিক দান করুন। আমিন।
