
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার কাঠইর ইউনিয়নের এরালিয়া গ্রামে হতদরিদ্র পরিবারকে ঋণের টাকা দেয়ার নামে প্রতারণা করে সাদা ষ্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে ঋণগ্রহিতার বসত ভিটা রেজিস্ট্রি করার অভিযোগ উঠেছে এক প্রভাবশালী বিএনপি নেতা ও তার ব্যবসায়কি অংশীদারের বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত বিএনপি নেতা মোশাহিদ আলী এরালিয়া গ্রামের মৃত ফজর আলীর পুত্র। তিনি সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার কাঠইর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি। অপর অভিযুক্ত ব্যক্তি মোস্তাকিন মিয়া একই ইউনিয়নের চুয়াপুর গ্রামের মৃত শের মামদের পুত্র।
ভূক্তভোগী পরিবার ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার এরালিয়া গ্রামের বাসিন্দা মোঃ সিরাজুল ইসলাম একজন হতদরিদ্র লোক এবং হাঁসের খামারের মাধ্যমে হাঁস লালন পালন করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছিলেন। হতদরিদ্র সিরাজুল ইসলামের পরিবারে ৬ কন্যা, ২ পুত্র ও বৃদ্ধা মায়ের ভরণ পোষন ও বিগত ২০১৩ সনে হাঁসের খামারে আর্থিক ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ায় মোঃ সিরাজুল ইসলাম স্থানীয় এনজিও’র মাধ্যমে ঋণ গ্রহণের চেষ্টা করেন। ভূক্তভোগী মোঃ সিরাজুল ইসলামের অসহায়ত্বের সুযোগে একই গ্রামের বিএনপি নেতা মোশাহিদ মিয়া তাকে ঋণ দিবেন বলে আশ্বস্থ করেন।
পরে মোশাহিদ মিয়া ও তার ব্যবসায়ীক অংশিদার মোস্তাকিন মিয়া সুনামগঞ্জ শহরে ভূক্তভোগী মোঃ সিরাজুল ইসলাম ও তার মা মোছাঃ আয়শা বেগমকে বাৎসরিক শতকরা ১৩ পার্সেন্ট হারে দুই বৎসর মেয়াদী দুই লক্ষ টাকা ঋণ দেয় এবং ঋণ দেয়ার সময় একাধিক নন জুডিসিয়াল ষ্ট্যাম্পে ভূক্তভোগী মোঃ সিরাজুল ইসলাম ও তার মা মোছাঃ আয়শা বেগমের স্বাক্ষর নেয়। পরবর্তীতে দুই বছর অতিবাহিত হওয়ার পর ভূক্তভোগী মোঃ সিরাজুল ইসলাম তাঁর ঋণের দুই লক্ষ টাকা লাভ সহ মোশাহিদ মিয়ার কাছে ফিরত দিতে গেলে মোশাহিদ মিয়া ও তাহার ব্যবসায়ীক অংশীদার মোস্তাকিন মিয়া সময় ক্ষেপন করতে থাকে।
একপর্যায়ে ভূক্তভোগী মোঃ সিরাজুল ইসলাম তাহার বসত ভিটায় থাকা বাঁশঝাড় কাটতে গেলে মোশাহিদ মিয়া এতে বাঁধা দেয় এবং তাঁর জায়গা ও বসত বাড়ীর মালিকানা দাবী করে। পরে ভূক্তভোগী পরিবার জানতে পারে, ঋণদেয়ার কথা বলে মোঃ সিরাজুল ইসলাম ও তার মা মোছাঃ আয়শা বেগমের সাদা ষ্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে মোশাহিদ মিয়া নিজের নামে কোন কিছু না করে তাহার শ্যালক শান্তিগঞ্জ উপজেলার শিমুলবাক ইউনিয়নের আমড়িয়া গ্রামের কালন মিয়ার ছেলে হোসাইন আহমদ ও মোশাহিদ মিয়ার ব্যবসায়ীক অংশীদার মোস্তাকিন মিয়া তাহার নামে কোন কিছু না করে তাঁর শ্যালক দিরাই থানাধীন সাদিপুর গ্রামের আলতাব মিয়ার ছেলে মোঃ জায়ফর মিয়ার নামে ভূক্তভোগী পরিবারের ২২ শতাংশ বসত ভিটা ও ভূমি তাদের অগোচরে রেজিস্ট্রি করে নিয়ে গেছে।
বসত ভিটা ও সম্পদ হারানোর শোকে গত ৪ বছর পূর্বে ভূক্তভোগী মোঃ সিরাজুল ইসলামের মা মোছাঃ আয়শা বেগম মারা যান। ঋণের কথা বলে বসত ভিটা রেজিস্ট্রি করে নেওয়ার ঘটনা জানাজানি হলে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় এবং স্থানীয় ভাবে ইউপি চেয়ারম্যান সহ একাধিকবার গ্রাম্য ভাবে আপোষ মিমাংসার চেষ্টা করা হলেও মোশাহিদ মিয়া, তাহার ব্যবসায়ীক অংশিদার মোস্তাকিন মিয়া সহ তাহাদের শ্যালক দলিল গ্রহিতা হোসাইন আহমদ ও মোঃ জায়ফর মিয়া শালিস বৈঠকে না এসে এড়িয়ে যেতে থাকে। পরবর্তীতে ভূক্তভোগী সিরাজুল ইসলাম নিজ বসত ভিটা হারনোর শোকে মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়েন এবং গত শুক্রবার (১৬ জানুয়ারী) সন্ধ্যায় স্টোক করে ৫০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। এমন প্রতারণার মাধ্যমে সম্পদ আত্মসাৎ করায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
অভিযুক্ত কাঠইর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মোশাহিদ মিয়া বলেন, দলিল যার, জায়গা তার। প্রতারণার কোন প্রশ্নই আসে না। আমি দলিলে কোন সাক্ষীও না। আমার কোন স্বাক্ষরও নাই। প্রতারণা করে থাকলে সাব রেজিস্ট্রারে বুঝবে। আমি কিছু জানি না।
ভূক্তভোগী সিরাজুল ইসলামের স্ত্রী মোসাদ্দিকা বলেন, আমার ৬ মেয়ে ও ২ ছেলে। আমার স্বামী সিরাজুল ইসলাম আমাদের পারিবারের জীবিকা নির্বাহ করতেন। আমার স্বামী ও শাশুড়ীকে ঋণ দেয়ার কথা বলে আমাদের গ্রামের মোশাহিদ ষ্ট্যাম্পে দস্তখত নিয়ে দলিল করে নিয়েছে। এখন আমার স্বামী বিচার না পেয়ে ষ্টোক করে মারা গেছেন। আমি এখন কার কাছে যাবো। আমি আমার সন্তানকে কিভাবে লালন পালন করবো। আমি এর বিচার চাই।
এরালিয়া গ্রামের বাসিন্দা ইছাক আলী, রইছ মিয়া, জামলাবাজ গ্রামের আফতাবুজ্জামান জানান, মোশাহিদ মিয়া একজন খারাপ প্রকৃতির লোক। সে সিরাজুল ইসলাম ও তার মা মোছাঃ আয়শা বেগম কোন লেখা পড়া জানেন না। সেই সুযোগে দুই লক্ষ টাকা ঋণ দেয়ার কথা বলে ষ্ট্যাম্প করে তাহাদের সম্পত্তি হাতিয়েছে। একটা খুবই নিন্দনীয় কাজ। সঠিক সময়ে সঠিক বিচার না পাওয়ায় আজ সিরাজুল ইসলামকেও মরতে হলো।
কাঠইর ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মকতছির আলী বলেন, ঋণ দেয়ার নামে প্রতারণা করে রেজিস্ট্রি করে নেওয়ার বিষয়টি বিচার শালিসে প্রমাণিত হয়েছে। অভিযুক্ত মোশাহিদ ও তার লোকজনকে বিচার শালিসে একাধিবার উপস্থিত থাকার চেষ্টা করা হলেও তারা আসে নাই। বার বার বিচার চাইতে গিয়ে কোন বিচার না পেয়ে সিরাজুল ইসলাম ও তার মা অকালে মারা গেছেন। এটা খুবই দুঃজনক। এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে এর প্রতিবাদ জানাই।
কাঠরই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মুফতি মাওলানা শামছুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি আমি অবগত হয়েছি বিগত ৪/৫ বছর ধরে আমি সামাধানের চেষ্টা করেছি। কিন্তু অভিযুক্তদের বার বার বিচার শালিসে আমন্ত্রন করা হলে তারা আসে নাই। তবে মোশাহিদ মিয়া ও তার লোকজন ভূক্তভোগী পরিবারে জমি প্রতারণা করে দলিল বানিয়েছে। সেটা প্রমাণিত। ভূক্তভোগী পরিবার তাহাদের জমি কারো কাছে বিক্রি করে নাই।