বিখ্যাত নবাব বাড়ীর কথা সকলেই জানে। তাদের নিষ্ঠুর নির্যাতনের কথা ইতিহাস হয়ে আছে। খাজনা না দেওয়ার কারণে দরিদ্র প্রজাদের উপর অত্যাচার, নির্যাতনের অংশ হিসেব প্রজাদের বৃষ্টিতে ভিজিয়ে, রোদে শুকিয়ে দিন-রাত দাস-দাসীর মতো কাজ করনো হতো। নবাব বাড়ীর রাস্তা দিয়ে কেউ পায়ে খড়ম পরে কিংবা মাথায় ছাতা টানিয়ে গেলে একশ’ একবার কান মুচড়া দেওয়া হতো আর দ্বিতীয় বার কেউ এ ধরণের ভুল করলে তাকে একশ’ একটি চাবুক মেরে নবাব বাড়ীর অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে বিতাড়িত করা হতো। এ ধরণের অকথ্য অত্যাচার আর নির্যাতন সইতে হয়েছে প্রজাদের।
নবাব বাড়ীর উত্তরাধিকারী ও নবাবের একমাত্র পুত্রসন্তান নবাবপুত্র “যুগল নবাবে”র ঢাক-ঢোল পিটিয়ে শাদি দেয়া হল আরেক নবাবকন্যা রূপসী মালতির সাথে। কিন্তু যুগল নবাব ও মালতির বিয়ের বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও তাদের কোন সন্তান জন্মগ্রহণ করছে না। যুগল নবাব প্রজাদের আদেশ করলেন, ঢাক-ঢোল পিটিয়ে সকল কবিরাজকে এলান করে দাও-আমার স্ত্রীর গর্ভে একটি সন্তান যে এনে দেবে তাকে নবাব বাড়ীর আওতাধীন একটি পরগণা উপহার দেয়া হবে। একে একে করে সব কবিরাজ নবাবের এ প্রস্তাব পূরণে ব্যর্থ হলো। অর্ধযুগ গত হয়ে যায় কিন্তু কোন লাভ হয় না। যুগল নবাবের এক নায়েক একজন দরবেশের কথা বলে, যে এই কঠিন কাজ করতে পারবে। যুগল নবাব সেই নায়েককে কথিত দরবেশের কাছে যেতে আদেশ করেন। নায়েক ফিরে এলে দরবেশের দেয়া দিন-তারিখ মতো নবাব ও তার স্ত্রী দরবেশের শরণাপন্ন হলেন। দরবেশ তাদেরকে দেখে বলে দিলেন তাদের মনের বাসনা।
দরবেশ বললেন, নবাব বাড়ীর নদীর ঘাটে একটি জবা ফুলের গাছ আছে। পূর্ণিমার রাতে জবা ফুলের গাছের নিচে যতটি ঝরা ফুল পাবে সেগুলো নিয়ে আসতে। অনেক দিন পর এলো কাঙ্কিত পূর্ণিমার রাত। স্বামী-স্ত্রী দু’জন মিলে সেই পূর্ণিমার নিশিরাতে গেলেন ঝরা জবা ফুলগুলো তুলে আনতে। এদিকে ফুলগাছের নিচে প্রতি বৎসর পূর্ণিমার রাতে ভূত ও ভূতের স্ত্রী দু’জনে মিলিত হতো। এই সময়ে যুগল নবাব ও মালতি সেখানে গেলে ভূত ও ভূতের স্ত্রী ভিষণ বিরক্ত হয়।। নবাব যুগল ও তার স্ত্রী গাছের নিচে থাকা ১২টি ঝরা জবা ফুল কুড়িয়ে নিয়ে আসার সময় ভূত আর ভূতের স্ত্রী উত্তেজিত হয়ে বলে, আমাদের সহবাসে বিঘ্ন ঘটানোর অপরাধে তোমাদের নির্বংশ করে দিবে এবং এই কথাগুলো যেন তারা মনে রাখে। ভূত ও ভূতের স্ত্রীর এই কথাকে কোন পাত্তা না দিয়ে কুড়ানো ফুলগুলো নিয়ে যুগল নবাব ও তার স্ত্রী হাজির হলেন দরবেশের কাছে। দরবেশ হাত বাড়িয়ে ফুলগুলো গুণে দেখেন ১২টি ফুলই রয়েছে।
দরবেশ বললেন, ১২ মৌজার মাঝখানে বিশাল বড় একটি পুকুর খনন করবে যেখানে সব প্রজারা সহজে হাত বাড়ালে পানি পায়। পুকরের মাঝখানে থাকবে একটি ময়ূরপংকি নাও। যে সন্তান হবে তাকে সেই নাওয়ে তুলে পুকুরের পানিতে গোসল করিয়ে এক যুগ নবাব বাড়ীর অন্দর মহলের ভিতরে এমনভাবে রাখতে হবে যেন সূরে্যর আলো তার গায়ে না লাগে। যুগল নবাব নবাবখানায় হাজির হয়ে প্রজাদেরকে হুকুম দিয়ে বললেন, পুকুর খনন করার জন্য। পুকুর খনন করতে এক যুগ পার হয়ে গেল। পুকুরটি এত বিশাল হলো যে এক পার থেকে অন্য পার দুচোখ দিয়ে দেখা যায় না। তাই পুকুরের নাম দেয়া হল সাগরদীঘি। একদিন নবারে স্ত্রী মালতির গর্ভ থেকে সুন্দর একটি মেয়েশিশু জন্ম নিল। জন্মের পর সাগরদীঘিতে নিয়ে ময়ূরপংকি নাওয়ে করে মেয়েশিশুকে গোসল করানো হল। যুগল নবাব ও মালতির একমাত্র শিশুকন্যার নাম দেয়া হল খনন করা পুকুরের নামের সাথে মিল রেখে “সাগরিকা”। যুগল নবাব মালতিকে আদেশ করলেন, এক যুগের এক দিন আগেও যেন কোন প্রকারে মা ও মেয়ে সাগরিকা নবাবখানার বাইরে যেন না যায়। দিন যায়, রাত আসে। সাগরিকা বড় হতে লাগলো। নবাবখানার ভিতরে তো আধা যুগ পার হয়ে গেল। সাগরিকা সবকিছু বুঝতে লাগল। এদিকে ভুততো কত কৌশল করছে সাগরিকাকে নেওয়ার জন্য কিন্তু কোন কৌশলেই কাজ হচ্ছে না। তখন ভূত একটি নতুন কৌশল অবলম্বন করল। প্রতিদিন রাতের বেলা ভূত মধুর সুরে বাঁশি বাজাতে লাগরো মানুষের রূপ নিয়ে। সাগরিকার নাম ধরে ভূত বাঁশি বাজাতে লাগলো। তাতে সাগরিকার খুব ভাল লাগতো। দিনের বেলা মোটেও তার মোটেও ভাল লাগতো না। কারণ দিনের বেলা ভূত বাঁশি বাজাতো না। বাঁশির সুর শুনার জন্য প্রতিরাত সাগরিকা অপেক্ষা করত। একদিন নিশিরাতে বাঁশির সুর শুনে নবাবখানা থেকে সাগরিকা বাইরে যেতে চাইল। পাহারাদারের চোখে ধরা পড়ে গেলে সাগরিকা। পাহারাদার তাকে না চিনে চোর চোর বলে চিৎকার দিলে সবাই এসে দেখে এতো চোর নয় “সাগরিকা”। আবার নবাবখানার বন্দীশালায় ঢুকতে হলো সাগরিকাকে। সে একদিন তার মা মালতিকে জিজ্ঞাসা করল-মা, তুমি আর আমি কেন এই বন্দীখানায় সবসময় থাকতে হয়? আমাদের অপরাধ কি? মা মালতি পূর্বের সব ঘটনা খুলে বলে। সাগরিকা তো কিছুতেই বিশ্বাস করল না মায়ের কথা। দিন যেমন তেমন যায়। কিন্তু রাতে বাঁশির সুর শুনে উতালা হয়ে বাইরে যেতে চায় সাগরিকা। কোন লাভ হয় না। সাগরিকার মা একদিন বলল, তোমাকে যদি বাইরে নেয়া হয়, তুমি প্রথমে কি দেখবে।
সাগরিকা বলে-ঐ মধুর বাঁশিওয়ালাকে। এদিকে একযুগ পার হওয়ার আর মাত্র একদিন বাকি। সাগরিকা জানেনা আগামীকালই তাকে নবাবখানার বাইরে নেয়া হবে। এদিকে সাগরিকা নবাবখানার বন্দীদশা থেকে বাইরে বের হওয়া উপলক্ষে বর্ণাঢ্য আয়োজন চলছে। প্রজারা সাগরিকাকে সাগরদিঘীর পার থেকে শুভেচ্ছা ও প্রণাম জানাবে। এজন্য সব চাইতে সুন্দর ময়ুর পংকি নাও কিনে আনতে যুগল নবাব হাটে গেলেন। যুগল নবাব নাও নিয়ে আসার পথে নাওটিকে নদীর মাঝে ভূতের স্ত্রী ভূতনি আটকিয়ে দিল। কোন প্রকারে নবাব নাও নিয়ে আসতে পারছে না। সেই চেষ্টায় যুগল নবাবের অনেক রাত হয়ে গেল। এদিকে ভুত সাগরিকার নাম ধরে বাঁশি বাজাতে লাগলো। সাগরিকা দাসির কাপড় পরে নবাবখানা থেকে ছদ্মবেশে বের হয়ে এদিক-ওদিক ছুটতে লাগলো।
মনে মনে বলল-কে এই বাঁশিওয়ালা? ভুত এগিয়ে এসে সাগরিকাকে নিয়ে গেলো। এদিকে যুগল নবাবকে ভুতনি নাওসহ ছেড়ে দিলো। যুগল নবাব বাড়ীতে ফিরে দেখে প্রজারা সবাই মিলে সাগরিকাকে খোঁজাখুজি করছে আর কাঁদছে। কেউ আর সাগরিকাকে খোঁজে ফেলো না। সাগরিকা হারিয়ে গেল চিরদিনের জন্য। যুগল নবাব উত্তেজিত হয়ে নিজ স্ত্রী মালতিকে তলোয়ার দিয়ে হত্যা করে নিজেও আত্মহত্যা করলো।
