- Dainiksylhet.com - https://dainiksylhet.com -

সান্ত্বনা দিতে ‍গিয়ে সঙ্গীর মানসিক চাপ বাড়াচ্ছেন না তো?

জীবনের কোনও কঠিন সংকটে, কর্মক্ষেত্রের চাপে, জীবনসঙ্গীকে ভীষণ বিচলিত ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত অবস্থায় দেখাটা মোটেও সুখকর কিছু নয়। আর সেই সংবেদনশীল মুহূর্তে একজন ভালো সঙ্গী হিসেবে প্রিয়জনের মন ভালো করার আপ্রাণ চেষ্টা করাই স্বাভাবিক।

তবে অনেকেই না বুঝে এমন কিছু সান্ত্বনার পদ্ধতি বা ভাষা ব্যবহার করেন, যা হিতে বিপরীত হতে পারে।

মনোবিজ্ঞানের ভাষায় অন্যের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার এই ভুল চাহিদাকে বলা হয় ‘ডি-কমিটমেন্ট ট্যাকটিক্স’, যা সম্পর্কের গভীর বন্ধনকে ধ্বংস করে দিতে পারে।

‘সাইকোলজি টুডে’-তে প্রকাশিত প্রতিবেদনে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, কাউকে শান্ত করার সময়ে তার পরিস্থিতিকে ‘ছোট বা অবান্তর’ প্রমাণ করার চেষ্টা করলে মানুষ নিজেকে চরম একা ও অবহেলিত মনে করে।

কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের মনস্তাত্ত্বিক গবেষক যিটং ঝাও এবং ইউনিভার্সিটি অফ ম্যাসাচুসেটস অ্যামহার্স্টের মনোবিজ্ঞানের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সুসান ক্রাউস হুইটবোর্ন, সান্ত্বনা দেওয়ার ক্ষতিকর ভুল এবং এর বৈজ্ঞানিক সমাধান বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬ সালের সমীক্ষা

গবেষক যিটং ঝাও এবং তার সহযোগীরা, ২০২৬ সালে একটি বিশেষ ক্লিনিক্যাল সমীক্ষা চালান, যা মনোবিজ্ঞান সাময়িকী ‘ইমোশন’-এ প্রকাশিত হয়।

এই গবেষণায় বৈচিত্র্যময় সম্প্রদায়ের মানুষের অনলাইন ও সামাজিক সম্পর্কের তথ্য বিশ্লেষণ করে চিকিৎসকেরা অন্যকে সান্ত্বনা দেওয়ার ক্ষেত্রে ২টি ক্ষতিকর ভুল পদ্ধতি সনাক্ত করেন।

ভুল ১. তীব্রতা হ্রাস করা বা ‘কগনিটিভ রিয়্যাপ্রাইজাল’

ডা. সুসান ক্রাউস হুইটবোর্ন বলেন, “যখন কোনও প্রিয়জন কান্নাকাটি বা তীব্র চাপ প্রকাশ করেন, তখন অনেকেই সান্ত্বনা দিতে গিয়ে বলেন— ‘আরে এটা তেমন কোনো বড় ব্যাপার না’ বা ‘তুমি অকারণেই অতিরিক্ত চিন্তা করছ’, মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘কগনিটিভ রিয়্যাপ্রাইজাল’ বা জোর করে পরিস্থিতি হালকা করার চেষ্টা।”

এই ভুল বার্তাটি প্রতিপক্ষের মস্তিস্কের ‘লিম্বিক সিস্টেম’ বা আবেগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে তীব্র আঘাত হানে এবং মানুষটি ধরে নেয় যে, তার সঙ্গীর মাঝে কোনো সহমর্মিতা বা ‘এম্প্যাথি’ নেই।

ফলে সম্পর্কের মান কমতে থাকে।

ভুল ২. ‘সব তোমার হাতের বাইরে’ বলে হাল ছেড়ে দেওয়া

সান্ত্বনা দেওয়ার দ্বিতীয় ক্ষতিকর রূপ হল— ‘যা হওয়ার হয়েছে, এটা তোমার হাতে ছিল না, মেনে নাও’।

এই ধরনের বাক্য মানুষের মনের ভেতরের আত্মবিশ্বাস বা ‘সেন্স অফ কমপিটেন্স’ পুরোপুরি অবশ করে দেয়।

গবেষণায় প্রমাণিত যে, মানুষ যখন মনে করে তার সামনের চ্যালেঞ্জটি, নিজের লড়াই করার ক্ষমতার চেয়ে বড়, তখন তার মগজে স্ট্রেস বা চাপের হরমোন ‘কর্টিসল’ উপচে পড়ে, যা রক্তচাপকে দীর্ঘক্ষণ উচ্চ মাত্রায় আটকে রাখে।

সান্ত্বনা দেওয়ার নিয়ম: ‘অঙ্গীকার কৌশল’

টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, কাউকে সান্ত্বনা দেওয়ার সময় তার পরিস্থিতিকে চ্যালেঞ্জ না করে বরং তাকে মানসিক সাহস দেওয়া বা ‘কমিটমেন্ট স্ট্র্যাটেজি’ অর্থাৎ অঙ্গীকার করার কৌশল অনুসরণ করা ভালো সমাধান।

এর ২টি প্রধান স্তম্ভ হল:

১. অনুভূতিকে শতভাগ স্বীকৃতি দেওয়া: প্রিয়জন যখন বিপদে পড়বেন, তাকে বলুন— ‘হ্যাঁ, আমি বুঝতে পারছি পরিস্থিতিটা আসলেই অনেক খারাপ এবং তোমার মন খারাপ হওয়াটা একদম স্বাভাবিক’।

এটি মানুষের মস্তিস্ককে শান্ত সংকেত পাঠায় যে, সে বিচার বা জাজমেন্টের মুখোমুখি হচ্ছে না।

২. সক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের শক্তির প্রশংসা: তাকে মনে করিয়ে দিতে হবে যে, অতীতেও বড় বড় ধকল সে একা জয় করেছে। ‘পরিস্থিতি খারাপ কিন্তু আমি জানি তোমার এই ধকল কাটানোর পূর্ণ শক্তি আছে, আর আমি তোমার পাশে আছি’— এই কয়েকটি জাদুকরী মেদহীন বাক্য সঙ্গীর মনে আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে উত্তেজিক মস্তিষ্ককে নিমেষেই শান্ত করে দেয়।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন