পবিত্র কোরআন মানুষের আকিদা, ইবাদত, নৈতিকতা, সামাজিক আচরণ, পারিবারিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক লেনদেন এবং রাষ্ট্রীয় ন্যায়বিচার—জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কোরআন সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। কোরআনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এটি যেমন সৎকর্মশীলদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছে, তেমনি অন্যায়, পাপাচার ও সীমালঙ্ঘনকারীদের জন্য কঠোর সতর্কবার্তাও ঘোষণা করেছে।
আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন আয়াতে ‘ওয়াইল’ ‘ধ্বংস হোক’ কিংবা অনুরূপ শব্দ ব্যবহার করে কিছু শ্রেণির মানুষের ভয়াবহ পরিণতির কথা উল্লেখ করেছেন। এসব সতর্কবার্তার উদ্দেশ্য মানুষকে হতাশ করা নয়; বরং আত্মসমালোচনা, তাওবা এবং চরিত্র সংশোধনের মাধ্যমে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা। কোরআনে যাদের ধ্বংসের সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে এমন সাত শ্রেণির মানুষের আলোচনা তুলে ধরা হলো।
১. অপবাদ, গীবত ও কুৎসা রটনাকারী
ইসলাম মানুষের সম্মানকে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে বিবেচনা করেছে। কারও অনুপস্থিতিতে তার দোষচর্চা, অপবাদ, কুৎসা রটনা কিংবা বিদ্বেষ ছড়ানো ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করে। তাই কোরআন এদের জন্য কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—وَيْلٌ لِّكُلِّ هُمَزَةٍ لُّمَزَةٍ
অর্থ : ‘ধ্বংস প্রত্যেক নিন্দাকারী ও পরনিন্দাকারীর জন্য।’ (সুরা : হুমাজাহ, আয়াত : ১)
তাই কোনো মানুষের সম্মানহানি করা একজন মুমিনের চরিত্র হতে পারে না।
২. যারা আন্দাজ ও অনুমানের ভিত্তিতে কথা বলে
প্রমাণ ছাড়া কথা বলা, গুজব ছড়ানো, অনুমানের ওপর ভিত্তি করে অভিযোগ তোলা কিংবা মিথ্যা তথ্য প্রচার করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা বলেন, قُتِلَ الْخَرَّاصُونَ
অর্থ : ‘ধ্বংস হোক সেইসব লোকের, যারা অনুমান ও আন্দাজের ভিত্তিতে কথা বলে।’ (সুরা : জারিয়াত, আয়াত : ১০)
বর্তমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই নির্দেশনা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। তাই যাচাই ছাড়া কোনো সংবাদ প্রচার করা একজন মুমিনের শোভনীয় নয়।
৩. যারা আল্লাহর সঙ্গে শরিক করে
শিরক হলো আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বড় গুনাহ। একমাত্র তাওবার মাধ্যমে এ গুনাহ থেকে মুক্তি সম্ভব। আল্লাহ তাআলা বলেন—فَوَيْلٌ لِّلْمُشْرِكِينَ
অর্থ : ‘অতএব ধ্বংস সেই মুশরিকদের জন্য।’ (সুরা ফুসসিলাত, আয়াত : ৬) তাই তাওহিদের ওপর অবিচল থাকা একজন মুসলিমের সর্বপ্রথম দায়িত্ব।
৪. যারা আল্লাহর নামে মিথ্যা কথা বলে
ধর্মের নামে মনগড়া কথা বলা, প্রমাণ ছাড়া কোনো বিষয়কে হালাল বা হারাম ঘোষণা করা কিংবা আল্লাহর বিধান বিকৃত করা অত্যন্ত ভয়াবহ অপরাধ। আল্লাহ তাআলা বলেন, وَلَا تَقُولُوا لِمَا تَصِفُ أَلْسِنَتُكُمُ الْكَذِبَ هَٰذَا حَلَالٌ وَهَٰذَا حَرَامٌ لِّتَفْتَرُوا عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ ۚ إِنَّ الَّذِينَ يَفْتَرُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ لَا يُفْلِحُونَ
অর্থ : ‘তোমাদের জিহ্বা মিথ্যা বলে যা বর্ণনা করে, তা বলে দিও না—’এটি হালাল, এটি হারাম’; এভাবে আল্লাহর নামে মিথ্যা আরোপ করো না। নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর নামে মিথ্যা রচনা করে তারা কখনো সফল হবে না।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ১১৬)
৫. যারা মানুষকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ও অপমান করে
অহংকার, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, বিদ্রূপ ও অপমান মানুষের হৃদয়ে ক্ষত সৃষ্টি করে এবং সমাজে বিদ্বেষের জন্ম দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, وَيْلٌ لِّكُلِّ هُمَزَةٍ لُّمَزَةٍ
অর্থ : ‘ধ্বংস প্রত্যেক বিদ্রূপকারী ও দোষারোপকারীর জন্য।’ (সুরা : হুমাজাহ, আয়াত : ১) তাই একজন প্রকৃত মুমিন মানুষের সম্মান রক্ষা করে, তাকে অপমান করে না।
৬. প্রত্যেক মিথ্যাবাদী ও পাপাচারী
মিথ্যা মানুষের ঈমানকে দুর্বল করে এবং যারা পাপকে নিজেদের অভ্যাসে পরিণত করে। তাই কোরআন এদের জন্যও কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, وَيْلٌ لِّكُلِّ أَفَّاكٍ أَثِيمٍ
অর্থ : ‘ধ্বংস প্রত্যেক মিথ্যাবাদী ও পাপাচারীর জন্য।’ (সুরা : জাসিয়াহ, আয়াত : ৭) তাই একজন মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সত্যবাদিতা এবং আমানতদারিতা।
৭. যারা ওজনে ও পরিমাপে কম দেয়
ইসলামে ব্যবসা-বাণিজ্যে সততা অপরিহার্য। ওজনে কম দেওয়া, প্রতারণা করা কিংবা মানুষের হক নষ্ট করা বড় গুনাহ। আল্লাহ তাআলা বলেন, وَيْلٌ لِّلْمُطَفِّفِينَ
অর্থ : ‘ধ্বংস তাদের জন্য, যারা মাপে ও ওজনে কম দেয়।’ (সুরা : মুতাফফিফিন,আয়াত : ১) এই আয়াত ব্যবসায়িক সততা ও ন্যায়পরায়ণতার মৌলিক শিক্ষা প্রদান করে।
অতএব, আসুন, আমরা কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে নিজেদের আকিদা, চরিত্র ও আমলকে শুদ্ধ করি। সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, সততা, বিনয় ও মানুষের সম্মান রক্ষার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কোরআনের সতর্কবার্তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে নেক আমলের জীবন গড়ে তোলার তাওফিক দান করুন। আমিন।
