
শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ স্বাধীন বাংলার স্থপতি ও প্রথম সুলতান। তার জীবনকাল ছিল ১৩৪২-১৩৫৮ খ্রি.। মধ্যযুগের বাংলার ইতিহাসে যে কয়েকজন শাসক রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও সামরিক প্রজ্ঞার কারণে অমর হয়ে আছেন, তাঁদের মধ্যে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ নিঃসন্দেহে প্রথম সারিতে। তিনি কেবল ইলিয়াস শাহি বংশের প্রতিষ্ঠাতাই নন, বরং দিল্লি সালতানাতের অধীনতা থেকে বের হয়ে এসে প্রথমবারের মতো সমগ্র বাংলাকে একীভূত করে একটি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন সালতানাত প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর যুগান্তকারী সাফল্যের ফলেই বাংলা একটি ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে প্রায় দুই শতাব্দী ধরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল।
জন্ম ও ক্ষমতা লাভ
শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ ছিলেন পারস্যের সিজিস্তান অঞ্চলের তুর্কি বংশোদ্ভূত। তাঁর প্রাথমিক জীবন সম্পর্কে খুব বেশি জানা না গেলেও, তিনি সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের সময়ে দিল্লিতে কর্মরত ছিলেন। পরে কোনো এক কারণে বাংলায় পালিয়ে এসে সাতগাঁও-এর (দক্ষিণ বাংলা) তুঘলক শাসনকর্তা ইজ্জউদ্দিন ইয়াহিয়ার অধীনে চাকরি গ্রহণ করেন। ইলিয়াস শাহ নিজ কর্মদক্ষতার জোরে অল্প সময়ের মধ্যে উচ্চপদস্থ মালিক হিসেবে উন্নীত হন।
১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দে ইজ্জউদ্দিন ইয়াহিয়ার মৃত্যুর পর বাংলায় দিল্লির দুর্বল কর্তৃত্বের সুযোগ নিয়ে তিনি সাতগাঁও-এর ক্ষমতা দখল করেন এবং স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেন। তাঁর বিচক্ষণতা ছিল এই যে, তিনি তাৎক্ষণিকভাবে লখনৌতি (গৌড়)-এর ক্ষমতা দখলের চেষ্টা না করে, প্রথমে নিজের ক্ষমতাকে সুদৃঢ় করেন।
বাংলার একীকরণ : ‘শাহ-ই-বাঙ্গালাহ’ উপাধি
১৪শ শতাব্দীর মধ্যভাগে বাংলা তিনটি প্রধান প্রশাসনিক অঞ্চলে বিভক্ত ছিল: পশ্চিম বাংলার লখনৌতি (বা গৌড়), দক্ষিণ বাংলার সাতগাঁও, এবং পূর্ব বাংলার সোনারগাঁও। ইলিয়াস শাহ তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন হিসেবে এই তিনটি অঞ্চলকে একসূত্রে বাঁধেন। সাতগাঁও-এ ক্ষমতা সুসংহত করার পর তিনি ১৩৪২ খ্রি. সালে লখনৌতির সুলতান আলাউদ্দীন আলী শাহকে পরাজিত করে লখনৌতির সিংহাসনে আরোহণ করেন। এই বিজয় তাঁর ইলিয়াস শাহি বংশের আনুষ্ঠানিক সূচনা করে। এরপর তিনি বাংলার অন্যতম অঞ্চল সোনারগাঁও এর দিকে নজর দেন। ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ সোনারগাঁও-এ স্বাধীনতার সূচনা করলেও তাঁর পুত্র ইখতিয়ারউদ্দীন গাজী শাহের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ইলিয়াস শাহ ১৩৫২ খ্রিস্টাব্দে সোনারগাঁও দখল করে নেন। এভাবে বাংলার তিনটি প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্রই তার অধীনে আসে। তিনিই প্রথম শাসক যিনি সমগ্র বাংলা অঞ্চলকে একত্রিত করে ‘বাঙ্গালাহ’ (ইধহমধষধয) নামে পরিচিত করেন এবং গর্বের সঙ্গে ‘শাহ-ই-বাঙ্গালাহ’ বা ‘সুলতান-ই-বাঙ্গালিয়ান’ উপাধি ধারণ করেন। এই উপাধির মাধ্যমেই বাংলার একটি একক রাজনৈতিক পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হয়।
দিল্লির সাথে সংঘাত : একডালা দুর্গের প্রতিরক্ষা
দিল্লি সালতানাত থেকে পালিয়ে আসা কর্মকর্তা ইলিয়াস শাহের স্বাধীন সত্তা দিল্লির সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক মেনে নিতে পারেননি। তাই দিল্লির কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দে ফিরোজ শাহ এক বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে বাংলা আক্রমণ করেন।
ইলিয়াস শাহ সামরিক মোকাবিলায় না গিয়ে এক ব্যতিক্রমী রণকৌশল অবলম্বন করেন। তিনি তাঁর রাজধানী পান্ডুয়ার সন্নিকটে সুরক্ষিত একডালা দুর্গে সপরিবারে ও সেনাবাহিনীসহ আশ্রয় নেন। বর্ষাকালে জলমগ্ন হয়ে পড়া এবং অত্যন্ত মজবুত এই দুর্গটি ছিল প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট প্রতিরক্ষায় দুর্ভেদ্য। ফিরোজ শাহ দুর্গ অবরোধ করেও সফল হতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত, বর্ষার আগমন এবং ইলিয়াস শাহের দৃঢ়তার মুখে ফিরোজ শাহ তুঘলক বাধ্য হয়ে ১৩৫৪ খ্রিস্টাব্দে তাঁর সঙ্গে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তি কার্যকরভাবে বাংলার স্বাধীনতাকে দিল্লির কাছ থেকে স্বীকার করিয়ে নেয়, যা ছিল ইলিয়াস শাহের কূটনৈতিক ও সামরিক দূরদর্শিতার শ্রেষ্ঠ প্রমাণ।
সামরিক সম্প্রসারণ ও প্রশাসন
কেবল বাংলার অভ্যন্তরীণ একীকরণ নয়, ইলিয়াস শাহের সামরিক উচ্চাকাক্সক্ষা বাংলার বাইরেও প্রসারিত হয়েছিল। তিনি ১৩৪৪ খ্রিস্টাব্দে বিহারের ত্রিহুত জয় করেন এবং ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দে দুঃসাহসিক অভিযান চালিয়ে হিমালয় অতিক্রম করে নেপালের কাঠমান্ডু পর্যন্ত পৌঁছান। এছাড়া তিনি উড়িষ্যার (জাজনগর) ওপর সফল সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন এবং ১৩৫৭ খ্রিস্টাব্দে কামরূপ (আসাম) জয় করেন। এই অভিযানগুলো বাংলায় সামরিক শক্তির ভিত্তি তৈরি করে এবং সুলতানকে একজন শক্তিশালী সমরনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
প্রশাসক হিসেবে ইলিয়াস শাহ অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। তিনি বর্ণ, গোত্র বা ধর্ম নির্বিশেষে যোগ্য ব্যক্তিদের সরকারি চাকরিতে নিয়োগের সুযোগ দেন। হিন্দু ও মুসলমান নির্বিশেষে সাধু-সন্ন্যাসীদের পৃষ্ঠপোষকতা করে তিনি রাজ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখেছিলেন। তাঁর উদার শাসন ও অর্থনৈতিক সংস্কারের ফলে বাংলার কৃষি ও বাণিজ্য সমৃদ্ধ হয়েছিল। বহু মসজিদ, মাদরাসা এবং খানকাহ তাঁর সময়ে নির্মিত হয়, যা বাংলায় ইসলামী স্থাপত্য ও সংস্কৃতির প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১৩৫৮ খ্রিস্টাব্দে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সুযোগ্য পুত্র সিকন্দর শাহ ক্ষমতায় আসেন। ইলিয়াস শাহ স্বল্প সময়ের শাসনকালে যে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিলেন, তা ইলিয়াস শাহি বংশকে প্রায় দেড় শতক ধরে বাংলায় শ্রেষ্ঠ শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করেছিল। তাই শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহকে কেবল একজন সফল শাসক হিসেবে নয়, বরং স্বাধীন ও ঐক্যবদ্ধ বাংলার জনক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
লেখক : প্রাবন্ধিক, দক্ষিণ সালনা, গাজীপুর