শবেবরাতে কারা কেন ক্ষমা থেকে বঞ্চিত হয়

শবেবরাত ক্ষমা ও ভাগ্যলিপির মহিমান্বিত রজনী। এই রাতে আল্লাহ তাআলার রহমত যেন অবারিত ঝর্ণাধারার মতো বর্ষিত হয়। অসংখ্য বান্দা চোখের জল ফেলে ক্ষমা প্রার্থনা করে, অতীতের পাপের ভার নামিয়ে রাখতে চায় আল্লাহর দরবারে। হাদিসে এসেছে এই রাতে আল্লাহ তাআলা অসংখ্য মানুষকে ক্ষমা করে দেন, এমনকি বকরির গায়ের পশমের সংখ্যার চেয়েও বেশি।

কিন্তু এই ক্ষমার রাতেও কিছু মানুষ আছে, যাদের দিকে রহমতের দৃষ্টি ফিরে না। ক্ষমার দরজা খোলা থাকলেও, তারা নিজেরাই যেন সেই দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে। এ এক গভীর, বেদনাময় বাস্তবতা; যা আমাদের কাঁপিয়ে দেয়, আত্মসমালোচনায় বাধ্য করে।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন— ‘আল্লাহ তাআলা শাবানের মধ্যরাতে তাঁর সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টি দেন এবং সব সৃষ্টিকে ক্ষমা করে দেন; তবে মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারীকে নয়।’ (ইবনু মাজাহ, হাদিস : ১৩৯০)

এই সংক্ষিপ্ত হাদিসেই শবেবরাতের গভীর দর্শন লুকিয়ে আছে। ক্ষমা এখানে শুধু আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা নয়; বরং এটি ঈমান, চরিত্র ও সম্পর্কের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

প্রথম যে শ্রেণিটি ক্ষমা থেকে বঞ্চিত; তারা হলো মুশরিক। যে আল্লাহর সঙ্গে শরিক করে, তাঁর একত্বে ফাটল ধরায়, সে মূল ভিত্তিটিই নষ্ট করে দেয়।

ক্ষমা চাইবার পূর্বশর্তই হলো; ক্ষমা যার কাছে চাইছি, তাঁকেই একমাত্র ক্ষমার মালিক হিসেবে স্বীকার করা। শিরকের মাধ্যমে মানুষ সেই মৌলিক স্বীকৃতিটাই অস্বীকার করে বসে। তাই এই রাতের রহমত থেকেও সে দূরে থাকে।
কিন্তু হাদিসের দ্বিতীয় শ্রেণিটি আরো বেশি ভাবিয়ে তোলে; বিদ্বেষ পোষণকারী। যারা বাহ্যিকভাবে মুসলিম, ইবাদত করে, দোয়া পড়ে, রাত জাগে; অথচ অন্তরে লালন করে হিংসা, ঘৃণা ও প্রতিশোধের আগুন।

কারো প্রতি জমে থাকা ক্ষোভ, অহংকারে জন্ম নেওয়া শত্রুতা, দীর্ঘদিনের না বলা অভিমান— এসবই মানুষকে ক্ষমার যোগ্যতা থেকে বঞ্চিত করে দেয়।

বিদ্বেষ এমন এক অদৃশ্য ব্যাধি, যা ইবাদতের সৌন্দর্য নষ্ট করে দেয়। মানুষ সিজদায় মাথা রাখে, কিন্তু হৃদয় বাঁকা থাকে। দোয়ার জন্য হাত তোলে, কিন্তু সেই হাতেই অন্যের প্রতি কঠোরতা লুকিয়ে থাকে। তাই আল্লাহ তাআলা যেন এই রাতে বান্দাকে প্রশ্ন করেন—‘তুমি আমার ক্ষমা চাও, অথচ আমার বান্দাকে ক্ষমা করতে রাজি নও।’

এখানেই শবেবরাতের গভীর নৈতিক শিক্ষা। এটি শুধু নফল নামাজ, তিলাওয়াত বা দোয়ার রাত নয়; এটি হৃদয় শুদ্ধ করার রাত। সম্পর্কের জট খুলে দেওয়ার রাত। অহংকার ভাঙার রাত।

আরেক হাদিসে এসেছে—

‘সোমবার ও বৃহস্পতিবার জান্নাতের দরজা খোলা হয় এবং প্রত্যেক বান্দাকে ক্ষমা করা হয়— যে আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করে না। তবে দুজন মানুষের মধ্যে শত্রুতা থাকলে বলা হয় : এ দুজনকে ছেড়ে দাও, যতক্ষণ না তারা মীমাংসা করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৫)

যদি সাপ্তাহিক এই সাধারণ ক্ষমার দিনেও বিদ্বেষ ক্ষমার পথে বাধা হয়, তবে শবেবরাতের মতো মহিমান্বিত রাতেও তা যে অন্তরায় হবে এটাই স্বাভাবিক।
এ ছাড়া কিছু আলেমের ব্যাখ্যায় এসেছে, দীর্ঘদিন ধরে পিতা-মাতার অবাধ্যতায় লিপ্ত থাকা, অন্যায়ভাবে সম্পর্ক ছিন্ন করা, অন্যের অধিকার আত্মসাৎ করে তাওবা না করা— এসব অবস্থাও বান্দাকে রহমতের পূর্ণ অংশ থেকে বঞ্চিত করতে পারে। কারণ আল্লাহর হক মাফ হতে পারে, কিন্তু বান্দার হক ঝুলে থাকলে ক্ষমা থমকে যায়।

শবেবরাত আমাদের সামনে তাই এক কঠিন আয়না ধরে। এই আয়নায় শুধু নামাজের হিসাব নয়, বরং সম্পর্কের হিসাবও দেখা যায়। আমরা কাকে কষ্ট দিয়েছি, কার প্রতি অন্যায় করেছি, কাকে ক্ষমা করতে পারিনি— এই প্রশ্নগুলো এই রাতের নীরবতায় আরো উচ্চৈঃস্বরে ধ্বনিত হয়।

এ রাত আমাদের শেখায় যে, ক্ষমা পেতে হলে ক্ষমাশীল হতে হয়। আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হলে আগে মানুষের দিকে এক কদম এগোতে হয়। অনেক সময় একটি আন্তরিক ‘মাফ করে দিয়ো’— হাজার রাকাত নফলের চেয়েও ভারী হয়ে ওঠে।

সুতরাং শবেবরাতের প্রস্তুতি শুধু মসজিদে নয়, হৃদয়ের ভেতর শুরু হওয়া উচিত। শত্রুতা ঝেড়ে ফেলা, অহংকার নামিয়ে রাখা, সম্পর্ক জোড়া লাগানো— এগুলোই এই রাতের নীরব ইবাদত।

যেন এমন না হয়— রহমতের বৃষ্টি নামছে, অথচ আমরা বিদ্বেষের ছাতা খুলে দাঁড়িয়ে আছি।

এই শবেবরাতে আল্লাহ তাআলা আমাদের সেইসব মানুষের অন্তর্ভুক্ত করুন— যারা শুধু ক্ষমা চায় না, বরং ক্ষমা করতেও জানে। আমিন।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন