বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্র সিলেটের দরগাহ। এখানেই শায়িত আছেন উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারের অন্যতম অগ্রদূত শাহজালাল ইয়ামেনি (রহ.)।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই দরগাহ শুধু একটি সমাধিস্থল নয়; বরং এটি ইসলামের ইতিহাস, আধ্যাত্মিক সাধনা, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত স্মারক হিসেবে পরিচিত।
আরব থেকে সিলেটে
ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, মহান আল্লাহর নির্দেশনা স্বপ্নে লাভ করার পর শাহজালাল (রহ.) সুদূর ইয়েমেন থেকে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে সিলেটে আগমন করেন। সে সময় সিলেটে হিন্দু রাজা গৌড়গোবিন্দের শাসন চলছিল। নানা প্রতিরোধ, অগ্নিবাণ ও কৌশল ব্যর্থ করে শাহজালাল (রহ.) এবং তাঁর সাহসী সঙ্গীরা সিলেট বিজয় করেন।
এই বিজয়ের পর শ্রীহট্ট নতুন পরিচয়ে ‘জালালাবাদ’ নামে খ্যাতি লাভ করে এবং এ অঞ্চলজুড়ে ইসলামের শিক্ষা, দাওয়াত ও নৈতিক আদর্শের প্রসার শুরু হয়। পরবর্তীতে তাঁর সঙ্গীর সংখ্যা ৩৬০ জনে উন্নীত হয়। তাঁরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে ইসলাম প্রচার, শিক্ষা বিস্তার এবং নতুন মুসলমানদের দ্বীনি প্রশিক্ষণে আত্মনিয়োগ করেন। শাহজালাল (রহ.)-এর আধ্যাত্মিক মর্যাদা এতটাই সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল যে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ তাঁর সাক্ষাৎ লাভে ছুটে আসতেন।এমনকি বিশ্বখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতাও তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিজের ভ্রমণবৃত্তান্তে তাঁর প্রশংসা লিপিবদ্ধ করেন।
সিলেটকে খাজনামুক্ত ঘোষণা
সিলেট বিজয়ের পর দিল্লির সুলতান শামসুদ্দিন ফিরোজ শাহ শাহজালাল (রহ.)-কে সিলেটের শাসনভার গ্রহণের প্রস্তাব দেন। কিন্তু ক্ষমতা ও রাজকীয় মর্যাদার প্রতি অনাসক্ত এই মহান সাধক সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর সুলতান বিশেষ ফরমান জারি করে সিলেট শহরকে খাজনামুক্ত ঘোষণা করেন এবং শাহজালাল (রহ.)-এর সম্মানে এ বিশেষ মর্যাদা প্রদান করেন। ঐতিহাসিক সূত্র মতে, এই বিশেষ মর্যাদার প্রভাব বহুদিন পর্যন্ত বহাল ছিল।
সুলতানি যুগ থেকে ব্রিটিশ শাসনের প্রারম্ভ পর্যন্ত এক ব্যতিক্রমী ঐতিহ্য প্রচলিত ছিল। দিল্লি থেকে যেসব শাসনকর্তা সিলেটে আসতেন, তাঁরা প্রথমে শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহে উপস্থিত হয়ে জিয়ারত করতেন। এরপর দরগাহর খাদিমদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও পাগড়ি গ্রহণ করার পরই জনগণ তাঁদের শাসক হিসেবে গ্রহণ করত। ঐতিহাসিক শামসুল আলম সি.এস.পি তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, এই প্রথা সিলেটবাসীর হৃদয়ে শাহজালাল (রহ.)-এর গভীর সম্মান ও প্রভাবেরই প্রতিফলন।
যেভাবে নির্মিত হয়েছে শাহজালালের (রহ.) মাজার
বর্তমান দরগাহ টিলা বহু শতাব্দীর নির্মাণ ও সংস্কারের ফল। প্রাচীরবেষ্টিত স্থানে চার কোণে চারটি উঁচু স্তম্ভবিশিষ্ট সমাধিটি নির্মিত হয়েছে। সমাধির পশ্চিম পাশে রয়েছে একটি ছোট মসজিদ, যা পরবর্তীকালে ব্রিটিশ আমলে সিলেটের ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর উইলস পুনর্নির্মাণ করেন। সমাধির পূর্ব পাশে ইয়েমেনের যুবরাজ শেখ আলী এবং পশ্চিম পাশে গৌড়ের উজির মকবুল খানের কবর রয়েছে।
সুলতান ও মোগলদের নির্মাণে সমৃদ্ধ দরগাহ চত্বর
বর্তমান দরগাহ চত্বরের অধিকাংশ স্থাপনা বিভিন্ন সময়ে বাংলার সুলতান, মোগল সম্রাট এবং তৎকালীন শাসকদের উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে। দক্ষিণ প্রবেশপথে রয়েছে চিল্লাখানা এবং শাহজালাল (রহ.)-এর কয়েকজন সঙ্গীর সমাধি। পাশেই শায়িত আছেন দরগাহর সাবেক মুতাওয়াল্লিরা। মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে সিলেটের ফৌজদার ফরহাদ খান নির্মাণ করেন বিশাল গম্বুজ ভবন, যা আজও ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এর পাশেই রয়েছে ‘ঘড়িঘর’ নামে পরিচিত আরেকটি স্থাপনা।
ছয় শতাব্দীর পুরোনো দরগাহ মসজিদ
দরগাহ চত্বরে অবস্থিত বৃহৎ মসজিদটি বাংলার সুলতান আবু মুজাফফর ইউসুফ শাহের আমলে ১৪০০ খ্রিস্টাব্দে মন্ত্রী মজলিশে আতার নির্মাণ করেন। পরে ১৭৪৪ সালে বাহারাম খান ফৌজদারের সময় এটি পুনর্নির্মাণ করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে এটি সিলেট শহরের অন্যতম প্রধান জুমার মসজিদ হিসেবে পরিচিত।
দরগাহ পুকুরের রহস্যময় গজার মাছ
দরগাহ টিলার নিচে অবস্থিত বড় পুকুরে আজও গজার মাছ অবাধে বিচরণ করে। দর্শনার্থীরা খাবার নিয়ে ডাক দিলে মাছগুলো তীরে ভিড় জমায়। লোককাহিনিতে প্রচলিত আছে, এই মাছগুলো শাহজালাল (রহ.)-এর সময় থেকেই সংরক্ষিত। যদিও এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই, তবুও এটি সিলেটের ঐতিহ্যের অংশ হয়ে আছে।
বিশাল ডেগচি ও লঙ্গরখানার ইতিহাস
দরগাহ প্রাঙ্গণে এখনও সংরক্ষিত রয়েছে তামার তৈরি দুটি বিশাল ডেগচি। ইতিহাস অনুযায়ী, একেকটিতে একসঙ্গে সাতটি গরু ও সাত মন চাল রান্না করা সম্ভব। ডেগচির গায়ে উৎকীর্ণ ফারসি লিপি থেকে জানা যায়, জাহাঙ্গীরনগরের (বর্তমান ঢাকা) শেখ আবু সায়িদ ১৬৯৫ খ্রিস্টাব্দে এগুলো তৈরি করে মুরাদ বখশের মাধ্যমে দরগাহে পাঠিয়েছিলেন। একসময় এখানকার লঙ্গরখানায় ভ্রমণকারী, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য নিয়মিত খাবারের ব্যবস্থা ছিল।
শাহজালাল (রহ.)-এর ব্যবহৃত ঐতিহাসিক নিদর্শন
দরগাহে সংরক্ষিত রয়েছে শাহজালাল (রহ.)-এর ব্যবহৃত বলে প্রচলিত কয়েকটি ঐতিহাসিক নিদর্শন। এর মধ্যে রয়েছে তাঁর তরবারি, কাঠের খড়ম, হরিণের চামড়ার তৈরি জায়নামাজ, তামার প্লেট ও বাটি। তামার একটি বাটিতে আরবি ভাষায় কিছু লেখা রয়েছে। অনেক মানুষ এটিকে বরকতের নিদর্শন হিসেবে মনে করেন। তবে ইসলামী আকীদা অনুযায়ী রোগমুক্তি একমাত্র আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই আসে। কোনো বস্তু নিজস্ব ক্ষমতায় উপকার বা ক্ষতি করতে পারে—এমন বিশ্বাস শরিয়তসম্মত নয়।
শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহ বাংলায় ইসলামের ইতিহাস, সুলতানি ও মোগল স্থাপত্য, আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য এবং সামাজিক সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। শত শত বছরের ইতিহাস বহনকারী এই দরগাহ আজও দেশ-বিদেশের অসংখ্য মানুষের আগ্রহের কেন্দ্র। তবে এর ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার পাশাপাশি ইসলামের আকীদা অনুযায়ী আল্লাহর একত্ববাদকে অটুট রাখা এবং যেকোনো প্রকার অতিরঞ্জিত বা ভিত্তিহীন বিশ্বাস থেকে বিরত থাকাও একজন মুসলিমের জন্য সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
