১৯২৬ সালে উইনি-দ্য-পুহ্ চরিত্রটি নিয়ে প্রথম বই প্রকাশিত হয়। ১০০ বছর আগে বইটি লিখেছিলেন এ এ মিলনে এবং ছবিগুলো এঁকেছিলেন শিল্পী ই এইচ শেপার্ড। তখন থেকে শুরু করে আজও ছোটবড় সবার কাছে দারুণ প্রিয় এক নাম উইনি-দ্য-পুহ্। সর্বকালের সেরা শিশুসাহিত্যের তালিকায় এখনো বইটি শুরুর দিকেই থাকে।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শিশুরা ‘উইনি-দ্য-পুহ্’ ও তার বন্ধুদের ‘হানড্রেড একর উড’ বা এক শ একর বনের গল্প শুনে বড় হচ্ছে। কমিকস, গল্পের বই থেকে শুরু করে অসংখ্য মুভি আর টিভি শোর মাধ্যমে চরিত্রগুলো আজ বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়। মধুপ্রেমী ভালুক আর তার বন্ধু ক্রিস্টোফার রবিন, পিগলেট, টিগার কিংবা ইওরের মজার সব কাণ্ডকীর্তি আজও শিশুদের কল্পনার জগতে রয়েছে।
উইনি-দ্য-পুহ্র গল্প
‘হানড্রেড একর উড’ নামের এক বনে থাকে একদল বন্ধু। বনের সবার প্রিয় হলুদ রঙের মধুপ্রেমী ভালুক পুহ্। অনেকেই মনে করেন যে পুহ্ বেশ বোকা, বুদ্ধি একদম কম। কিন্তু সহজ–সরল পুহ্ মাঝেমধ্যে এমন সব কাণ্ড করে যা সবাইকে অবাক করে দেয়। তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু ক্রিস্টোফার রবিন নামের একটি ছোট ছেলে। বনের সবার যেকোনো বিপদে রবিনই এগিয়ে আসে।
পুহ্ মধু জোগাড় করতে গিয়ে প্রায়ই মজার সব বিপদে পড়ে। কখনো আকাশে বেলুনে চড়ে মৌমাছির চাকে যাওয়ার চেষ্টা করে, আবার কখনো বন্ধুর বাড়িতে বেশি মধু খেয়ে ফেলায় ঘরের দরজায় আটকে যায়। পুহ্র এই অভিযানে সব সময় সঙ্গে থাকে হাসিখুশি বাঘ টিগার, ভীতু কিন্তু আদুরে পিগলেট আর শান্ত স্বভাবের গাধা ইওর।
এদের এই সুন্দর জগতে বড় কোনো ঝামেলা নেই। ছোট ছোট ঘটনার মধ্য দিয়ে একে অপরকে সাহায্য করা আর সবাই মিলে আনন্দ করাই এদের কাজ। একদল বন্ধুর সব সময় পাশে থাকার এই জগৎই উইনি-দ্য-পুহ্কে আজও সবার কাছে প্রিয় করে রেখেছে।
কে এই ক্রিস্টোফার রবিন
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, ক্রিস্টোফার রবিন চরিত্রটি কি কেবল কল্পনা? উত্তর হলো, না। লেখক এ এ মিলনের ‘ক্রিস্টোফার রবিন মিলনে’ নামে সত্যিই একটি ছেলে ছিল। বাড়িতে সবাই তাকে ‘বিলি মুন’ নামে ডাকত। ছোট্ট বিলি মুন সারা দিন তার পশুপাখির পুতুলদের সঙ্গে খেলা করত আর আপনমনে এদের সঙ্গে কথা বলত। ছেলের এই দারুণ সব কল্পনা আর পুতুলদের প্রতি ভালোবাসা দেখেই এ এ মিলনে ‘উইনি-দ্য-পুহ্’র গল্পগুলো লিখতে শুরু করেন। সেখানে তিনি ছেলের ডাকনাম না দিয়ে আসল নাম ক্রিস্টোফার রবিনই ব্যবহার করলেন।
গল্পের পেছনের সেই আসল ভালুক
সবার প্রিয় মধুপ্রেমী ভালুক উইনি-দ্য-পুহ্র রয়েছে একটি আসল ভালুকের গল্প। ক্রিস্টোফার রবিনের অনেকগুলো পুতুলের মধ্যে একটি টেডি বিয়ার ছিল, যার নাম রাখা হয়েছিল ‘এডওয়ার্ড’।
লেখক এ এ মিলনে প্রায়ই তাঁর ছেলেকে নিয়ে চিড়িয়াখানায় জ্যান্ত ভালুক দেখতে যেতেন। সেখানে ‘উইনি’ নামের একটি কালো ভালুক ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় কানাডার একদল সৈন্য এই ভালুকছানাকে কুড়িয়ে পেয়ে নিজেদের সঙ্গে রেখেছিলেন। যুদ্ধের পর সেটিকে লন্ডন চিড়িয়াখানায় রাখা হয়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জ্যান্ত ভালুকটি রবিনের খুব প্রিয় হয়ে ওঠে। জ্যান্ত সেই ভালুকের প্রতি ভালোবাসা থেকেই রবিন একদিন সিদ্ধান্ত নেয় যে তার প্রিয় খেলনাটির নাম ‘এডওয়ার্ড’ বদলে ‘উইনি’ রাখবে।
তবে ‘পুহ্’ নামটি এসেছে একটি রাজহাঁস থেকে। বিলি মুন প্রতিদিন সকালে একটি রাজহাঁসকে খাবার খাওয়াতে যেত। সেটি মাঝেমধ্যে অবাধ্য হতো। তখন বিলি হতাশ হয়ে বলত, ‘পুহ্’। পরে নিজের প্রিয় খেলনা ভালুকটির নাম রাখার সময় সে চিড়িয়াখানার সেই ‘উইনি’ আর রাজহাঁসের ‘পুহ্’ মিলিয়ে নাম রাখল ‘উইনি-দ্য-পুহ্’।
এখনো সেখানে আছে পুহ্ আর তার বন্ধুরা
যে পুতুলগুলো দেখে এই গল্পের জন্ম, সেগুলো কিন্তু এখনো আছে। তুমি চাইলে সেই আসল পুতুলগুলো নিজের চোখে দেখে আসতে পারো।
১৯৮৭ সাল থেকে পুহ্, ইওর, পিগলেট, কাঙ্গা আর টিগারের আসল পুতুলগুলো নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরিতে রাখা আছে। এই সব খেলনা ছিল বাস্তবের ক্রিস্টোফার রবিনের। ১৯২০ থেকে ১৯২৮ সালের মধ্যে সে এসব পুতুল উপহার পেয়েছিল।
তবে ছবিটি দেখলে তোমার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, দলের বাকিরা কোথায়? আসলে ছোট্ট রু পুতুলটি অনেক আগেই হারিয়ে গেছে। আর খরগোশ ও পেঁচার কোনো খেলনা ছিল না। লেখক নিজের কল্পনা থেকে এই দুটি চরিত্র তৈরি করেছিলেন।
কেন শহর ছেড়ে বনে গেলেন লেখক
অনেকেই মনে করেন ‘হানড্রেড একর উড’ কেবল লেখকের কল্পনা। কিন্তু এর পেছনে রয়েছে যুদ্ধের ইতিহাস। লেখক এ এ মিলনে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে কাজ করতেন। ১৯১৬ সালের এক যুদ্ধে তিনি গুরুতর আঘাত পান। যুদ্ধের সেই ভয়াবহ স্মৃতি তাঁকে মানসিকভাবে অসুস্থ করে দিয়েছিল। তখন একে বলা হতো ‘শেলশক’। বিজ্ঞানের ভাষায় একে এখন ‘পিটিএসডি’ বলা হয়।
যুদ্ধের আতঙ্ক ভুলে একটু শান্তিতে থাকার জন্য লন্ডনের কোলাহল ছেড়ে পরিবার নিয়ে এক গ্রামে চলে যান এ এ মিলনে। সেখানে ‘কোচফোর্ড ফার্ম’ নামের একটি বাড়িতে থাকতে শুরু করেন। সেই বাড়ির কাছেই ছিল ‘অ্যাশডাউন ফরেস্ট’ নামের বিশাল বন।
লেখক প্রায়ই তাঁর ছেলেকে নিয়ে সেই বনে ঘুরতে যেতেন। সঙ্গে থাকত ছোট্ট বিলির খেলনা ভালুকটি। এই বনের রূপ দেখেই লেখক তৈরি করেছিলেন ‘হানড্রেড একর উড’। ‘উইনি-দ্য-পুহ্’ গল্পে আমরা যে মানচিত্র দেখি, বাস্তবেও কিন্তু বনটি ঠিক তেমনই। বনের ভেতর গল্পের সেই বিখ্যাত ব্রিজ আর লেক এখনো দেখা যায়। পর্যটকদের জন্য পুরো বনটি এখন গল্পের সেই মানচিত্রের মতোই সাজিয়ে রাখা হয়েছে।
যার জন্য পুহ্ আর তার বন্ধুদের দেখতে এমন
‘উইনি-দ্য-পুহ্’র গল্পগুলো যেমন চমৎকার, এর ছবিগুলোও তেমনি মায়াবী। এই সব ছবি এঁকেছেন চিত্রকর ই এইচ শেপার্ড। ১৯২৪ সালে তিনি প্রথম মিলনের একটি বইতে ছবি আঁকেন। এর পর থেকে মিলনের লেখা সব শিশুদের বইয়ের ছবি তিনিই আঁকতেন।
অনেকের মতে, মিলনের লেখা আর শেপার্ডের আঁকা ছবিগুলো ছিল একদম নিখুঁত। এসব ছবিতে যেমন শৈশবের আনন্দ ছিল, তেমনি একধরনের মন খারাপের ভাবও ফুটে উঠত। তবে লেখক মিলনে আর চিত্রকর শেপার্ডের মধ্যে আরও একটি মিল ছিল। তাঁরা দুজনই ছিলেন যুদ্ধের সৈনিক।
‘পুহ্’র পুতুল নিয়ে বিশ্ব রেকর্ড
আমেরিকার ডেব হফম্যান দেখিয়ে দিয়েছেন যে ‘উইনি-দ্য-পুহ্’ সবার কাছে কতটা প্রিয়। তাঁর কাছে ‘পুহ্’র সব রকম জিনিসের এক বিশাল সংগ্রহ আছে। বর্তমানে তাঁর কাছে ২৩ হাজার ৬২৩টি জিনিস আছে। ২০২৩ সালে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস তাঁকে স্বীকৃতি দেয়। এটি এখন পর্যন্ত ‘পুহ্’র জিনিস সংগ্রহের দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় রেকর্ড। ডেব এই জমানোর কাজ শুরু করেন ১৯৬৭ সালে।
একনজরে
লেখক এ এ মিলনের ‘পুহ্’কে নিয়ে লেখা চারটি বই:
হোয়েন উই অয়্যার ভেরি ইয়াং (১৯২৪)
পুহ্র প্রথম দেখা মেলে এই কবিতার বইয়ে।
উইনি-দ্য-পুহ্ (১৯২৬)
এটিই ছিল পুহ্র গল্পের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বই।
নাউ উই আর সিক্স (১৯২৭)
এটিও একটি জনপ্রিয় কবিতার বই।
দ্য হাউস অ্যাট পুহ্ কর্নার (১৯২৮)
বইটি ছিল লেখকের দ্বিতীয় ও শেষ উপন্যাস। এখানেই টিগারের প্রথমবার দেখা মেলে।
