সিলেটে বিআরটিএ ফি জমা দিতে চরম ভোগান্তি, ব্যাংক থেকে ব্যাংকে ঘুরে মিলছে না সেবা

ছবি: প্রতীকী এআই দিয়ে তৈরী

সিলেটে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর বিভিন্ন ফি, কর ও সেবা চার্জ পরিশোধ করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ গ্রাহকরা। নির্ধারিত কয়েকটি ব্যাংকের মাধ্যমে এসব ফি জমা নেওয়া হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গ্রাহকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, বিআরটিএ-সংক্রান্ত লেনদেনে ব্যাংক কর্মকর্তাদের অনীহা, অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব, নানা অজুহাত এবং অসৌজন্যমূলক আচরণের কারণে দুর্ভোগ আরও বাড়ছে।

সিলেটে এনআরবিসি ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংক বিআরটিএ-এর বিভিন্ন ফি গ্রহণ করে। তবে এসব ব্যাংকে সেবা নিতে গিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগ, সাধারণ ব্যাংকিং গ্রাহকদের অগ্রাধিকার দিয়ে বিআরটিএ-সংক্রান্ত গ্রাহকদের দীর্ঘ সময় বসিয়ে রাখা হয়। অনেক সময় “সার্ভার ডাউন”, “প্রিন্টারের কাগজ নেই”, “আজ আর নেওয়া হবে না”, “আগে সিরিয়াল নিতে হবে”—এ ধরনের নানা কারণ দেখিয়ে গ্রাহকদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

ভুক্তভোগী তপোবন আবাসিক এলাকার বাসিন্দা মাসুম আহমদ জানান, গাড়ির আয়কর (ইনকাম ট্যাক্স) জমা দিতে তিনি ৫ জুলাই সকাল ১১টার দিকে দরগাহ গেইট এলাকার এনআরবিসি ব্যাংকে যান। সেখানে তাকে জানানো হয়, সকাল ১০টার মধ্যে এসে সিরিয়াল নিতে হবে। অথচ তখন ব্যাংকে মাত্র পাঁচ-ছয়জন গ্রাহক উপস্থিত ছিলেন।

পরে তিনি চৌহাট্টা এলাকার ওয়ান ব্যাংকে যান। সেখানে ক্যাশ কাউন্টারে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অন্য একজনকে জিজ্ঞেস করেন, “বিআরটিএ-এর ট্যাক্স নেবো?” জবাবে বলা হয়, “না, প্রিন্টারে কাগজ নেই।” এরপর তিনি মিডল্যান্ড ব্যাংকে গেলে প্রথমে সেখানেও অনাগ্রহ দেখানো হয়। পরে ব্যাংকের সাবেক এক ব্যবস্থাপকের সঙ্গে পরিচয়ের কথা বলার পর তার টাকা গ্রহণ করা হলেও প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়।

এ ধরনের অভিজ্ঞতা যে শুধু মাসুম আহমদের নয়, তা জানিয়েছেন আরও কয়েকজন গ্রাহক। তাদের দাবি, বিআরটিএ-সংক্রান্ত সেবা নিতে গিয়ে একাধিক ব্যাংকে ঘুরতে হয়। এতে সময় ও অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি মানসিক ভোগান্তিও বাড়ছে।

বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করা হলে সিলেট বিআরটিএ সার্কেল অফিসের সহকারী পরিচালক (এডি) আব্দুর রশিদ বলেন, “এ ধরনের অভিযোগ আগেও আমার কাছে এসেছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ব্যবসায়ী আব্দুল কাদির বলেন, “সরকার অনলাইনে ও ব্যাংকের মাধ্যমে সেবা সহজ করতে চাইলেও মাঠপর্যায়ে অনেক ব্যাংকের কর্মীদের আন্তরিকতার অভাবে মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছে।”

প্রবাসফেরত শাহীন আহমদ বলেন, “একটি ট্যাক্স জমা দিতে যদি তিন-চারটি ব্যাংকে যেতে হয়, তাহলে ডিজিটাল সেবার সুফল কোথায়?”

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী রুবেল আহমদের ভাষ্য, “যারা বিআরটিএ-এর টাকা জমা দিতে আসে, তাদের জন্য আলাদা কাউন্টার বা নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা হলে হয়রানি অনেক কমে যাবে।”

স্থানীয়দের দাবি, বিআরটিএ-এর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ব্যাংকগুলোর সেবার মান নিয়মিত তদারকি করা, অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা চালু করা এবং অযৌক্তিকভাবে গ্রাহকদের ফিরিয়ে দিলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থা আরও কার্যকর ও সহজলভ্য করা গেলে গ্রাহকদের দুর্ভোগ অনেকাংশে কমবে বলে মনে করছেন তারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মিডল্যান্ড ব্যাংক সিলেট শাখার এক কর্মকর্তা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমরা সব গ্রাহকের সঙ্গেই সমান আচরণ করি। বিআরটিএ-সংক্রান্ত সেবা দিতে আমাদের কোনো অনীহা নেই। তবে মাঝে মাঝে প্রিন্টারের কাগজ শেষ হয়ে গেলে সাময়িকভাবে সেবা দিতে কিছুটা বিলম্ব বা অসুবিধা হয়।”

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে এনআরবিসি ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে গ্রাহকদের দাবি, ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ যেকোনো কারিগরি সমস্যা বা উপকরণের সংকটের দায় সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের ওপর চাপানো উচিত নয়। তারা বিআরটিএ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এ বিষয়ে কার্যকর নজরদারি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন