৬ই ডিসেম্বর সিলেটের আলীয়া মাদ্রাসা মাঠে ছিল আন্দোলনের শরিক ৮ দলের বিভাগীয় সমাবেশ। সমাবেশের দিনই নতুন চমক নিয়ে হাজির হলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক। বেলা ১১টার দিকে তিনি বিমানযোগে সিলেটে পৌঁছেন। ছুটে যান বালাগঞ্জের গহরপুরে। আল্লামা নুরউদ্দিন গহরপুরী (রহ.) স্মৃতি বিজড়িত মাদ্রাসায়। সেখানে তিনি সুধী সমাবেশ করেন। আর এই সুধী সমাবেশে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসে আনুষ্ঠানিক যোগদান করেন গহরপুরী (রহ.) পুত্র ও বর্তমানে মাদ্রাসার মুহতামিম মুসলেহ উদ্দিন রাজু। যোগদানের পরপরই রাজুকে সিলেট-৩ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেন মাওলানা মামুনুল হক। তার কয়েক মাস আগে অবশ্য আরেকজনকে এ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছিল। মামুনুল হকের এই ঘোষণায় দলের ভেতরে কম্পন হলেও সেটি প্রকাশ্যে আসেনি। পরবর্তীতে দলীয় প্রধানের সিদ্ধান্তকে মেনে নেন সবাই। সেই মাওলানা রাজুকে নিয়ে এবার ৮ দলের আসন ভাগবাটোয়ারায় চূড়ান্ত দেনদরবারে নেমেছেন দলের প্রধান।
আট দলের নেতারা জানিয়েছেন-সিলেট-৩’র হিসেবে জেলায় ৮ দলের ভাগবাটোয়ারার চূড়ান্ত ফয়সালা আটকে আছে। হিসাব এখানে অনেক। আসনটিতে বিএনপি’র ভেতরে নানা প্রেডিকশন আছে। প্রার্থী ঘোষণার পর যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছিল সেটি প্রকাশ না হলেও মিটমাট হয়নি। এ ছাড়া নতুন করে জাতীয় পার্টি থেকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য আতিকুর রহমান আতিককে। এজন্য আসনটিতে প্রতিপক্ষ জোটের কর্মী-সমর্থকরা জয়ের সম্ভাবনা দেখছেন। ফলে আসন নিয়ে ৮ দলের মধ্যে টানাপড়েন শুরু হয়েছে। এ আসনে শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে ধরা হচ্ছে জামায়াত নেতা মাওলানা লোকমান আহমদকে। তিনি দক্ষিণ সুরমা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান। গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে মাঠে রয়েছেন। দক্ষিণ সুরমা ও ফেঞ্চুগঞ্জের ভোটে তার শক্ত অবস্থান রয়েছে। এ দুটি উপজেলায় জামায়াতের উপজেলা চেয়ারম্যানরা ছিলেন। জামায়াতের পর আসনে শক্ত অবস্থান খেলাফত মজলিসের। এখানে দলটির প্রার্থী জেলার সাধারণ সম্পাদক দিলওয়ার হোসেন।
কওমি মাদ্রাসা কেন্দ্রিক ভোট ছাড়াও এ আসনে দলের শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। এই প্রার্থীকে ডিঙিয়ে আসনে নবাগত নেতা রাজুকে প্রার্থী করা নিয়ে ৮ দলের ভেতরে নানা হিসাবনিকাশ চলছে। তবে মাওলানা মামুনুল হক এ আসন নিয়ে অনড় অবস্থানে। তিনি আসনে তার প্রার্থী চান।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সিলেট নগরের সভাপতি মাওলানা এমরান আলম জানিয়েছেন-আমীরে মজলিস সিলেট-৩ আসন নিয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় কেন্দ্রীয় শূরা বৈঠকে এ আসন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আসনটি খেলাফত মজলিসই পাবে বলে আশাবাদী তিনি। জানিয়েছেন- সিলেটের ৬টি আসনের মধ্যে একটি আসনই খেলাফত মজলিস চেয়েছে। যদি সেটি ছাড় দেয়া হয় অন্য আসনে তাদের পক্ষ থেকে ছাড় দেয়া হতে পারে। এ আসনে আগেও প্রার্থী হয়েছিলেন মাওলানা রাজুর পিতা প্রখ্যাত আলেম আল্লামা নুরউদ্দিন গহরপুরী (র.)। অন্যদিকে সুনামগঞ্জ-৩ (দক্ষিণ সুনামগঞ্জ ও জগন্নাথপুর) আসনে সাবেক এমপি এডভোকেট মাওলানা শাহীনুর পাশাকেও ৮ দলের প্রার্থী হিসেবে চাইছেন মাওলানা মামুনুল হক। শাহীনুর পাশা চৌধুরী এ আসনে পূর্বে জমিয়ত থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকে জমিয়তের সঙ্গে টানাপড়েন শুরু হওয়ায় তিনি গণ-অভ্যুত্থানের পর এসে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসে যোগ দিয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমীর। সিলেট-৩ আসনের মতো সুনামগঞ্জ-৩ আসনটি ছাড়তে চায় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। ৮ দলের নেতারা জানিয়েছেন- নীতিগত সিদ্ধান্ত হচ্ছে ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের অধীনে বিতর্কিত নির্বাচনে যারা ভোটযুদ্ধে নেমেছিলেন তাদের প্রার্থী দেয়া হবে না। সেক্ষেত্রে তারা শাহীনুর পাশাকে এ আসনে প্রার্থী চান না। এ ছাড়া নির্বাচনের পূর্বে তিনি পতিত সরকারের প্রধানের সঙ্গে গিয়ে বৈঠক করেছেন। এর ওই সময়ের কার্যক্রমের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাসছে। এ কারণে আসনে শাহীনুর পাশাকে তারা এমপি প্রার্থী চান না। তবে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নেতাদের দাবি হচ্ছে- ওই সময় শাহীনুর পাশাকে নির্বাচন করতে বাধ্য করা হয়েছিল। চোখ রাঙানির মুখে অনেকেই নির্বাচন করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
শাহীনুর পাশা ছিলেন তাদের একজন। ওই সময় শাহীনুর পাশা নানাভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের দ্বারা নির্যাতিত হয়েছিলেন বলে জানান তারা।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য মাওলানা শাহ মমশাদ আহমদ জানিয়েছেন-দলের প্রধান আমীরে মজলিস সিলেট-৩ ও সুনামগঞ্জ-৩ নিয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। এর কারণ দুটি আসনে জয়ের প্রার্থীরা রয়েছেন। ফলে সমর্থন পেলে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থীরা ভোটযুদ্ধে চমক দেখাতে পারেন। এ কারণে মাওলানা মামুনুল হক এ দুটি আসনে খেলাফত মজলিসের প্রার্থী চান। তিনি বলেন- সিলেট অঞ্চলে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের শক্তিশালী ভোট ব্যাংক ও অবস্থান রয়েছে। মরহুম প্রিন্সিপাল আল্লামা হাবিবুর রহমান সংগঠনকে সিলেটের মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন। ফলে দুটি আসনে খেলাফত মজলিস প্রার্থীদের জয়ের সম্ভাবনা উজ্জল বলে জানান তিনি।
