সিলেট শিক্ষা বোর্ডে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফল যেন দীর্ঘদিনের একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে—সিলেটের মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থা আসলে কতটা কার্যকর?
সিলেট শিক্ষা বোর্ডে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে বড় ধরনের ধস নেমেছে। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে ৫৮.৩৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০২৬ সালের ১০ আগস্ট প্রকাশিত ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত বছরের (২০২৫ সালের পাসের হার ৬৮.৫৭%) তুলনায় এবার পাসের হার কমেছে ১০.২৪ শতাংশীয় পয়েন্ট।
শিক্ষার মানে ধস, কোচিংনির্ভরতা, শিক্ষক সংকট ও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ায় শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে হতাশা। বিশেষ করে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাসের হার কমে যাওয়া এবং জিপিএ-৫-এর সংখ্যা আশানুরূপ না হওয়ায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—সিলেটের মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থায় আসলে কী ঘটছে?
শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, ফল বিপর্যয়ের পেছনে একক কোনো কারণ নেই। দীর্ঘদিনের শিক্ষক সংকট, পাঠদানে অনিয়ম, শিক্ষার্থীদের কোচিং ও প্রাইভেটনির্ভরতা, দুর্বল একাডেমিক তদারকি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভেদে শিক্ষার মানের ব্যাপক বৈষম্য এবং অভিভাবকদের অসচেতনতা সব মিলিয়েই পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।
এক নজরে ২০২৬ সালের সিলেট বোর্ড:
পরীক্ষার্থী ৮৯,০৭৯
উত্তীর্ণ ৫১,৯৫৭
পাসের হার ৫৮.৩৩%
জিপিএ-৫ ৩,৮৩৬
ছেলে পাস ১৯,৮৮৯
মেয়ে পাস ৩২,০৬৮
ছেলে জিপিএ-৫ ১,৭৪৫
মেয়ে জিপিএ-৫ ২,০৯১
শতভাগ পাস প্রতিষ্ঠান ৯টি
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ৯৭৩টি
সিলেটে এসএসসির ফল বিপর্যয়ের উল্লেখ যোগ্য কিছু কারণ
পরীক্ষা কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা ও কঠোর নজরদারি:
সিলেট শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক বিলকিস ইয়াসমিনের দেওয়া তথ্যমতে, এবার মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় প্রতিটি পরীক্ষা কেন্দ্রে বাধ্যতামূলকভাবে সিসি (CCTV) ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছিল. এর ফলে শিক্ষার্থীরা সম্পূর্ণ অসদুপায়মুক্ত ও কঠোর নজরদারির মধ্যে ‘ক্লিন ও ক্লিয়ার’ পরীক্ষা দিতে বাধ্য হয়েছে. অতীতে যে ধরণের অনৈতিক সুযোগ বা শিথিলতা দেখা যেত, তা এবার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পাসের হারে এর বড় প্রভাব পড়েছে।
ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে গণফেল:
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শিক্ষার্থীরা এবার সবচেয়ে বেশি খারাপ করেছে ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে. বিশেষ করে গ্রামীণ ও দুর্গম হাওর অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এই দুটি কঠিন বিষয়ের জন্য দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষকের চরম সংকট রয়েছে. ফলে শিক্ষার্থীরা মৌলিক ভিত্তি ছাড়াই পরীক্ষায় অংশ নেয় এবং এই দুই বিষয়ের ধাক্কাতেই গড় পাসের হারে ধস নেমেছে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা মানবিক বিভাগে:
মানবিক বিভাগের বিপর্যয়বিভাগভিত্তিক ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার সন্তোষজনক (৮০.৩২%) হলেও মানবিক বিভাগে পাসের হার মাত্র ৪৮.১৬ শতাংশ. অর্থাৎ, মানবিক বিভাগের অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষার্থী ফেল করেছে. মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় অমনোযোগিতা এবং ইংরেজি-গণিতে ধারাবাহিক দুর্বলতাই পুরো বোর্ডের ফলাফলকে নিচে নামিয়ে দিয়েছে।
মোবাইল আসক্তি ও পড়াশোনায় বিমুখতা:
শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকদের মতে, শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ পড়াশোনার চেয়ে স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশি সময় ব্যয় করছে. করোনা মহামারী ও পরবর্তী সময়ের অনলাইন ক্লাসের অভ্যাস থেকে তৈরি হওয়া এই মোবাইল আসক্তি শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পড়াশোনার সংস্কৃতি ও একাগ্রতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে.
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও শিক্ষাক্রমের ঘন ঘন পরিবর্তন
২০২৪ সালের রাজনৈতিক গণ-অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী সময়ে শিক্ষাক্রমের ধারাবাহিক পরিবর্তন (নতুন কারিকুলাম চালু ও পুনরায় তা বাতিল করা) শিক্ষার্থীদের মনে এক ধরণের অনিশ্চয়তা ও মানসিক অস্থিরতা তৈরি করেছিল. ঘন ঘন এই পরীক্ষা পদ্ধতি ও সিলেবাস পরিবর্তনের কারণে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় ঠিকমতো মনোযোগী হতে পারেনি, যার চূড়ান্ত প্রতিফলন ঘটেছে এই ফলাফলে.
খাতা মূল্যায়নে কড়াকড়ি ও ‘মন খুলে’ নম্বর না দেওয়া
শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, পূর্ববর্তী বছরগুলোতে ফলাফল ‘ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে’ দেখানোর যে প্রবণতা ছিল, তা এবার বন্ধ করা হয়েছে. শিক্ষকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল যেন উত্তরপত্র কঠোরভাবে এবং সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়. কোনো প্রকার কৃত্রিম নম্বর যুক্ত না করায় শিক্ষার্থীরা তাদের মেধার প্রকৃত মূল্যায়ন পেয়েছে, যা পাসের হার কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ.
শিক্ষক সংকট ও পাঠদানে ঘাটতি
সিলেটের বিভিন্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষক কম থাকার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে গণিত, ইংরেজি, বিজ্ঞান ও আইসিটির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দক্ষ শিক্ষকের সংকট রয়েছে অনেক প্রতিষ্ঠানে। ফলে নিয়মিত ক্লাস নেওয়া হলেও শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় মানের পাঠদান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। শিক্ষকদের একটি অংশ মনে করেন, শুধু পরীক্ষার আগে প্রস্তুতি নেওয়ার প্রবণতাও ফল খারাপের অন্যতম কারণ। সারা বছর নিয়মিত পড়াশোনা ও মূল্যায়নের পরিবর্তে শেষ সময়ে সাজেশন ও সম্ভাব্য প্রশ্নের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে অনেক শিক্ষার্থী।
কোচিং-প্রাইভেটনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা
সিলেটে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ বিদ্যালয়ের পাশাপাশি কোচিং ও ব্যক্তিগত শিক্ষকের ওপর নির্ভরশীল। এতে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ কমছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।অভিভাবকদের অনেকে মনে করেন, স্কুলে পর্যাপ্ত পাঠদান না হওয়ায় সন্তানকে প্রাইভেট পড়ানো ছাড়া উপায় থাকে না। অন্যদিকে শিক্ষাবিদদের মতে, বিদ্যালয়ের শিক্ষার ওপর আস্থা কমে গিয়ে কোচিংনির্ভরতা বাড়া পুরো শিক্ষাব্যবস্থার জন্যই উদ্বেগজনক।
দুর্বল একাডেমিক তদারকি
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফল, শিক্ষক উপস্থিতি, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান এবং শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার ফল খারাপ হওয়ার পর আলোচনা হলেও বছরজুড়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। ফলে দুর্বল শিক্ষার্থীরা এক শ্রেণি থেকে আরেক শ্রেণিতে উঠলেও তাদের মৌলিক দুর্বলতা কাটে না।
শহর-গ্রামের বৈষম্য
সিলেট মহানগর ও শহরকেন্দ্রিক ভালো ফল করা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ফলাফলে বড় পার্থক্য রয়েছে। শহরের অনেক শিক্ষার্থী বাড়তি কোচিং, প্রাইভেট, অনলাইন ক্লাস ও শিক্ষা উপকরণের সুবিধা পেলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী ও হাওরাঞ্চলের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট, যাতায়াত সমস্যা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার প্রবণতা শিক্ষার মানকে প্রভাবিত করছে।
করোনার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
শিক্ষাব্যবস্থায় করোনাকালীন ক্ষতির প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটেনি বলেও মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘ সময় শ্রেণিকক্ষে স্বাভাবিক পাঠদান বন্ধ থাকায় অনেক শিক্ষার্থীর মৌলিক শিক্ষায় ঘাটতি তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে সেই ঘাটতি পূরণের জন্য কার্যকর একাডেমিক পরিকল্পনা না থাকায় দুর্বলতা অনেকের মধ্যেই থেকে গেছে।
পরীক্ষাভীতি ও মানসিক চাপ
এসএসসি পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলেও অনেক শিক্ষার্থী অতিরিক্ত মানসিক চাপের মধ্যে পরীক্ষা দেয়। ভালো ফল করার জন্য পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশা, জিপিএ-৫ পাওয়ার প্রতিযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তাদের স্বাভাবিক প্রস্তুতিতে প্রভাব ফেলছে।মনোবিজ্ঞানীদের মতে, শুধু ফলাফলকেন্দ্রিক না হয়ে শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহ ও মানসিক সুস্থতার দিকেও নজর দিতে হবে।
বিদেশ গমনের মানসিকতাও কি প্রভাব ফেলছে?
সিলেটের শিক্ষাব্যবস্থার ফলাফল বিশ্লেষণ করতে গেলে আরেকটি সামাজিক বাস্তবতাকেও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন—বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা। দীর্ঘদিন ধরেই সিলেটের তরুণদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা অভিবাসনের উদ্দেশ্যে বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যাওয়ার প্রবণতা সিলেটের সামাজিক বাস্তবতার একটি পরিচিত অংশ।
শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করেন, বিদেশে যাওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা শিক্ষার্থীদের একটি অংশের শিক্ষাজীবনের লক্ষ্য ও মনোযোগে প্রভাব ফেলতে পারে। অনেক শিক্ষার্থীর কাছে এসএসসি বা এইচএসসির ফলাফল, উচ্চশিক্ষার প্রতিযোগিতা কিংবা একাডেমিক উৎকর্ষের চেয়ে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে বিদ্যালয়ের নিয়মিত পড়াশোনা, শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি এবং পরীক্ষার প্রস্তুতিতে তাদের আগ্রহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
বিশেষ করে যেসব পরিবারে বিদেশে বসবাসরত স্বজন রয়েছেন, সেখানে অল্প বয়স থেকেই বিদেশ যাওয়ার চিন্তা অনেক শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হয়ে ওঠে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা মনে করে, দেশে ভালো ফলাফল বা উচ্চশিক্ষার চেয়ে বিদেশে যাওয়াই ভবিষ্যৎ গড়ার সহজ কিংবা আকর্ষণীয় পথ। এ ধরনের মানসিকতা দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার প্রতি তাদের আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে।
তবে বিষয়টিকে সরলভাবে ‘বিদেশ যাওয়ার প্রবণতাই ফল খারাপের কারণ’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য ভালো একাডেমিক ফলাফল বরং অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়। তাই এখানে মূল বিষয় হলো বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা নয়, বরং বিদেশ যাওয়ার জন্য একাডেমিক শিক্ষাকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ছেলে-মেয়ের ফলাফলেও স্পষ্ট পার্থক্য
এবারের এসএসসি ফলাফলে সিলেট শিক্ষা বোর্ডে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের সাফল্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বোর্ডের হিসাবে, উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১৯ হাজার ৮৮৯ জন ছেলে এবং ৩২ হাজার ৬৮ জন মেয়ে। জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রেও মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে এগিয়ে—মেয়েদের জিপিএ-৫ সংখ্যা ২ হাজার ৯১, বিপরীতে ছেলেদের ১ হাজার ৭৪৫।
এই পার্থক্যও নতুন করে আলোচনার দাবি রাখে—কেন সিলেটে মেয়েরা তুলনামূলক ভালো করছে, অথচ ছেলেদের একটি বড় অংশ পিছিয়ে পড়ছে?
এর পেছনে বিদেশমুখী মানসিকতা একটি সম্ভাব্য সামাজিক কারণ কি না, সেটি গবেষণার মাধ্যমে যাচাই করা যেতে পারে। কারণ সিলেটে বিদেশে যাওয়ার সঙ্গে পারিবারিক ও সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে তরুণ পুরুষদের সম্পৃক্ততা ঐতিহাসিকভাবে বেশি। অনেক পরিবারে ছেলেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা দ্রুত কর্মজীবন, ব্যবসা কিংবা বিদেশে যাওয়াকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। বিপরীতে মেয়েদের একটি বড় অংশ এখনো শিক্ষাজীবন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি এবং একাডেমিক সাফল্যকে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান পথ হিসেবে দেখছে—এমন একটি প্রবণতা ফলাফলের পার্থক্যে ভূমিকা রাখছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
তবে এই ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে দেখার আগে ছেলে ও মেয়েদের উপস্থিতি, বিদ্যালয়ত্যাগের হার, বিষয়ভিত্তিক ফলাফল, কোচিংয়ে অংশগ্রহণ, পারিবারিক আর্থসামাজিক অবস্থা এবং বিদেশ যাওয়ার পরিকল্পনার সঙ্গে শিক্ষার সম্পর্ক নিয়ে আলাদা গবেষণা প্রয়োজন।
কারণ সমস্যার সঠিক কারণ শনাক্ত করা গেলে সমাধানের পথও বের করা সম্ভব। শিক্ষার্থীদের বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন থেকে বিরত রাখা নয়; বরং তাদের বোঝাতে হবে—বিদেশে যেতে হলেও ভালো শিক্ষা, দক্ষতা ও যোগ্যতা প্রয়োজন। বিদেশমুখী স্বপ্নকে শিক্ষাবিমুখতার কারণ না বানিয়ে বরং দক্ষতা অর্জন ও উচ্চশিক্ষার অনুপ্রেরণায় রূপান্তর করতে পারলেই সিলেটের তরুণদের জন্য তা হতে পারে শক্তি, দুর্বলতা নয়।
দায় কার?
সিলেটে এসএসসির ফল বিপর্যয়ের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—দায় কার? শিক্ষার্থীর? শিক্ষকের? অভিভাবকের? নাকি পুরো শিক্ষাব্যবস্থার?
সংশ্লিষ্টদের মতে, দায় কোনো এক পক্ষের নয়। শিক্ষার্থীকে নিয়মিত পড়তে হবে, শিক্ষককে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পাঠদান করতে হবে, অভিভাবককে সন্তানকে সময় দিতে হবে এবং শিক্ষা প্রশাসনকে কার্যকর তদারকি করতে হবে। এর কোনো একটি জায়গায় বড় ধরনের ঘাটতি থাকলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
শিক্ষাবিদদের পরামর্শ: দায় চাপিয়ে নয়, সমস্যার গভীরে যেতে হবে
শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, সিলেট শিক্ষা বোর্ডের ফল বিপর্যয়কে কেবল শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে সংকটের প্রকৃত কারণ আড়ালেই থেকে যাবে। ফলাফল কেন খারাপ হলো, তার জন্য শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষা প্রশাসন—প্রতিটি স্তরের ভূমিকা আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
তাদের মতে, প্রথমেই প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফল নিয়ে একটি সমন্বিত বিশ্লেষণ করা দরকার। কোন প্রতিষ্ঠানে কতজন শিক্ষার্থী ফেল করেছে, কোন বিষয়ে ফেল বেশি, কোন শ্রেণি থেকে শিক্ষার্থীদের মৌলিক দুর্বলতা তৈরি হচ্ছে, কোন এলাকায় ফলাফল ধারাবাহিকভাবে খারাপ এবং কোন প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক ভালো করছে—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে সমস্যার মূল জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে হবে।
বিশেষ করে গণিত ও ইংরেজির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। শুধু পরীক্ষার আগে অতিরিক্ত ক্লাস কিংবা সাজেশননির্ভর প্রস্তুতি নয়, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই শিক্ষার্থীদের মৌলিক জ্ঞান ও দক্ষতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। যেসব শিক্ষার্থী নিয়মিত পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছে, তাদের আগেভাগেই শনাক্ত করে রেমিডিয়াল বা সহায়ক ক্লাসের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়নও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ, আধুনিক পাঠদান পদ্ধতির সঙ্গে শিক্ষকদের পরিচিত করা এবং শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কার্যকর একাডেমিক তদারকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
শিক্ষাবিদদের মতে, শুধু বিদ্যালয়ের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিলেও হবে না। অভিভাবক-শিক্ষক যোগাযোগ বাড়াতে হবে। শিক্ষার্থীর উপস্থিতি, পরীক্ষার ফল, দুর্বল বিষয় এবং পড়াশোনার অগ্রগতি সম্পর্কে অভিভাবকদের নিয়মিত অবহিত করতে হবে। বিশেষ করে যেসব শিক্ষার্থী ঝুঁকিতে রয়েছে, তাদের নিয়ে বিদ্যালয়, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীর সমন্বয়ে আলাদা পরিকল্পনা তৈরি করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য কমানো জরুরি। প্রত্যন্ত ও হাওরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত শিক্ষক, বিজ্ঞানাগার, গ্রন্থাগার, প্রযুক্তিগত সুবিধা ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ নিশ্চিত করতে হবে। কোথাও শিক্ষক সংকট থাকলে দ্রুত তা পূরণ করতে হবে এবং দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকা পদগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পূরণের উদ্যোগ নিতে হবে।
হতে পারে গোলটেবিল বৈঠক
সিলেটের শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি সমন্বিত গোলটেবিল বৈঠক আয়োজনের প্রস্তাবও দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সিলেটের দুই মন্ত্রী উদ্যোগ নিলে এ ধরনের একটি বৈঠক হতে পারে আরও কার্যকর ও ফলপ্রসূ।
এতে সিলেটের দুই মন্ত্রী, শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তা, সিলেট শিক্ষা বোর্ডের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান, শিক্ষক প্রতিনিধি, অভিভাবক, এসএসসি পরীক্ষার্থী ও সাবেক শিক্ষার্থী, সাংবাদিক এবং শিক্ষা নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানানো যেতে পারে।
গোলটেবিল বৈঠকে শুধু ফল বিপর্যয় নিয়ে আলোচনা না করে গত পাঁচ থেকে দশ বছরের ফলাফল বিশ্লেষণ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ফলাফলের বৈষম্য, বিষয়ভিত্তিক ফেল করার হার, শিক্ষক সংকট, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি, কোচিংনির্ভরতা, শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ, অভিভাবকদের ভূমিকা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তব চিত্র তুলে ধরা যেতে পারে।
বিশেষ করে ‘কেন ফেল করছে’—এই প্রশ্নের পাশাপাশি ‘কেন কিছু প্রতিষ্ঠান ভালো করছে’—এই প্রশ্নটিও সামনে আনা জরুরি। যেসব প্রতিষ্ঠান ধারাবাহিকভাবে ভালো ফল করছে, তাদের পাঠদান পদ্ধতি, শিক্ষক ব্যবস্থাপনা, শিক্ষার্থী তদারকি, অভিভাবক সম্পৃক্ততা ও একাডেমিক ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনা করে তা অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অনুসরণীয় মডেল হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
বৈঠক শেষে শুধু আলোচনা বা সুপারিশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। কোন কাজ কে করবে, কত সময়ের মধ্যে করবে এবং তার অগ্রগতি কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে—সেটিও নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
কারণ এসএসসির ফলাফল শুধু একটি পরীক্ষার ফল নয়; এটি একটি অঞ্চলের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার মানের প্রতিফলন। তাই এবারের ফল বিপর্যয়কে ব্যর্থতার তালিকা হিসেবে না দেখে সিলেটের শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানো যেতে পারে।
সিলেটের দুই মন্ত্রী যদি রাজনৈতিক মত-পার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের সঙ্গে নিয়ে এমন একটি উদ্যোগ গ্রহণ করেন, তাহলে শুধু এবারের ফল বিপর্যয়ের কারণ চিহ্নিত করাই নয়—আগামী কয়েক বছরে সিলেটের শিক্ষার মান উন্নয়নে একটি বাস্তবসম্মত ও টেকসই রোডম্যাপও তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।