সিলেটে সড়ক দুর্ঘটনা: ‘দুই ভাই একসঙ্গে চলে গেল-এটা কীভাবে মেনে নেব’

হাসপাতালের মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে বারবার ভেঙে পড়ছিলেন শামীম আহমদ। কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসছিল তার। কিছুতেই যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না- একই সঙ্গে হারিয়েছেন তার দুই খালাতো ভাইকে।

‘সকালে ফোনে শুনলাম আজির নেই। হাসপাতালে এসে দেখি পাশেই আরেকটি লাশ। পরে বুঝলাম, সেটি আমির। দুই ভাই একসঙ্গে চলে গেল-এটা কীভাবে মেনে নেব?’- কথাগুলো বলতে বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

রোববার সকালে সিলেটের দক্ষিণ সুরমার লালাবাজারে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান আপন দুই ভাই আজির উদ্দিন (২৮) ও আমির উদ্দিন (২২)। কাজের সন্ধানে বেরিয়ে আর বাড়ি ফেরা হলো না তাদের।

স্বজনেরা জানান, সকালে আম্বরখানা থেকে ছাদ ঢালাইয়ের কাজে যাওয়ার পথে কাঠালবোঝাই একটি ট্রাকের সঙ্গে তাদের বহনকারী পিকআপের সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই চারজনের মৃত্যু হয়, পরে হাসপাতালে মারা যান আরও চারজন। সেই তালিকায় যুক্ত হন আজির ও আমির- দুই ভাই।

সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার পলাশ গ্রামের এই দুই ভাই ছিলেন পরিবারের একমাত্র ভরসা। অসুস্থ মা, বৃদ্ধ বাবা ও প্রতিবন্ধী বোন- সব দায়িত্ব ছিল তাদের কাঁধে। জীবিকার তাগিদে কখনও দিনমজুর, কখনও নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন তারা।

এদিকে ছোট ভাই আমিরের বিয়ের কথাবার্তাও প্রায় চূড়ান্ত ছিল। পরিবারে ছিল নতুন স্বপ্নের আলো। কিন্তু এক মুহূর্তেই সেই আলো নিভে গেল।

এদিকে দুই সন্তানকে হারিয়ে গ্রামের বাড়িতে শোকের মাতম। মা বারবার অজ্ঞান হয়ে পড়ছেন, বৃদ্ধ বাবা নির্বাক। প্রতিবন্ধী বোনের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তায়।

স্থানীয়রা বলছেন, এই দুই ভাই শুধু পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যই ছিলেন না, ছিলেন আশার আলো। তাদের মৃত্যুতে একটি পরিবার যেন একসঙ্গে সব হারাল।

পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, নগরীর আম্বরখানা পয়েন্টে থেকে ২০ জন ঢালাই শ্রমিক একটি পিকআপে করে দক্ষিণ সুরমার লালাবাজারের দিকে যাচ্ছিলেন। তাদের সঙ্গে ছিল ঢালাই মেশিনও। পিকআপটি তেলিবাজার ব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা কাঁঠালবোঝাই ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।

শ্রমিকরা জানান, তখন পিকআপে থাকা সবাই ছিটকে পড়েন। ঘটনাস্থলে মারা চারজন। সিলেট এমএজি ওসমানি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও চারজনের মৃত্যু হয়। বাকি আহতরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

দুর্ঘটনায় নিহত অপর ছয়জন হলেন- ধর্মপাশা উপজেলার নার্গিস আক্তার (৪৫), দিরাইয়ের সেছনি গ্রামের মোছা. মুন্নি বেগম (২৬), দিরাই ইসলামপুরের নুরুজ আলী (৬০) ও নূরনগরের ফরিদুল (৩৫), সিলেট সদর উপজেলার জালালাবাদ থানার রায়েরগাঁওয়ের বদরুল আমিন (৪০), সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের পুটামারা গ্রামের পাণ্ডব বিশ্বাস (২২)।

আহতরা হলেন- হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার আমকান্দি গ্রামের রফিক মিয়ার ছেলে মো. আলমগীর (৩২), সিলেট নগরীর কালিবাড়ী এলাকার মৃত শুকুর উল্লাহর ছেলে তোরাব উল্লাহ (৬০), আম্বরখানা লোহারপাড়ার মৃত আলিম উদ্দিনের ছেলে রামিন (৪০) ও একই এলাকার মল্লিক মিয়ার ছেলে আফরোজ মিয়া (৪০), সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার গাছতলা গ্রামের খোকন মিয়ার মেয়ে রাভু আক্তার (২৫), সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পুটামারা গ্রামের বদরুজ্জামানের মেয়ে হাফিজা বেগম (৩০) এবং দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়ার জফুর আলীর ছেলে রাজা মিয়া (৪৫)।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন