সিলেট নগরীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন টন টন বর্জ্য এনে ফেলা হচ্ছে সুরমা নদীতে। বলতে গেলে, সুরমা এখন অঘোষিত ডাম্পিং সাইট। অথচ এক সময় স্বচ্ছ জলের কলকল ধ্বনিতে মুখরিত থাকত নদীটি। সেই চিরচেনা সুরমা আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। বর্ষায় ময়লা-আবর্জনা ভেসে ওঠে, আর শুষ্ক মৌসুমে দৃশ্যমান হয় পলিথিনের স্তর। নদীর কাছে গেলেই নাকে রুমাল চাপতে বাধ্য হচ্ছেন পথচারীরা।
সরেজমিন দেখা গেছে, নাব্য কমে যাওয়ায় শুকনো মৌসুমে নদীটি স্থবির রূপ ধারণ করেছে। স্থানে স্থানে জেগেছে চর। যে নদী একসময় নৌ-বাণিজ্যের প্রধান পথ ছিল, সেটি এখন হেঁটেই পার হচ্ছেন লোকজন। অথচ এক সময় সুরমার যৌবনা রূপ দেখতে সিলেটে ছুটে আসতেন দেশ-বিদেশের মানুষ। এর তীরে বসে স্বজনদের নিয়ে চলত গল্প, আড্ডা আর গানের আসর। সেই সুরমা আজ ময়লা-আবর্জনার স্তূপে মৃতপ্রায়। নদীর পারে অন্তত ৫০টি স্থানে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ জমেছে। নদীর মাঝ অবধি ছড়িয়ে পড়েছে দুর্গন্ধময় বর্জ্য। দূর থেকে দেখলে মনে হয় এ কোনো নদী নয়, ময়লার ভাগাড়।
সরেজমিন দেখা যায়, পচা সবজি ও গৃহস্থালির ময়লা-আবর্জনা স্তূপ হয়ে আছে নদীর পারে। এসব স্তূপে প্লাস্টিকের খালি বোতল থেকে শুরু করে পলিথিন, নারকেল ও সুপারির বাকল, ক্লিনিক্যাল বর্জ্য, পরিত্যক্ত বস্তা, চিপসের খালি প্যাকেটসহ বাসাবাড়ি ও হোটেল-রেস্তোরাঁর বর্জ্যে ভরে আছে। আর সেই ময়লার স্তূপের পাশেই দুর্গন্ধের মধ্যেই গোসল করতেও দেখা গেছে লোকজনকে।
সিলেট নগরীর ৯টি স্থানে আবর্জনার স্তূপ দেখা গেছে। এর মধ্যে আছে তোপখানাঘাট, মেন্দিবাগ এলাকার মাছিমপুর ঘাট, কালীঘাট, ঝালোপাড়া, কদমতলী, চাঁদনীঘাট, কাজীরবাজার, শেখঘাট ও কানিশাইল ঘাট। সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যায় কালীঘাট ও কাজীরবাজার এলাকায়। এ দুটি এলাকায় শৌচাগারের ময়লা সরাসরি নদীতে এসে পড়ছে। শেখঘাট ও কদমতলী ঘাটে প্রকাশ্যে ময়লা ফেলা হচ্ছে।পরিবেশবিদদের মতে, নদীর শহর অংশে হাজার হাজার টন পলিথিন বর্জ্য ইতোমধ্যে নদীর তলদেশে জমে গেছে। কোনো কোনো স্থানে তলদেশে ৫ থেকে ৬ ফুট পর্যন্ত পলিথিনের স্তর। পরিবেশ নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘বাচাও’-এর প্রধান নির্বাহী তাইনুল ইসলাম আসলাম বলেন, ‘এ সুরমার পাশে বড় হয়েছি। সাঁতার কাটা থেকে শুরু করে সবই ছিল সুরমাকেন্দ্রিক। এখন নদীকে যেন বর্জ্য ফেলার ভাগাড় বাননো হয়েছে।’
সুরমাকে বাঁচাতে একযোগে সাতটি পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জারি অ্যান্ড থ্রিজেনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক নাসরিন সুলতানা লাকী। এগুলো হলো–দ্রুত নদী খননকাজ শুরু করে পলি অপসারণ ও নাব্য ফিরিয়ে আনা; অবৈধ দখল উচ্ছেদ ও নদীর জমি উদ্ধার; নিয়মিত পলিথিন অপসারণ অভিযান; নদীর আশপাশে পর্যাপ্ত ডাস্টবিন স্থাপন ও বর্জ্য সংগ্রহ নিশ্চিতকরণ; নদীতে বর্জ্য নিক্ষেপকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা; সিলেট থেকে দুজন মন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা এবং স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে মসজিদ-মন্দির পর্যন্ত সব পর্যায়ে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা।
তিনি বলেন, সরকারি উদ্যোগ ও নগরবাসীর সচেতনতা– দুটো না মিললে সুরমার পুনরুজ্জীবন স্বপ্নই থেকে যাবে। আগামী প্রজন্ম সুরমাকে যেন ইতিহাসের পাতায় নয়, জীবন্ত নদী হিসেবে চিনতে পারে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
ঘাসিটুলা বেতবাজার সবুজছায়া আবাসিক এলাকার বাসিন্দা মখলিছুর রহমান বলেন, ‘নদীর সর্বনাশ আমরাই ডেকে এনেছি। নদীর পানি দুর্গন্ধযুক্ত। অথচ এ পানি আমরা পান করেছি।’ তিনি বলেন, ‘বাড়িঘরের ময়লা থেকে কলকারখানার বর্জ্য এসে পড়ছে নদীতে। আগে নদীতে প্রচুর মাছ মিলত। এখন মাছের দেখা মেলে না।’ তিনি বলেন, নদীর দূষিত পানির সংস্পর্শে এসে চর্মরোগ ও পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন লোকজন। আবর্জনার কারণে এটি মশার প্রজনন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, সুরমা ১৫০ জন দখলদারের কবলে। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) সিলেটের তথ্যমতে, সিলেট বিভাগের ১৭টি নদ-নদীতে এক হাজার ১৯৪ জন দখলদার রয়েছে। এর মধ্যে শুধু সুরমার সিলেট অংশেই দখলদার ১৫১ জন; সুনামগঞ্জ অংশে আরও ৩২ জন।
বেলার তথ্যমতে, সিলেট বিভাগে ৩১টিরও বেশি নদী এখন সংকটাপন্ন। এর মধ্যে সিলেট জেলায় ৯টি, সুনামগঞ্জে ১১টি, মৌলভীবাজারে পাঁচটি এবং হবিগঞ্জে ছয়টি সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে।
সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ বলেন, নদী খননের জন্য একটি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। পরিবেশদূষণ দেখার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা লে. কর্নেল (অব.) মো. একলিম আবেদীন বলেন, ‘আমরা সচেতন না হলে অভিযান দিয়ে দূষণ রোধ করা যাবে না।’ সূত্র: সমকাল
