সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আমাদের প্রবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স দীর্ঘদিন ধরে লন্ডন ও ম্যানচেস্টারের সঙ্গে সিলেটের সরাসরি বিমান যোগাযোগ পরিচালনা করছে, যা সিলেটি প্রবাসীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সেবা।
বিদেশি এয়ারলাইন্সের ক্ষেত্রেও সিলেটের সম্ভাবনা নতুন নয়। ২০১৫ সালে Flydubai সিলেট থেকে তাদের ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করেছিল, তবে ২০১৮ সালে সেই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ বিরতির পর আবারও একটি সুখবর এসেছে—ওমানভিত্তিক SalamAir নতুন করে সিলেট থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু করেছে। এটি নিঃসন্দেহে সিলেটবাসী এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত সিলেটি প্রবাসীদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের ও আশাব্যঞ্জক খবর।
আমাদের আশা, ভবিষ্যতে আরও আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স সিলেট থেকে ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ বিবেচনা করবে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ এয়ারলাইন্সগুলো সিলেট থেকে ফ্লাইট চালু করলে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত সিলেটি প্রবাসীদের যাতায়াত আরও সহজ ও সুবিধাজনক হবে।
এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ বৃদ্ধি পেলে সিলেট অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমও উপকৃত হতে পারে। বিশ্বের সঙ্গে সিলেটের যোগাযোগ যত বাড়বে, আমাদের দেশের অর্থনীতির জন্যও তত নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
SalamAir-এর নতুন যাত্রা আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। আশা করি, ভবিষ্যতে আরও আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট পরিচালনা করবে। এতে যেমন প্রবাসীদের যাতায়াত আরও সহজ হবে, তেমনি সিলেট অঞ্চল ও আমাদের দেশের অর্থনীতিও উপকৃত হবে।
সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সম্ভাবনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক এয়ার কার্গো সেবা চালু করা। যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি বিমানবন্দরটিকে যদি আধুনিক কার্গো হাব হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে সিলেটের ব্যবসা-বাণিজ্য ও রপ্তানি খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।
সিলেটের অর্থনীতির সঙ্গে চা, কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য, হস্তশিল্প, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের সম্পর্ক রয়েছে। এসব পণ্যের একটি অংশ দ্রুত ও নিরাপদে বিদেশের বাজারে পাঠানোর জন্য আকাশপথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে চা, তাজা কৃষিপণ্য, ফলমূল, শাকসবজি, মাছ, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও অন্যান্য দ্রুত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে—এমন পণ্য দ্রুততম সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দিতে এয়ার কার্গোর বিকল্প অনেক ক্ষেত্রে সীমিত।
বর্তমানে সিলেটের কোনো উদ্যোক্তা বিদেশে দ্রুত পণ্য পাঠাতে চাইলে তাকে ঢাকাকেন্দ্রিক কার্গো ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়—এতে পরিবহন ব্যয়, সময় এবং পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সরাসরি কার্গো পরিবহনের ব্যবস্থা হলে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জন্য এই নির্ভরতা অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।
বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বিপুলসংখ্যক সিলেটি প্রবাসীর বাজারকে সামনে রেখে সিলেট থেকে সরাসরি কার্গো পরিবহনের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। যুক্তরাজ্যের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারেও সিলেটের উৎপাদিত ও প্রক্রিয়াজাত পণ্যের চাহিদা তৈরি করা সম্ভব।
তবে শুধু কার্গো বিমান চালু করলেই হবে না; প্রয়োজন একটি পূর্ণাঙ্গ আধুনিক কার্গো অবকাঠামো। বিমানবন্দরে পৃথক কার্গো টার্মিনাল, আধুনিক ওয়্যারহাউস, কোল্ড স্টোরেজ, দ্রুত পণ্য খালাস ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা, কাস্টমস ও কোয়ারেন্টাইন সুবিধা, স্ক্যানিং, নিরাপত্তা এবং দক্ষ গ্রাউন্ড-হ্যান্ডলিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে আমদানি-রপ্তানির কাগজপত্র ও কাস্টমস প্রক্রিয়াকে যতটা সম্ভব দ্রুত ও ব্যবসাবান্ধব করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে ‘কোল্ড চেইন’ ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাজা মাছ, শাকসবজি, ফলমূল, ফুল কিংবা অন্যান্য পচনশীল পণ্য নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ ও পরিবহন করা না গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন। তাই ওসমানী বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক মানের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত কার্গো সুবিধা তৈরি করা গেলে সিলেটের কৃষি ও খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
এ ক্ষেত্রে প্রবাসী উদ্যোক্তাদেরও সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। যুক্তরাজ্য, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আমেরিকায় বসবাসরত সিলেটি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে স্থানীয় উৎপাদকদের সরাসরি সংযোগ তৈরি করে ‘সিলেট থেকে বিশ্ববাজারে’ একটি কার্যকর রপ্তানি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা সম্ভব।
পূর্ণাঙ্গ কার্গো ব্যবস্থা চালু হলে এর সুফল শুধু বড় ব্যবসায়ীরাই পাবেন না। গ্রামের কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, চা উৎপাদক, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান, হস্তশিল্প উদ্যোক্তা—সবার জন্য নতুন বাজার তৈরি হতে পারে। উৎপাদক পর্যায়ে ভালো দাম পাওয়ার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে।
এর পাশাপাশি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে লজিস্টিকস, কুরিয়ার, ওয়্যারহাউস, প্যাকেজিং, পরিবহন ও রপ্তানিসহ একটি নতুন অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম গড়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ কার্গো চালু শুধু পণ্য পরিবহনের একটি ব্যবস্থা হবে না; এটি সিলেটের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও বহুমুখী করার একটি বড় হাতিয়ার হতে পারে।
তাই সিলেটের আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় যাত্রীবাহী ফ্লাইটের পাশাপাশি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক কার্গো অপারেশনকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। বিদেশি এয়ারলাইন্সকে যাত্রীবাহী ফ্লাইটের পাশাপাশি কার্গো ফ্লাইট পরিচালনায় উৎসাহিত করা এবং সম্ভাব্য রপ্তানি পণ্যের বাজার তৈরি করতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
সিলেট শুধু প্রবাসীদের যাতায়াতের গন্তব্য নয়; সিলেটকে বিশ্বের বাজারে পণ্য পাঠানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবেও গড়ে তোলা সম্ভব। ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পূর্ণাঙ্গ কার্গো ব্যবস্থা চালু হলে সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেওয়ার পথ অনেকটাই প্রশস্ত হবে।
সিলেটের সঙ্গে বিশ্বের যোগাযোগ আরও বাড়ুক, প্রবাসীদের যাতায়াত সহজ হোক এবং আমাদের দেশের অর্থনীতি আরও সমৃদ্ধ হোক—এই প্রত্যাশা সবার।