ঈদকে সামনে রেখে সিলেট সীমান্তে তৎপরতা শুরু করেছে চোরাচাকারবারিরা। বিশেষ করে ঈদের কাপড়, মসলা ও প্রসাধনসামগ্রী চোরাই পথে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে তারা। সীমান্তে কড়াকড়ি থাকায় অতীতের মতো এবার চোরাচালান সহজ হচ্ছে না তাদের জন্য। তারপরও বিজিবি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রবেশ করছে ভারতীয় ঈদের পণ্য। জানা গেছে, এসব পণ্য শুধু সিলেট নয়, দেশের বিভিন্ন বাজারেও যাচ্ছে। ইতোমধ্যে একাধিক চালানও উদ্ধার করেছে বিজিবি ও পুলিশ। চোরাচালানে জড়িত একাধিক ব্যক্তি সমকালকে জানিয়েছেন, পুরোনো ব্যবসায়ীরাই চোরাই পথে ভারতীয় পণ্য আমদানির সঙ্গে জড়িত। লাইন নিয়ন্ত্রণ (সীমান্ত পার করা ও পণ্যবাহী ট্রাক থেকে টাকা আদায়কারী) করছেন পুরাতন ও নতুনরা মিলেমিশে। সীমান্ত ও বিভিন্ন সড়কে চেকপোস্ট ফাঁকি দিয়ে প্রায় প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার পণ্য সিলেটের বাজারসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে যাচ্ছে–জানান লাইন নিয়ন্ত্রণকারীরা।
সিলেট সীমান্তের প্রায় ৮০টি স্থান দিয়ে ভারতীয় বিভিন্ন ধরনের পণ্য চোরাচালান হয়ে আসছে। এর মধ্যে ৫০টি স্থানে বেশি হয়। ঈদকে সামনে রেখে এসব স্থান দিয়ে প্রায়ই চোরাচালান পণ্য পার করার চেষ্টা করছেন ব্যবসায়ীরা। সীমান্তে বিজিবির অবস্থান জোরদার ও রাস্তায় পুলিশের টহলের কারণে চোরাচালানের পণ্য নিয়ে আসতে সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন তারা।
এক সময় সিলেট সীমান্তের আশি ভাগ চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ হতো জৈন্তাপুরের হরিপুর বাজার থেকে। গত বছরের এপ্রিলে সেনাবাহিনীর সঙ্গে অপ্রীতিকর ঘটনার পর বাজারের পরিস্থিতি অনেক পাল্টে যায়। যদিও ধীরে ধীরে পরে আবার চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে জড়িয়ে পড়েন অনেক ব্যবসায়ী।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য মতে, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কোম্পানীগঞ্জ, কানাইঘাট ও জকিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে সারা বছরই বিভিন্ন ধরনের পণ্য চোরাচালান হয়। এরমধ্যে মাদক ছাড়াও রয়েছে সিগারেট, গরু-মহিষ, চা পাতা, ওষুধসামগ্রী, প্রসাধনী, শাড়ি, লেহেঙ্গা, মোবাইল হ্যান্ডসেট, জিরা, কম্বল ইত্যাদি। এমনকি মাঝেমধ্যে বিস্ফোরকও আসে। গত দুই মাসে চারটি বিস্ফোরকের চালান উদ্ধার করা হয়।
রোজার মাস শুরুর পর ফলমূল, মসলা, ট্যাং ও মসলা জাতীয় পণ্য চোরাচালানে বেশি নজর দেন ব্যবসায়ীরা। গত কয়েকদিন ধরে ঈদকে সামনে রেখে পোশাকের দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে। ভারতীয় বিভিন্ন ধরেন শাড়ি, ওড়না, থ্রি-পিস, ড্রেস, পাঞ্জাবি এবং প্রসাধনসামগ্রী চোরাই পথে নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যে একাধিক চালান সিলেট নগরীসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে নেওয়া হয়েছে।
একাধিক ব্যবসায়ী জানান, বাজারে ভারতীয় পোশাকের কদর বেশি হওয়ায় অনেকে চোরাচালানের মাধ্যমে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন। তবে অধিকাংশ ব্যবসায়ী বৈধ পথে পণ্য ক্রয় করেন। নগরীর জিন্দাবাজারের মিলেনিয়াম শপিং সিটির ব্যবসায়ী রিপন সিংহ জানান, ঈদের কেনাকাটায় ভারতীয় ও পাকিস্তানের পোশাকের চাহিদা রয়েছে। তিনি ঈদ উপলক্ষে সব ধরনের কাপড় ও পোশাক দোকানে তুলেছেন বলে জানান। চোরাচালানের পণ্য কারা নিয়ে আসে সে বিষয়ে তিনি জানেন না। মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি দোকানে ভারতীয় পণ্য রয়েছে। কেউ নিয়ে এসেছেন বৈধ পথে, কেউবা চোরাই পথে।
সূত্রের তথ্য মতে, সবচেয়ে বেশি চোরাচালান হয় গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর উপজেলা সীমান্ত এলাকায়। জৈন্তাপুরের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকার মধ্যে আলুবাগান, মোকামপুঞ্জি, শ্রীপুর, মিনাটিলা, ডিবির হাওর, আসামপাড়া রিভার পিলার, ঘিলাতৈল, টিপরাখলা, করিমটিলা, ভিরতগোল, জালিয়াখলা, নয়াবাড়ি, নুরুলের টিলা, জঙ্গীবিল, বাঘছড়া, রাবার বাগানসহ কয়েকটি এলাকা দিয়ে চোরাচালান হয়।
এসব এলাকায় চোরাচালান থেকে বিভিন্ন বাহিনীর নাম ব্যবহার করে টাকা আদায় করা হয়। সেখানে চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করেন রুবেল আহমদ, লিটন মিয়া, মাঘাই পাত্র, আব্দুস ছাত্তার, আবদুল জব্বার, মিজানুর, রুবেল, শামীম আহমদ, মানিক মিয়া, ফরিদ, আব্দুল, হানিফ, করিম, সামছু, রহিম উদ্দিন, তাঁর ভাই তাজ উদ্দিন প্রমুখ।
অভিযোগ বিষয়ে মোকামবাড়ির বাসিন্দা রুবেল আহমদ কথা বলতে চাননি। রহিম উদ্দিন ও ফরিদ আলম জানান, তারা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত নন। একইভাবে গোয়াইনঘাট সীমান্তের তামাবিল, আম স্বপ্নপুর, প্রতাপপুর, সংগ্রাম, জাফলং জিরো পয়েন্ট, বিছনাকান্দি, পান্থুমাই, হাদারপাড়সহ কয়েকটি এলাকায় ভারতীয় পণ্য চোরাচালান হয়। এছাড়া কানাইঘাট ও কোম্পানীগঞ্জের একাধিক স্থান দিয়েও পণ্য আসে। এ তিন উপজেলার লাইন নিয়ন্ত্রণে আরও অর্ধশত লোক জড়িত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কারবারি জানিয়েছেন, নতুন সরকার আসার পর সীমান্তে কড়াকড়ি থাকায় ইচ্ছামতো ভারত থেকে পণ্য নিয়ে আসা যাচ্ছে না। লাইম্যানরা সোর্সদের সহায়তায় মাঝেমধ্যে চোরাচালানের পণ্য খালাসে সহায়তা করছে।
এদিকে গত এক সপ্তাহে পৃথক অভিযান করেছে বিজিবি ও পুলিশ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বিছনাকান্দি, প্রতাপপুর, দমদমিয়া, পাথরকোয়ারি, শ্রীপুর সীমান্ত থেকে ৪৮ বিজিবি ১ কোটি ১৭ লাখ টাকার ভারতীয় পণ্যদ্রব্য উদ্ধার করে। এরমধ্যে জিরা, কমলা, মাল্টা, আঙ্গুর, পেঁয়াজ ও অলিভ অয়েল ছিল। এর আগের দিন মহানগর পুলিশের এয়ারপোর্ট থানা পুলিশ ২৭০ কেজি ভারতীয় জিরা উদ্ধার করে।
বুধবার গোয়াইনঘাট থানা পুলিশ ২ হাজার পিস পন্ডস ফেসওয়াশসহ অন্যান্য পণ্য জব্দ করেছে বলে জানিয়েছেন থানার ওসি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান।
৪৮ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নাজমুল হক জানিয়েছেন, ঈদকে সামনে রেখে সীমান্তে বিশেষ নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। চোরাচালানরোধে বিজিবি কাজ করছে। আগের তুলনায় এখন চোরাচালান কম হচ্ছে। সূত্র: সমকাল
