সিলেট নগরের একটি বাসায় স্বামী-স্ত্রী ও গৃহকর্মীকে হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে। সম্পত্তি নিয়ে বিরোধে ভাড়াটে লোক দিয়ে তাদের হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি স্বজনদের।
শুক্রবার রাতে নিহত দম্পতির মেয়ে সেলিনা সুলতানা বাদী হয়ে অভিযোগ করেন বলে জানিয়েছেন সিলেট কোতোয়ালি থানার ওসি খান মো. মাঈনুল জাকির।
অভিযোগে সেলিনা সুলতানা সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ, মামলা প্রত্যাহারে হুমকি এবং সবশেষ পেশাদার ভাড়াটে খুনি দিয়ে তার বাবা-মা ও গৃহকর্মীকে হত্যা করা হয় বলে দাবি করেছেন।
বাদীর অভিযোগ, “নগরের রায়নগর এলাকার সম্পত্তি ও রিকাবিবাজার এলাকায় লুসাই গির্জা সমিতির ভূমির মালিকানা নিয়ে তার বাবা আব্দুস সাত্তারের সঙ্গে অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলামের দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ বিরোধের জেরে একাধিক মামলা আদালতে বিচারাধীন।
“বিভিন্ন সময় মামলা প্রত্যাহারের জন্য সেলিনার বাবা ও তাকে হুমকি দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারি বিকালে সিরাজুল ইসলামসহ কয়েকজন তাদের পৈতৃক বাসায় গিয়ে মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেন। এ সময় তর্ক-বিতর্কের এক পর্যায়ে তাদের দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।”
“পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী অত্যন্ত পেশাদার অজ্ঞাত ভাড়াটিয়া খুনিদের মাধ্যমে আমার বৃদ্ধ বাবা সাত্তার, মা সুরাইয়া বেগম এবং গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমকে হত্যা করে বাসা থেকে মামলা ও ভূমি সংক্রান্ত সকল কাগজপত্র, জিডি কপি এবং দলিলাদি নিয়ে যায়।”
থানায় অভিযোগ দেওয়ার পর সেলিনা সুলতানা সাংবাদিকদের বলেন, “আমি আর আমার ভাই আসছি। আমাদের মা-বাবা যেভাবে খুন হয়েছেন, পরবর্তীতে যেন আর কোনো মা-বাবার এ রকম না হয়। ছেলের কাঁধে যেন আর কোনো মা-বাবার লাশ না ওঠে।”
ঘটনার দুই দিন পর এদিন সকালে যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফেরেন আব্দুস সাত্তারের ছেলে আরিফ ইফতেখার ও মেয়ে সেলিনা সুলতানা। এরপর তারা রাতে থানায় গিয়ে অভিযোগ করেন।
বাসার গৃহকর্মীর প্রেমের বিষয় নিয়ে সেলিনা বলেন, “কাজের মেয়েটাকে বাঁচাতে গিয়ে আমার মা-মারা গেছেন। একটা বাচ্চা মেয়ে, সে খুব ভালো ছিল, মেয়েটার কাছে কোনো মোবাইল ছিল না। মেয়েটা আমাদের কাছে আমানত ছিল। কেইসটা ঘুরানোর জন্য মেয়েটাকে দেখানো হচ্ছে। এটা সত্য কোনো ঘটনা না।”
ঘটনার পরদিন সন্ধ্যায় দম্পতিসহ তিনজনকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত বাবুল মিয়াকে (৪০) ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে তোলা হয়। পরে বিচারকের নির্দেশে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
গ্রেপ্তার বাবুলের বিষয়ে যুক্তরাজ্য প্রবাসী আরিফ ইফতেখার বলেন, “আমরা ওয়েট করি, দেখি রিমান্ডে নেওয়া হোক, তদন্ত হোক।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সিরাজুল ইসলাম বলেন, “বিষয়টি আপনারা সবাই জানেন, তিন দিন ধরে সিলেটে আলোচনা হচ্ছে। তদন্ত হোক। এ বিষয়ে পরে কথা বলব আপনার সঙ্গে।”
শুক্রবার বাদ আসর নগরীর ঐতিহাসিক শাহী ঈদগাহ ময়দানে নিহত দম্পতির জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় ইমামতি করেন হজরত শাহজালাল (রহ.) দরগাহ মসজিদের ইমাম ও খতিব হাফিজ মাওলানা আসজাদ আহমদ।
জানাজার আগে দম্পতির ছেলে আরিফ ইফতেখার ও সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন।
বক্তব্যে আরিফ ইফতেখার তার বাবা-মায়ের কারও সঙ্গে কোনো ভুল হয়ে থাকলে তা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ করেন। কোনো পাওনা থাকলে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করারও অনুরোধ জানান তিনি।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গভীর নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, শান্তির নগরী হিসেবে পরিচিত সিলেটে অতীতে এ ধরনের নৃশংস ঘটনা খুব কমই ঘটেছে।
তিনি বলেন, “খবর পাওয়ার পর আমি সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে গিয়েছি। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারে পুলিশকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছি। অল্প সময়ের মধ্যে এক আসামিকে গ্রেপ্তার করায় পুলিশকে ধন্যবাদ জানাই।”
তবে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত আছে কি-না, তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে পুলিশের প্রতি আহ্বান জানান সিসিক প্রশাসক। সেইসঙ্গে দ্রুতবিচার আদালতের মাধ্যমে মামলাটি নিষ্পত্তি করে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের ন্যায়বিচার নিশ্চিতের দাবি জানান।
বুধবার সকালে রায়নগর এলাকায় মিতালী ১১১ নম্বর বাসার মালিক আব্দুস সাত্তার (৯০), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) ও তাদের কাজের মেয়ে তাহমিনার (১৮) গলা কাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার সিলেট চেম্বার অব কমার্সের সদস্য ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি রায়নগরে নিজের বাসায়ই থাকতেন। এই দম্পতির চার সন্তারে মধ্যে দুই সন্তান লন্ডনে ও দুই সন্তান আমেরিকায় থাকেন।
পুলিশ জানায়, ঘটনার দিন বেলা ৩টার দিকে রায়নগর রাজবাড়ি এলাকার আক্তার মিয়ার কলোনির বাসিন্দা ও প্রয়াত নূর মিয়া ছেলে বাবুল মিয়াকে আটক করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি পুলিশের কাছে হত্যাকাণ্ডের ঘটনার কথা স্বীকার করেন। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরি উদ্ধার করে পুলিশ।
