হজ মুমিন জীবনের পরম আকাক্সিক্ষত ইবাদত এবং এটি ইসলামের মৌলিক পাঁচটি মূল স্তম্ভের একটি। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি, ভালোবাসা ও পুরস্কারে কৃতার্থ হওয়া হজ পালনের লক্ষ্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে অনেকে হজে যান, আবার আগের মতোই ফিরে আসেন। বাইতুল্লাহ জিয়ারত তাদের জীবন ও আচারে তেমন প্রভাব ফেলে না। এর পেছনে নানা কারণ থাকলেও অন্যতম হলো যথাযথ পূর্বপ্রস্তুতির অভাব।
হজ এমন এক ইবাদত, যা পালনের জন্য পর্যাপ্ত পড়াশোনা, শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি অপরিহার্য। কারণ এই ইবাদত সময়, পরিবেশ ও আত্মিক অনুভূতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। অন্তর আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধির মাধ্যমে কলুষমুক্ত না হলে হজের প্রকৃত স্বাদ উপলব্ধি করা যায় না। আবার শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি না থাকলে এর কার্যাবলি যথাযথভাবে সম্পন্ন করাও কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ হজের সব কার্যাবলি নির্দিষ্ট দিন, নির্দিষ্ট স্থান এবং বিশাল জনসমাগমের মধ্যে আদায় করতে হয়। যা বেশ চ্যালেঞ্জপূর্ণ। যে ব্যক্তি পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে যায়, সে সহজে সম্পন্ন করতে পারে, আর যে প্রস্তুত নয়, সে বিভ্রান্ত ও বিপর্যস্ত হয়। এ কারণেই হজের বিধান ও পদ্ধতি সম্পর্কে পূর্বজ্ঞান ও প্রস্তুতি অত্যন্ত জরুরি। রসুল (সা.) হজ পালন করেছেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে এই বলে হজের বিধান শিখতে উদ্বুদ্ধ করেছেন, ‘তোমরা আমার থেকে হজের বিধিবিধান শিখে নাও’ (নাসায়ি)।
সুতরাং হজের এই পুণ্যময় সফরকে গ্রহণযোগ্য ও সার্থক করার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি রাখা জরুরি।
এক. নিয়তের বিশুদ্ধতা : সব ইবাদত কবুলের পূর্বশর্ত হলো ইখলাস তথা নিয়তের বিশুদ্ধতা। বিশেষত হজের মতো ইবাদতে রিয়া-লৌকিকতার আশঙ্কা বেশি থাকে। অনেকেই হজ পালন করেন আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে সামাজিক মর্যাদা ও স্তূতি পাওয়ার জন্য। যাতে মানুষ হাজি বলে সম্বোধন করে। কারও এমন নিয়ত থাকলে তার হজ কবুল হবে না। রসুল (সা.) বলেছেন, ‘সব আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল; মানুষ যা নিয়ত করবে, তা-ই পাবে’ (বুখারি)। সুতরাং কেউ যদি সম্মান পাওয়ার আশা করে সে তা পাবে বটে, কিন্তু আল্লাহর কাছে কোনো প্রতিদান পাবে না।
দুই. হজের মাসায়েল ও নিয়মাবলি শেখা : সঠিক জ্ঞান ছাড়া কোনো ইবাদতই পূর্ণাঙ্গরূপে পালন করা যায় না। তবে হজের ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রয়োজন। হজের অনেক সূক্ষ্ম নিয়ম ও বিধিবিধান রয়েছে। ইহরাম বাঁধা থেকে শুরু করে তাওয়াফ, সাঈ, আরাফা ও মিনায় অবস্থান-প্রতিটি ধাপের রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন আমল ও দোয়া। তাই হজে যাওয়ার আগে নির্ভরযোগ্য আলেমদের লেখা বই পড়া, লেকচার শোনা এবং হজের ওপর আয়োজিত প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া উচিত।
তিন. শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি : হজের ইবাদতগুলো মূলত শ্রমসাধ্য। সেখানে মাইলের পর মাইল হাঁটতে হয়। বিশেষ করে প্রচণ্ড গরম, রুক্ষ ও বৈরী আবহাওয়া এবং বিশাল জনসমুদ্রের মধ্যে সুস্থ থাকা এক বড় চ্যালেঞ্জ। তাই পূর্ব থেকেই পূর্ণ প্রস্তুত থাকা জরুরি।
চার. অর্থের উৎস বৈধ হওয়া : হজ কবুল হওয়ার পূর্বশর্ত হলো হালাল উপার্জন। হারাম টাকায় হজ করলে তা আল্লাহর কাছে গৃহীত হবে না। তা ছাড়া হজে যাওয়ার আগে নিজের সব দেনাপাওনা পরিশোধ করা এবং মানুষের কোনো হক নষ্ট করে থাকলে তা ফিরিয়ে দিয়ে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া উচিত। বিশেষ করে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে কোনো বিবাদ থাকলে তা মিটিয়ে সুন্দর মনে আল্লাহর পথে পা বাড়াতে হবে।
পাঁচ. ধৈর্য ও সহনশীলতার অভ্যাস : হজের সফর ধৈর্যের এক কঠিন পরীক্ষা। কোটি কোটি মানুষের ভিড়, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং নানাবিধ প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। এ সময়ে বিভিন্ন সমস্যা ও অন্যের আচরণে মেজাজ খিটখিটে হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু রসুল (সা.)-এর সুন্নাহ হলো, সব অবস্থায় সংযত ও শান্ত থাকা। হজের সফরে রাগ, ঝগড়া বা বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়া নিষিদ্ধ। তাই আগে থেকেই ছোটখাটো বিষয়ে ধৈর্য ধারণের অভ্যাস গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
ছয়. দোয়া করা : হজ একটি শ্রেষ্ঠতম নেয়ামত। আল্লাহর তওফিক ছাড়া কেউ এই পবিত্র ভূমিতে যাওয়ার সুযোগ পায় না। তাই হজের প্রতিটি মুহূর্তে দোয়া করা উচিত। বান্দা ও আল্লাহর মাঝে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলার এটি মোক্ষম সময়।
নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশে হজ করবে এবং পাপের কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকবে, সে ওই দিনের মতো নিষ্পাপ হয়ে ঘরে ফিরবে, যেদিন সে জন্মগ্রহণ করেছিল’ (বুখারি)। মহান আল্লাহ আমাদের যথাযথ প্রস্তুতির সঙ্গে হজ পালন করার তওফিক দিন।
জুমার মিম্বর থেকে গ্রন্থনা : নুরুল ইসলাম তানঈম