- Dainiksylhet.com - https://dainiksylhet.com -

সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তরে ইসলামের নির্দেশনা

ইসলামী শরিয়ত সম্পত্তির মালিকানা লাভের যেমন বিশেষ কিছু পদ্ধতি নির্ধারণ করে দিয়েছে, তেমনি সম্পত্তির মালিকানা অন্যের কাছে হস্তান্তরেরও কিছু নিয়ম বাতলে দিয়েছে। সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তরের কয়েকটি শরিয়তসম্মত পদ্ধতি তুলে ধরা হলো।

মালিকানা হস্তান্তরের পদ্ধতি ও প্রকার

বিনিময় ও সময়ের বিচারে মালিকানা হস্তান্তরকে কয়েক ভাগে ভাগ করা যায়। তুহফাতুল ফুকাহাতে বলা হয়েছে, ‘বিক্রয় বিনিময় গ্রহণের মাধ্যমে জীবদ্দশায় মূল সম্পত্তির মালিক বানানো। দান ও সদকা কোনো বিনিময় ছাড়া জীবিত অবস্থায় মূল সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তর করা। ধার দেওয়া হলো জীবিত অবস্থায় বিনিময় ছাড়া উপকারের মালিক বানানো।

অসিয়ত হলো মৃত্যুর পর কোনো বিনিময় ছাড়া সম্পদ ও উপকারের মালিক বানানো।’ (তুহফাতুল ফুকাহা : ৩/২৮৩) উল্লিখিত বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, মালিকানা হস্তান্তর মৌলিকভাবে দুই প্রকারে বিভক্ত—জীবিত অবস্থায় ও মৃত্যুর পর।

জীবিত অবস্থায় মালিকানা হস্তান্তরের পদ্ধতি

১. বিক্রয়: বিক্রি হলো মূল্য বা অন্য কোনো বিনিময়ের বিপরীতে কাউকে কোনো সম্পত্তির মালিক বানানো। শরিয়তে বেচাকেনা বৈধ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য ব্যবসা হালা করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৭৫)

ফকিহরা বিক্রয় শুদ্ধ হওয়ার সাতটি শর্ত নির্ধারণ করেছেন। তা হলো—

ক. ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের সন্তুষ্টি থাকা।

খ. ক্রেতা ও বিক্রেতা চুক্তিসম্পন্ন করার যোগ্য হওয়া; তথা স্বাধীন, সাবালক ও জ্ঞানসম্পন্ন হওয়া।

গ. পণ্য বৈধ হওয়া।

ঘ. পণ্য বিক্রেতার মালিকানাধীন হওয়া অথবা মালিকের পক্ষ থেকে বিক্রয়ের অনুমতিপ্রাপ্ত হওয়া।

ঙ. পণ্য সম্পর্কে (নাম, বৈশিষ্ট্য, গুণাবলি ও পরিমাণ) ক্রেতা-বিক্রেতা অবগত হওয়া।

চ. মূল্য নির্ধারিত হওয়া।

ছ. পণ্য হস্তান্তরযোগ্য হওয়া। (আল মাউসুয়াতুল ফিকহিয়্যা : ২/৩৮৭)

২. হেবা বা দান: হেবা হলো কোনো প্রকার বিনিময় ছাড়া জীবদ্দশায় কাউকে সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তর করা। হানাফি মাজহাব অনুসারে হেবা শুদ্ধ হওয়ার রোকন ও শর্তগুলো হচ্ছে—

ক. ইজাব ও কবুল তথা দাতার পক্ষ থেকে প্রস্তাব ও গ্রহীতার গ্রহণ।

খ. সম্পত্তির ওপর দাতার হস্তক্ষেপের বৈধ অধিকার থাকা।

গ. দাতা আর্থিক লেনদেনের যোগ্য হওয়া। অর্থাৎ সুস্থ জ্ঞানসম্পন্ন, সাবালক ও স্বাধীন হওয়া।

ঘ. দানকৃত সম্পত্তি অস্তিত্বে থাকা।

ঘ. দানকৃত সম্পত্তির আর্থিক মূল্য থাকতে হবে।

ঙ. দানকৃত সম্পত্তি ব্যক্তিমালিকানাধীন হবে এবং তা সবার জন্য উন্মুক্ত এমন জনসম্পত্তি হবে না।

চ. সম্পত্তি যৌথ মালিকানাধীন হবে না ও অবণ্টিত হবে না।

ছ. দানকৃত সম্পত্তি দানগ্রহীতার হস্তগত হওয়া। কবজ তথা দখল ও নিয়ন্ত্রণ ছাড়া হেবা সম্পন্ন হয় না। (আল ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু, পৃষ্ঠা-৩৮৭১)

৩. সদকা: সদকা বলা হয় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাউকে কিছু দান করা। হেবা ও সদকা উভয়টি দান হলেও উভয়ের মধ্যে মৌলিক কিছু পার্থক্য আছে। যেমন—সদকার উদ্দেশ্য সওয়াব লাভ, হেবার ক্ষেত্রে পরকালীন কল্যাণ কামনা আবশ্যক নয়; সদকা সাধারণত দরিদ্র ও অসহায় মানুষকে দেওয়া হয়, হেবা ধনী-গরিব সবাইকে দেওয়া যায়; শরিয়তের দৃষ্টিতে হেবা ঐচ্ছিক, তবে কোনো কোনো সদকা যেমন—জাকাত ও সদকাতুল ফিতর আবশ্যিক; সদকা ইবাদত, কিন্তু হেবা সব সময় ইবাদত নয়। সদকা শুদ্ধ হওয়ার কয়েকটি শর্ত হলো—

ক. নিয়ত শুদ্ধ হওয়া। সদকাকারী শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই সদকা করবে।

খ. সম্পত্তি বৈধ হওয়া এবং তা বৈধ উপায়ে অর্জিত হওয়া।

গ. হকদারকে দান করা, বিশেষত ফরজ জাকাত ও ওয়াজিব সদকাতুল ফিতর শুধু নির্ধারিত ব্যক্তিদেরই দেওয়া যাবে। (আল মাউসুয়াতুল ফিকহিয়্যাহ)

৪. ওয়াকফ: ওয়াকফ বলা হয় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এমন সম্পত্তির মালিকানা ত্যাগ করা, যার মূলটা অবশিষ্ট রেখে তা দ্বারা উপকৃত হওয়া সম্ভব। (আল মুগনি : ৬/৫)

ওয়াকফ শুদ্ধ হওয়ার শর্ত হলো—

ক. ওয়াকফকারী সম্পত্তির বৈধ মালিক হবে এবং তার মালিকানা নিরঙ্কুশ হবে।

খ. ওয়াকফকারী আর্থিক লেনদেনের যোগ্য হওয়া। তথা সাবালক, সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন ও স্বাধীন হওয়া।

গ. ওয়াকফকৃত সম্পত্তির আর্থিক মূল্য থাকা।

ঘ. ওয়াকফকৃত সম্পদ পরিমাণ জ্ঞাত ও নির্দিষ্ট হওয়া এবং ওয়াকফকৃত সম্পদ এজমালি না হওয়া।

ঙ. ওয়াকফকৃত সম্পদ দাতার মালিকানাধীন থাকা।

চ. ওয়াকফকৃত সম্পদে অন্যের অধিকার সম্পৃক্ত না থাকা।

ছ. ওয়াকফকৃত সম্পত্তির মাধ্যমে উরফ তথা প্রচলন অনুযায়ী উপকার গ্রহণে সক্ষম হওয়া।

জ. ওয়াকফকৃত বস্তুতে বৈধ উপকার থাকা। (আল মাউসুয়াতুল ফিকহিয়্যাহ : ২/৪৯৬)

৫. মুআওয়াজা: মুআওয়াজা হলো কোনো পণ্য বা সম্পত্তির বিনিময়ে পণ্য বা সম্পত্তি লেনদেন করা। শরিয়তে মুআওয়াজা মালিকানা হস্তান্তরের একটি বৈধ পদ্ধতি। মুআওয়াজা এক প্রকারের বেচাকেনা। তাই যেসব শর্তে বিক্রয় চুক্তি বৈধ হয়, সেসব শর্তে মুআওয়াজা চুক্তিও বৈধ হয়। (আল মাউসুয়াতুল ফিকহিয়্যাহ : ৩৮/১৮৭)

৬. সুলাহ: সুলাহ বলা হয় বিবদমান দুই পক্ষের ভেতর এমন চুক্তি সম্পন্ন করা, যার মাধ্যমে বিবাদ নিষ্পত্তি হয়। সুলাহ চুক্তির মাধ্যমে ব্যক্তি সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তর করতে পারে। সুলাহ চুক্তি বৈধ হওয়ার শর্ত হলো—

ক. সুলাহকারী ব্যক্তি আর্থিক লেনদেনের যোগ্য হওয়া। তথা সাবালক, সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন ও স্বাধীন হওয়া।

খ. যে বস্তু বা সম্পত্তির বিনিময়ে সুলাহ হচ্ছে শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ ও মূল্যমান হওয়া।

গ. নিজের মালিকানাধীন জিনিসের বিনিময়ে সুলাহ করা।

ঘ. যে সম্পত্তির বিনিময়ে সুলাহ হচ্ছে তা পরিমাণ নির্দিষ্ট ও স্পষ্ট হওয়া।

ঙ. সুলাহের বিষয়ে সুলাহকারীদের অধিকার সুপ্রাণিত হওয়া।

চ. যে বিষয়ে সুলাহ হচ্ছে তা বান্দার অধিকারসংক্রান্ত হওয়া, আল্লাহর অধিকারসংক্রান্ত না হওয়া। (বাদায়িউস সানায়ি : ৬/৪০; আল মুগনি : ৪/৪৮২)

মৃত্যুর পর মালিকানা হস্তান্তরের উপায়

দুটি উপায়ে মৃত্যুর পর সম্পত্তির মালিকানা অন্যের কাছে হস্তান্তরিত হয়। তা হলো—

১. অসিয়ত: শরিয়তের পরিভাষায় অসিয়ত হলো একজন ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে কোনো সম্পত্তি বা ঋণ অথবা উপকারের মালিক বানানো, এই শর্তে যে অসিয়তকারীর মৃত্যুর পর মুসালাহু (যার জন্য অসিয়ত করা হয়েছে) তার মালিক হবে। নিয়ম অনুসারে একজন ব্যক্তি তার সম্পত্তির সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ পরিমাণ ওয়ারিশ নয় এমন ব্যক্তির জন্য অসিয়ত করতে পারে। অসিয়ত শুদ্ধ হওয়ার শর্তগুলো হচ্ছে—

ক. ইজাব ও কবুল পাওয়া যাওয়া অর্থাৎ দাতা দানের প্রস্তাব করবে এবং গ্রহীতা তা গ্রহণ করবে।

খ. অসিয়তকারী আর্থিক লেনদেনের যোগ্য হওয়া। তথা সাবালক, সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন ও স্বাধীন হওয়া।

গ. অসিয়তকারীর পূর্ণ সন্তুষ্টি থাকতে হবে।

ঘ. যার জন্য অসিয়ত করা হচ্ছে সে অস্তিত্বে থাকা এবং জ্ঞাত হওয়া।

ঙ. যার জন্য অসিয়ত করা হচ্ছে সে মালিকানা লাভের যোগ্য হওয়া।

চ. যার জন্য অসিয়ত করা হচ্ছে সে অসিয়তকারীকে হত্যা না করা।

ছ. যার জন্য অসিয়ত করা হচ্ছে সে অসিয়তকারীর ওয়ারিশ না হওয়া।

ঙ. যে সম্পত্তির ব্যাপারে অসিয়ত করা হচ্ছে, যা শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পদ ও মূল্যবান হওয়া।

জ. যে সম্পত্তির ব্যাপারে অসিয়ত করা হচ্ছে মালিকানাধীন হওয়ার যোগ্য হওয়া এবং তা অসিয়তের সময় অসিয়তকারীর মালিকানাধীন হওয়া। (আল মাউসুয়াতুল ফিকহিয়্যা : ৪৩/২৮১-২৮৩)

২. উত্তরাধিকার: রক্ত ও আত্মীয়তার সম্পর্কের ভিত্তিতে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তির অধিকারী হওয়া। উত্তরাধিকারের বিধান স্বয়ং আল্লাহ কোরআনে বর্ণনা করেছেন। ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে উত্তরাধিকার সম্পত্তি লাভের কয়েকটি শর্ত আছে। তা হলো—

১. মুরিস তথা যার সম্পত্তির মালিক হবে তার মৃত্যু প্রমাণিত হওয়া।

২. মুরিসের মৃত্যুর সময় ওয়ারিশ জীবিত থাকা, মুরিসের আগে ওয়ারিশ মারা না যাওয়া।

৩. মৃত ব্যক্তির সঙ্গে ওয়ারিশের সম্পর্ক তথা উত্তরাধিকার লাভের কারণ সুপ্রাণিত হওয়া।

৪. দাস না হওয়া। দাস মুরিস বা ওয়ারিশ কোনোটাই হতে পারে না।

৫. ওয়ারিশ মুরিসকে হত্যা না করা।

৫. ধর্ম ভিন্ন না হওয়া। মুসলমান কাফিরের এবং কাফির মুসলমানের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতে পারে না। (আল ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু, পৃষ্ঠা-৭৭০৭)

হে আল্লাহ! আমাদের দ্বিনি জ্ঞান দান করুন। আমিন।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন