চিঠি পাঠাতে সাধারণত ডাকঘর কিংবা রাস্তার পাশের ডাকবাক্সে যেতে হয়। কিন্তু জাপানে এমন একটি ডাকবাক্স রয়েছে, যেখানে চিঠি ফেলতে হলে নামতে হয় সমুদ্রের তলদেশে। দেশটির ওয়াকায়ামা প্রদেশের সুসামি উপসাগরে পানির প্রায় ১০ মিটার (৩৩ ফুট) নিচে বসানো এই ডাকবাক্সে পোস্টকার্ড পাঠাতে যান স্কুবা ডাইভাররা।
১৯৯৯ সালে পর্যটক আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে চালু হওয়া এই ব্যতিক্রমী ডাকব্যবস্থা এখন আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত। ২০১৮ সাল নাগাদ এই ডাকবাক্স দিয়ে প্রায় ৩৮ হাজার পানিরোধী পোস্টকার্ড পাঠানো হয়েছিল। ডাকবাক্সটি শুধু পর্যটকদের আকর্ষণই নয়, জাপানের নিয়মিত ডাকব্যবস্থারও অংশ। এখানে জমা দেওয়া পোস্টকার্ড সংগ্রহ করে স্থানীয় ডাকঘরের মাধ্যমে গন্তব্যে পাঠানো হয়।
জাপানের কিই উপদ্বীপের ছোট মাছধরা জনপদ সুসামিতে নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে পর্যটক আকর্ষণের নতুন উপায় খুঁজছিলেন স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। তখন এলাকার ডাকঘরপ্রধান তোশিহিকো মাতসুমোতো সমুদ্রের তলদেশে একটি কার্যকর ডাকবাক্স স্থাপনের প্রস্তাব দেন। প্রায় ৪০ বছর ডাক বিভাগে কাজ করা মাতসুমোতোর ধারণা ছিল, পানির নিচ থেকে চিঠি পাঠানোর সুযোগ তৈরি হলে ডুবুরি ও পর্যটকেরা এলাকাটিতে আসতে আগ্রহী হবেন।
১৯৯৯ সালে স্থানীয় একটি ডাইভিং প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় সুসামি উপসাগরের তলদেশে লাল রঙের ঢালাই লোহার ডাকবাক্সটি স্থাপন করা হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ মিটার গভীরে থাকা বাক্সটি জাপানের ডাকব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। ২০০২ সালে এটি বিশ্বের সবচেয়ে গভীরে অবস্থিত ডাকবাক্স হিসেবে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে স্বীকৃতি পায়।
এই ডাকবাক্সে সাধারণ কাগজের পোস্টকার্ড ব্যবহার করা যায় না। পানিতে কাগজ নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকায় ডুবুরিদের বিশেষ পানিরোধী প্লাস্টিকের পোস্টকার্ড ব্যবহার করতে হয়। স্থানীয় ডাইভিং দোকান থেকে পোস্টকার্ড ও তেলভিত্তিক মার্কার সংগ্রহ করে ডুব দেওয়ার আগেই বার্তা লিখে নেন তাঁরা। এরপর সমুদ্রের তলদেশে নেমে ডাকবাক্সে পোস্টকার্ডটি রেখে আসেন।
ডাকবাক্সটি প্রতিদিন খোলা হয় না; অনুমোদিত কর্মীরা বিশেষ চাবি দিয়ে এটি খুলে চিঠি সংগ্রহ করেন। স্থানীয় ডাইভিং প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা নিয়মিত ডুব দিয়ে পোস্টকার্ড তুলে আনেন এবং সুসামি ডাকঘরে পৌঁছে দেন। সেখান থেকে অন্য চিঠির মতোই নির্দিষ্ট ঠিকানায় পাঠানো হয় সেগুলো। সমুদ্রের নোনা পানিতে লোহার বাক্সে মরিচা ধরে। এ কারণে ডাকবাক্সটি নিয়মিত মেরামত ও রং করতে হয়। দুটি বাক্স পর্যায়ক্রমে ব্যবহার করে একটিকে মেরামতের জন্য তুলে নেওয়া হয়, যাতে অন্যটি দিয়ে ডাক সংগ্রহের কাজ চলতে পারে।
প্রথম দিকে স্থানীয় পর্যটন উৎসবকে কেন্দ্র করে চালু হলেও ধীরে ধীরে পানির নিচের এই ডাকবাক্সের কথা ছড়িয়ে পড়ে ডুবুরি ও ভ্রমণপিপাসু মানুষের মধ্যে। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে স্বীকৃতি পাওয়ার পর সুসামি উপসাগর বিশেষ আকর্ষণে পরিণত হয়। অনেক পর্যটক শুধু সমুদ্রের তলদেশ থেকে পোস্টকার্ড পাঠানোর অভিজ্ঞতা নিতে সেখানে যান।
২০১৮ সালে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্রে জানানো হয়, ডাকবাক্সটি স্থাপনের পর থেকে প্রায় ৩৮ হাজার পানিরোধী পোস্টকার্ড পাঠানো হয়েছে। স্থানীয়ভাবে তৈরি এই আকর্ষণ প্রচারের বড় কোনো উদ্যোগ ছাড়াই পরিচিতি পেয়েছে মূলত মানুষের মুখে মুখে। মাতসুমোতো নিজে এই উদ্যোগের এতটা জনপ্রিয়তা দেখে যেতে পারেননি। তবে স্থানীয় ডাইভিং প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা এখনো তাঁর পরিকল্পনাকে সুসামির পরিচিতি গড়ে তোলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখেন।
সাধারণ একটি ডাকবাক্সকে সমুদ্রের তলদেশে বসিয়ে পর্যটন আকর্ষণ তৈরির এই উদ্যোগ দেখিয়েছে, স্থানীয় পর্যায়ে ছোট ও সৃজনশীল ধারণাও একটি জনপদের পরিচিতি বদলে দিতে পারে। সুসামির পানির নিচের ডাকবাক্সে তাই শুধু চিঠিই জমা পড়ে না, জমা পড়ে ভ্রমণকারীদের ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতার স্মৃতিও।
সূত্র: গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস।