ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন সামনে রেখে নীরবে কৌশলগত প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে আদর্শিক অবস্থান, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা এবং নারী নেতৃত্বের বিকাশকে গুরুত্ব দিয়ে প্রশ্নহীন মনোনয়ন বিষয়ে জোর দিচ্ছে দলটি। ইতোমধ্যে সম্ভাব্য নারী প্রার্থীদের একটি প্রাথমিক তালিকা দলীয় আমিরের টেবিলে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়েছে বলে দলটির সূত্রে জানা গেছে। একই সঙ্গে ১১-দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি তাদের সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া অনেকটা গুছিয়ে নিয়েছে।
জামায়াতের নীতিনির্ধারণী সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, যেসব অঞ্চল থেকে সংসদে প্রতিনিধি হয়ে আসতে পারেনি, সেসব অঞ্চলকে প্রাধান্য দেওয়া হবে সংরক্ষিত আসনের মনোনয়নের ক্ষেত্রে। তবে প্রার্থী চূড়ান্ত করার আগে সাংগঠনিক অবদান, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, আদর্শিক অবস্থান এবং আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকার মতো বিষয়গুলো গভীরভাবে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এ জন্য তালিকা করতে একটু দেরি হচ্ছে। তবে যারা মনোনীত হবেন, তারা ইতোমধ্যে সবুজ সংকেত পেয়েছে। এখনই এ ব্যাপারে মুখ খুলতে নারাজ সম্ভাব্য সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনীত প্রার্থীরা।
জামায়াতের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র থেকে জানা যায়, সংরক্ষিত নারী আসনকে এবার দলটি কেবল আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্ব হিসেবে দেখছে না। বরং জাতীয় সংসদে আদর্শিক অবস্থান তুলে ধরা, নারী নেতৃত্বের বিকাশ এবং রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে সম্ভাব্য প্রার্থীদের বাছাই প্রক্রিয়ায় বেশ সতর্ক অবস্থান নিয়েছে দলটি। কোনো প্রশ্নের মুখে যেন পড়তে না হয়, সেই দিকটি বিবেচনা করা হচ্ছে বলে একাধিক নেতা এ প্রতিবেদককে নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে সম্ভাব্য সংরক্ষিত আসনের প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতের নারী সংগঠনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের মতামত এরই মধ্যে নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখা নেত্রীদের নামই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে খসড়া তালিকায়। পাশাপাশি যারা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য, পেশাগতভাবে প্রতিষ্ঠিত এবং রাজনৈতিকভাবে পরিণত- এমন ব্যক্তিদেরও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে বলে আমাদের সময়কে জানিয়েছেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক আব্দুল হালিম।
জামায়াতের এক কেন্দ্রীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সংরক্ষিত নারী আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের একটি তালিকা প্রস্তুত করে তা দলীয় আমিরের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে এটি এখনও চূড়ান্ত নয়। আমিরের নির্দেশনা অনুযায়ী, তালিকায় পরিবর্তন বা সংযোজন হতে পারে। সব কিছু পর্যালোচনা শেষে দল আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনীত প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করবে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
তিনি আরও বলেন, দলটি এবার সংরক্ষিত নারী আসনে অভিজ্ঞ ও নবীন নেতৃত্বের সমন্বয় ঘটাতে চায়। বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ধরে দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় এবং আন্দোলন-সংগ্রামের সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তাদের প্রতি অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন পাওয়ার আশায় দলটির নারী নেত্রীদের মধ্যেও আগ্রহ ও তৎপরতা বেড়েছে। অনেকেই নিজেদের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকার বিবরণ তুলে ধরে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে প্রোফাইল জমা দিয়েছেন। দলীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি সাংগঠনিক অবদান তুলে ধরার চেষ্টাও করছেন অনেকে। নিজের অতীতের রাজনৈতিক অবস্থানের খতিয়ান তুলে ধরছেন দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের কাছে।
এ ব্যাপারে দলের মিডিয়া বিভাগের দায়িত্বে নিয়োজিত ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে শুধু ব্যক্তিগত পরিচিতি, আত্মীয় বা সুপারিশ নয়, বরং দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ও আদর্শিক প্রতিশ্রুতিই প্রধান বিবেচ্য বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। যোগ্যতার মানদণ্ডেই সংরক্ষিত আসনের প্রার্থীদের বিবেচনা করা হবে। কোনো প্রকার স্বজনপোষণ করার সুযোগ নেই।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক অধ্যাপক সারোয়ার জাহানের মতে, সংরক্ষিত নারী আসন নিয়ে দলগুলোর এই অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি আগামী দিনের সংসদ রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। কারণ এসব আসনের মাধ্যমে অনেক সময় নতুন নেতৃত্বের উত্থান ঘটে এবং দলের ভেতরে প্রভাবশালী একটি রাজনৈতিক বলয় তৈরি হয়। সেসব বিষয় বিবেচনা করেই দলটি তাদের মনোনয়ন নিশ্চিত করবে বলে তিনি মনে করেন।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে ২০৯ আসনে জয় পায়। আসন অনুপাতে সংক্ষিত ৫০টি নারী আসনের মধ্যে দলটি পাবে ৩৫টি। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ১১ ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ১টি আসন পাবে। অন্য ৩টি আসন স্বতন্ত্র প্রার্থী ও নিজস্ব প্রতীকে জয়ী ছোট দলগুলোর মধ্যে বণ্টন করা হবে, যা গেজেট প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
জামায়াতের দলীয় সূত্রেও জানা গেছে, সংসদের অধিবেশন শুরুর আগেই সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য প্রার্থী চূড়ান্ত হবে। এ তালিকায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি নূরুন্নিসা সিদ্দীকা, আইন ও মানবসম্পদ বিভাগীয় সেক্রেটারি আইনজীবী সাবিকুন্নাহার, সহকারী সেক্রেটারি মার্জিয়া বেগম, মহিলা বিভাগের সদস্য ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রভাষক মারদিয়া মমতাজের নাম আছে।
এ ছাড়া সাঈদা রুম্মান, মার্জিয়া বেগম, খন্দকার আয়েশা খাতুন, ডা. হাবিবা চৌধুরী সুইট, কাজী মারিয়া ইসলাম বেবি, রাবেয়া খানম, ডা. শিরিন আক্তার রুনা, তানহা আজমি, নার্গিস খান, কানিজ ফাতেমা, সেলিনা আক্তার ও আয়েশা সিদ্দিকা পারভীনের নামও আলোচনায় রয়েছে। ভিন্ন ধর্মাবলম্বী থেকেও একজনকে মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে বলে একজন দায়িত্বশীল নেতা জানিয়েছেন প্রতিবেদকের কাছে।
দলীয় সূত্র থেকে জানা গেছে, জামায়াতের মহিলা বিভাগ থেকে একটি খসড়া তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে তা চূড়ান্ত করা হবে। সংসদের প্রথম অধিবেশনের আগেই সেটি চূড়ান্ত করে জানানো হবে।
জামায়াতের মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি নূরুন নেসা সিদ্দীকা বলেন, নারীরা দলের আমির হতে না পারলেও সংরক্ষিত নারী আসনে যোগ্যদের মনোনয়ন দেওয়া হবে। তবে যেসব অঞ্চল থেকে জাতীয় সংসদে আমাদের প্রতিনিধি উঠে আসতে পারেনি, সেসব অঞ্চলের নারী নেত্রীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে জেনেছি।
অপরদিকে ১১-দলীয় জোটের অন্যতম শরিক এনসিপি থেকে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে দুজন শীর্ষ নেত্রী সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। তারা হলেন- জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন ও দক্ষিণাঞ্চলের যুগ্ম মুখ্য সংগঠক মাহমুদা আলম মিতু। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে জানা যায়, সংসদের ভেতরে দলের আদর্শ ও জনআকাক্সক্ষা বলিষ্ঠভাবে তুলে ধরতে পারেন এমন যোগ্য নেত্রীকেই শেষ পর্যন্ত বেছে নেওয়া হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. সাব্বির আহমেদের মতে, সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থী নির্বাচন শুধু সাংগঠনিক বিষয় নয়, বরং এটি দলগুলোর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল এবং নেতৃত্ব বিন্যাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সে কারণে বড় দলগুলোর মতো জামায়াতও এবার বিষয়টিকে কৌশলগত দৃষ্টিতে দেখছে। মনে হচ্ছে, নারী নেতৃত্বকে সামনে এনে সংসদে দলীয় অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতৃবৃন্দ সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে কোন ধরনের নেতৃত্বকে সামনে আনতে চায় এবং ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বকে কীভাবে ভূমিকা রাখবে, তাই প্রমাণ হবে তাদের প্রার্থী বাছাইয়ে।
সূত্র:আমাদেরসময়