- Dainiksylhet.com - https://dainiksylhet.com -

সংরক্ষণের অভাবে জরাজীর্ণ শেরে বাংলার জন্মভিটা

আজ ২৬ অক্টোবর, অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী, বাঙালি জাতীয়তাবাদের অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা ও বর্ষীয়ান রাজনীতিক শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের ১৫৩তম জন্মদিন। ১৮৭৩ সালের এই দিনে ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া ইউনিয়নের মামার বাড়ি সাতুরিয়া মিয়াবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত এই রাজনীতিক। অথচ জন্মদিনেও সংরক্ষণের অভাবে তার জন্মভিটা ও স্মৃতিচিহ্নগুলো জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। ভবনের দেয়াল থেকে খসে পড়ছে ইট, কোথাও কোথাও ইটের অস্তিত্বও নেই। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটিতে বসবাস করছেন তার উত্তরসূরিরা। দীর্ঘদিন ধরে জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবি উঠলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে শেরে বাংলার স্মৃতিবিজড়িত স্থানটি দেখতে এসে হতাশ হয়ে ফিরছেন দেশ-বিদেশের দর্শনার্থীরা।

আইনজীবী কাজী মুহম্মদ ওয়াজেদ ও সাইদুন্নেসা খাতুনের ছেলে আবুল কাশেম ফজলুল হক রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য উপমহাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিয়েছেন। অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে কৃষক-শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। শোষণ ও নির্যাতনমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা ছিল তার আমৃত্যু সংগ্রামের অন্যতম লক্ষ্য।

১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকায় মারা যান শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক। শিক্ষার প্রতিও তার ছিল গভীর অনুরাগ। মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষার প্রসারে তিনি অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। এলাকার ছেলেমেয়েদের শিক্ষার কথা বিবেচনা করে ১৯৪১ সালে নিজ জন্মভূমি সাতুরিয়ায় প্রতিষ্ঠা করেন সাতুরিয়া এম এম উচ্চবিদ্যালয়। তবে তার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিও এখন নানা অবকাঠামোগত সমস্যায় জর্জরিত।

‘বাংলার বাঘ’ নামে পরিচিত শেরে বাংলা তার মামার বাড়ি সাতুরিয়া মিয়াবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। এই গ্রামেই তার শৈশব ও কৈশোরের উল্লেখযোগ্য সময় কেটেছে। স্থানীয় একটি মক্তবে তিনি লেখাপড়া করতেন। যে পুকুরে তিনি সাঁতার কাটতেন, সেটিও এখনো রয়েছে। একসময় সাতুরিয়া ছিল রাজনীতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র।

মোগল আমলে নির্মিত যে ভবনে শেরে বাংলা জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সেটি বর্তমানে জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। দীর্ঘদিনের অযত্ন ও অবহেলায় ভবনটির দেয়াল থেকে ইট খসে পড়েছে। কোথাও কোথাও দেয়ালে ইট নেই। সংস্কারের অভাবে ঐতিহাসিক স্থাপনাটি ধ্বংসের মুখে পড়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত উদ্যোগ না নিলে ভবনটি একসময় পুরোপুরি বিলীন হয়ে যেতে পারে।

মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরও একাধিকবার সাতুরিয়ায় এসেছিলেন শেরে বাংলা। তার ছেলে প্রয়াত এ কে ফাইজুল হকও মন্ত্রী ছিলেন। তবে শেরে বাংলার জন্মভিটা কিংবা তার প্রতিষ্ঠিত সাতুরিয়া এম এম উচ্চবিদ্যালয়ের অবকাঠামোর উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়নি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

জন্মভবনে দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাস করছেন শেরে বাংলার নিকটাত্মীয় হোসনে আরা বেগম বুলু ও তার পরিবারের সদস্যরা। ঐতিহাসিক স্থাপনাটি সংরক্ষণের পাশাপাশি তাদের নিরাপদ আবাসনের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

পর্যটনশিল্পের উন্নয়ন ও প্রসারের লক্ষ্যে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ২০০৮-০৯ অর্থবছরে শেরে বাংলার জন্মস্থানকে পর্যটন স্থান হিসেবে চিহ্নিত করে। পরবর্তী সময়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ১৯৬৮ সালের প্রত্নতত্ত্ব সংরক্ষণ আইন, ১৯৭৬ সালে সংশোধিত, অনুযায়ী তার জন্মভবনকে সংরক্ষণযোগ্য পুরাকীর্তি হিসেবে বিবেচনা করে।

প্রত্নসম্পদ আইনের ১০ ধারার ১ উপধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সরকার সাতুরিয়া মৌজার তিনটি খতিয়ান ও দাগের আওতাধীন মোট ০.৬১ একর জমি সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ হিসেবে ঘোষণা করে। এ বিষয়ে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে ২০১০ সালের ২৫ জানুয়ারি প্রজ্ঞাপন জারি হয়। পরে ২০১০ সালের ১৮ মার্চ গেজেটে তা প্রকাশ করা হয়।

তবে জমির খতিয়ান, দাগ নম্বর, পরিমাণ ও মালিকানাসংক্রান্ত বিষয়ে দুই ওয়ারিশ লিখিত আপত্তি জানালে জটিলতা দেখা দেয়। বিষয়টি যাচাই-বাছাই করতে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যায়। জানা গেছে, এখনো এ বিষয়ে পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বহু বছর আগে শেরে বাংলার জন্মস্থান নিজেদের আওতায় নিলেও সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ তেমন দেখা যায়নি। ২০১৭ সালে শুধু তার জন্মগ্রহণ করা ভবনটির ছাদ সংস্কার করা হয়। এরপর আর উল্লেখযোগ্য সংস্কারকাজ হয়নি বলে তাদের দাবি।

শেরে বাংলার জন্মভিটা দেখতে আসা দর্শনার্থী মো. জিসান বলেন, এখানে ঘুরতে এসে দেখার মতো কিছুই পাচ্ছি না। বাড়িটিও ভাঙাচোরা। সরকার উদ্যোগ নিয়ে এখানে একটি জাদুঘর নির্মাণ করলে এবং সেখানে শেরে বাংলার জীবনীসংক্রান্ত বইসহ বিভিন্ন স্মারক সংরক্ষণ করলে নতুন প্রজন্ম তার সম্পর্কে জানতে পারবে।

শেরে বাংলার নিকটাত্মীয় নজরুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে শেরে বাংলাকে মূল্যায়ন করা হয়নি। বর্তমান সময়েও বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির কথা শোনা যাচ্ছে, কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। এর পেছনে কোনো অদৃশ্য শক্তি থাকতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সাতুরিয়া এম এম উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক ফজলুল হক আকন বলেন, কোনো সরকারই মহান এই নেতার স্মৃতি সংরক্ষণে এগিয়ে আসেনি। শেরে বাংলার প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ছয় শতাধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। বিদ্যালয়ের ফলাফলও ভালো। কিন্তু অবকাঠামো উন্নয়নে কর্তৃপক্ষের নজর নেই।

তিনি বলেন, ১৯৬৭ সালে নির্মিত বিদ্যালয়ের একটি ভবন বর্তমানে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ভবনটি সংস্কারের জন্য একাধিকবার আবেদন করেও কোনো ফল পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে শেরে বাংলার জন্মভবনে তার নিকটাত্মীয় হোসনে আরা বেগম বুলু ও তার পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাস করছেন। সেই ভবন সংস্কার বা উন্নয়নেও কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

জন্মভবনে বসবাসকারী পরিবারের সদস্যদের দাবি, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বহু বছর আগে শেরে বাংলার জন্মস্থান নিজেদের আওতায় নিয়েছে। ২০১৭ সালে শুধু ভবনটির ছাদ সংস্কার করা হয়। এরপর আর কোনো সংস্কারকাজ হয়নি।

শেরে বাংলার জন্মভিটা দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা কেয়ারটেকার মোজাম্মেল হোসেন বলেন, বিভিন্ন সরকার আসে আর যায়, কিন্তু কোনো কাজ হয় না। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের লোকজন এসে ছবি তুলে নিয়ে যান। বাড়িটি সংস্কার করা হবে, জাদুঘর করা হবে এমন অনেক আশ্বাস দিয়ে যান। কিন্তু এখন পর্যন্ত কিছুই হয়নি।

তিনি আরও বলেন, ঘরটা কোনোরকমে আছে। এটি যদি ভেঙে বিলীন হয়ে যায়, তাহলে এখানে শেরে বাংলার কোনো চিহ্নই থাকবে না। সব শেষ হয়ে যাবে। সরকারের কাছে অনুরোধ জানাই, শেরে বাংলার স্মৃতি ধরে রাখার জন্য কিছু একটা করা হোক।

স্থানীয় হাবিবুর রহমান মুনশি বলেন, এই পুকুরে শেরে বাংলা গোসল করতেন। বর্তমানে তার জন্মভিটা জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। প্রশাসন সুদৃষ্টি দিলে এটি টিকে থাকবে। নয়তো এর অস্তিত্ব থাকবে না।

স্থানীয় মো. হাসান মীর বলেন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বহু বছর আগে শেরে বাংলার জন্মস্থান নিজেদের আওতায় নিলেও ২০১৭ সালে শুধু জন্মভবনের ছাদ সংস্কার করা হয়েছে। এরপর আর কোনো সংস্কারকাজ হয়নি। বিভিন্ন সময়ে নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

শেরে বাংলার প্রতিষ্ঠিত সাতুরিয়া এম এম উচ্চবিদ্যালয়ে বর্তমানে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ছয় শতাধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। বিদ্যালয়ের ফলাফলও ভালো। তবে অবকাঠামোগত উন্নয়নের অভাবে শিক্ষার্থীদের ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে পাঠদান কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

স্থানীয়রা জানান, ১৯৬৭ সালে নির্মিত বিদ্যালয়ের একটি ভবন ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের দাবি জানানো হলেও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। শেরে বাংলার মতো জাতীয় নেতার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমন অবস্থা নিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।

পাঠাগার ও জাদুঘর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও থমকে আছে

শেরে বাংলার স্মৃতি সংরক্ষণ এবং তার জীবন ও দর্শন নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে ২০০৮ সালে ঝালকাঠি জেলা পরিষদ ‘শেরে বাংলা’ নামে একটি পাঠাগার স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। এ জন্য অর্থও বরাদ্দ করা হয়েছিল। কিন্তু নানা জটিলতায় সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।

এ ছাড়া সাতুরিয়ার যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, শেরে বাংলার নামে প্রথম শ্রেণির একটি কলেজ, ডাকবাংলো ও জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবি দীর্ঘদিনের। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সাতুরিয়া শুধু ঐতিহাসিক স্থান হিসেবেই নয়, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে।

এ বিষয়ে রাজাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিফাত আরা মৌরি বলেন, শেরে বাংলার জন্মভবন ও জন্মভিটা সংরক্ষণের জন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

ঝালকাঠির জেলা প্রশাসক মো. মমিন উদ্দিন বলেন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কাছে শেরে বাংলার জন্মস্থানের জমির তফসিল, খতিয়ান, দাগ নম্বর ও জমির পরিমাণসংক্রান্ত কাগজপত্র দাখিল করা হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, খুব শিগগিরই শেরে বাংলার জন্মভবন ও জন্মভিটা সংরক্ষণের কাজ শুরু করা যাবে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন