সৌদিফেরত সেই রিজিয়ার খোঁজ পেল পরিবার

সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরত আসা রিজিয়া বেগম অবশেষে পরিবারের কাছে ফিরলেন। তাঁর তিন সন্তান ফিরে পেল তাদের মাকে। সৌদি আরব থেকে ফেরত পাঠানোর পর মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় রিজিয়াকে রাজধানীর আশকোনায় ব্র্যাকের মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারের কাছে হস্তান্তর করেছিলেন সিভিল অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটি (এভসেক) সদস্যরা। এই ১৩ দিন তিনি সেখানেই ছিলেন।

পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সহায়তায় আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায় যে, রিজিয়ার বাড়ি মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণ শাহাবাজপুর ইউনিয়নের মোহাম্মদ নগর গ্রামে। দীর্ঘদিন যোগাযোগ না থাকায় পরিবারের সদস্যরা ধরেই নিয়েছিলেন রিজিয়া বেঁচে নেই। মঙ্গলবার (২৪ ফ্রেব্রুয়ারি) উত্তরায় ব্র্যাকের মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে রিজিয়াকে তাঁর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

সৌদিফেরত রিজিয়ার মেয়ে লিজা আক্তার জানান, ২০১৯ সালে গ্রামের এক দালালের মাধ্যমে ঢাকার এটিবি ওভারসিজ লিমিটেড এজেন্সির সহায়তায় তার মা সৌদি আরবে যান। সেখানে যাওয়ার পর থেকেই তিনি নিয়োগকর্তার শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। দালাল ও সংশ্লিষ্টদের কাছে একাধিকবার অভিযোগ জানানো হলেও কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। ২০২১ সালের পর মায়ের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ২০২৩ সালে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোতে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন। কিন্তু কোনো প্রতিকার পাননি। সোমবার ব্র্যাক সদস্যরা বাড়িতে এলে জানতে পারেন তার মা ফিরেছেন। কান্নাজড়িত কন্ঠে লিজা বলেন, নির্যাতনে তার মায়ের যে চেহারা হয়েছে, চিনতেই পারছেন না। আর তার মাও কোনো কথা বলছেন না।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান জানান, ১২ ফেব্রুয়ারি বিকেলে সৌদি এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন রিজিয়া বেগম। তাঁর কাছে কোনো পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র বা ব্যক্তিগত নথিপত্র পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁর পরিবার খুঁজে পেতে নানা প্রচেষ্টা চলছিল। পরবর্তীকালে ঢাকায় পিবিআই সদস্যরা রিজিয়ার আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত হন।

পিবিআইর অতিরিক্ত ডিআইজি এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, অপরাধী শনাক্তকরণে পিবিআই কাজ করলেও দেশের বাইরে থেকে আসা ক্ষতিগ্রস্ত নারী কর্মীদের পরিচয় শনাক্তকরণে পিবিআই এই প্রথম কাজ করল। যাদের কারণে বিদেশে নারীদের এমন দুর্ভোগে পড়তে হয়, সেই পাচারাকারী চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অনুষ্ঠানে রিমা আক্তার (ছদ্মনাম) নামে সৌদি ফেরত আরেক নারী তাঁর নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, ছোটবেলায় মা-বাবা হারিয়ে এতিমখানায় বড় হন। পরে ঢাকায় গৃহকর্মীর কাজ করতেন এবং বিয়ে হয়। দুই সন্তানের জন্মের পর স্বামী তাঁকে ছেড়ে চলে যান। এই দুই সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে যান। কিন্তু কাজ দেওয়ার বদলে সেখানে তাঁকে চারবার বিক্রি করা হয়। শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়। এক পর্যায়ে তাঁকে দেশটির পুলিশের কাছে দেওয়া হয় এবং বুঝতে পারেন অন্তঃসত্ত্বা। কিন্তু বিচারের বদলে ৯ ফেব্রুয়ারি তাঁকে ঢাকায় ফেরত পাঠানো হয়। ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তাঁর নিরাপদ আবাসন ও চিকিৎসার জন্য এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ তাঁকে ব্র্যাকের কাছে হস্তান্তর করে। মানব পাচারের শিকার এই নারী এখন নিজের ও অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কিত।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন