প্রায় দুই দশক আগের কথা। ছবি তোলার প্রয়োজনে রমনা পার্ক নার্সারিতে গিয়েছিলাম। কাজ শেষে ফিরে আসার সময় কোনো এক ফুলের তীব্র গন্ধ আমাকে আবিষ্ট করে ফেলল। ভালোভাবে চারপাশে তাকিয়ে দেখি।
আবিষ্কার করি, একটি ছোট্ট গাছে সাদা রঙের অতি ক্ষুদ্র ফুল এই তীব্র সুগন্ধের উৎস। পাতা দেখতে চা বা ক্যামেলিয়ার পাতার মতো। মালিরা জানালেন, গাছটির নাম সুরভি। বুঝতে পারি, এটা ওদের দেওয়া নাম।
গাছটির কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। নাটোরের দিঘাপতিয়া রাজবাড়ি গিয়ে আবার গাছটি দেখার সুযোগ হলো। এই গাছটি যে সবচেয়ে প্রাচীন এবং মাতৃগাছ, তা না দেখলে অজানাই থেকে যেত। কিভাবে খুঁজে পেলাম পুরনো গাছটি, সেই গল্পই বলছি এখন।
সুগন্ধি ফুল সুরভিগাছের সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতে একদিন হাজির হলাম নাটোরে। যে সড়কটি দিঘাপতিয়া রাজবাড়িকে নাটোর-বগুড়া মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত করেছে, তার দুই পাশে চোখে পড়বে অনেকগুলো সুউচ্চ রয়ালপাম। উত্তরা গণভবন নামে পরিচিত দিঘাপতিয়া রাজাদের এই বাড়ির মূল ফটক পেরিয়ে কিছুটা এগোলেই বাঁ পাশে চোখে পড়বে পাখিফুলের দুটি পরিণত গাছ। জানা মতে, দেশে শতোর্ধ্ববর্ষী পাখিফুলের এমন আর কোনো গাছ নেই। যদিও অজ্ঞতাবশত গাছটিকে পারিজাত নামে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
আদতে পারিজাত আর পাখিফুল একেবারেই আলাদা। ডান পাশে আছে একটি প্রাচীন বকুল ও মুচকুন্দ। কাণ্ড ও ডালপালা দেখেই বোঝা যায়, গাছগুলোর বয়স শতাব্দী ছাড়িয়েছে। এমন অসংখ্য মহীরুহ বৃক্ষের ছায়ায় এখানে ইতিহাস যেন থমকে আছে।
প্রতিদিন বেড়াতে আসা অসংখ্য মানুষের মধ্যে বাড়িটির প্রতি আকর্ষণ নানা কারণে। উদ্ভিদপ্রেমীদের কাছে বাড়িটির প্রধান আকর্ষণ অনন্য শৈলীর ইতালিয়ান গার্ডেন। রাজপুরীর সুসজ্জিত ছোট্ট এই বাগানটির অবস্থান পশ্চিম প্রান্তে, লেকের ধারে। স্বল্প পরিসরে নিখুঁত নকশায় সুশোভিত দুষ্প্রাপ্য উদ্ভিদের মনোমুগ্ধকর উপস্থিতি উদ্যানটির উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। সেখানে জহুরিচাঁপা, হাপরমালী, কপসিয়া, কুরচি, শতোর্ধ্ববর্ষী তেজপাতা, কর্পূর—এসব গাছের ভিড়ে একগুচ্ছ শুভ্র ফুলে চোখ আটকে গেল। রমনা নার্সারিতে দেখা সেই একই ফুল! কাছে যেতেই মধুর ঘ্রাণে আচ্ছন্ন হলো মন। মালিদের দেওয়া নামটি মনে পড়ল—সুরভি। ইংরেজিতে Fragrant Olive, Osmanthus, Sweet Olive, Tea Olive ইত্যাদি নামে পরিচিত। গাছ ভর্তি ফুলের তীব্র সুবাস ছড়িয়ে পড়েছিল চারপাশে। হিমালয় অঞ্চলের এই উদ্ভিদ আমাদের দেশে ততটা সহজলভ্য না হলেও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সহজদৃষ্ট। চীন-জাপানের বিভিন্ন শহরে সুগন্ধি ও শোভাবর্ধক হিসেবে পরিকল্পিতভাবে এই উদ্ভিদ লাগানো হয়। তা ছাড়া ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায়ও চাষ করতে দেখা যায়।
সুরভি (Osmanthus Fragrans) চিরসবুজ ঝোপালো ধরনের গাছ। সাধারণত ৩ থেকে ১০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। পাতা খানিকটা পুরু, ৭ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার লম্বা এবং কিনারা দাঁতানো। সাদা রঙের ফুল ছাড়াও এদের ফ্যাকাসে হলুদ, হলুদ বা কমলা-হলুদ রঙের ফুলও দেখা যায়। ৫ মিলিমিটার চওড়া ফুলগুলো ১ সেন্টিমিটার লম্বা হতে পারে। বেশি ফোটে শরতে। ১ থেকে দেড় সেন্টিমিটার লম্বা ও শক্ত আবরণের ফলগুলোর গায়ে কালচে বেগুনি দাগ থাকে। ফুল ফোটার প্রায় ছয় মাস পর ফল পরিপক্ব হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে তিন হাজার মিটার পর্যন্ত উচ্চতায় রোদযুক্ত স্থানে এই গাছ ভালো জন্মে। চীনে সুগন্ধি চা ও খাবার তৈরিতে এই ফুলের ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ করা যায়। ঐতিহ্যবাহী চীনা ভেষজ চিকিৎসায় এই ফুলের চা বেশ কার্যকর মনে করা হয়। বৈজ্ঞানিক নামের প্রথমাংশে ‘ওসমে’ বা সুগন্ধি এবং ‘অ্যান্থোস’ বা ফুল শব্দ দুটি গ্রিক ভাষা থেকে এসেছে।
