নতুন ভোটার ও নারীদের টার্গেট করে মাঠ মাতাচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা। বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের দোটানায় থাকা ভোটারদেরও ভোট টানার নানা চেষ্টা করছে দলটি।
জেলার পাঁচটি আসনের মধ্যে তিনটি জোটকে ছেড়ে দেলেও একটি আসনে নিজেদের প্রার্থীকে উন্মুক্ত রেখেছে জামায়াত। কখনো নীরবে, কখনো সরবে মাঠ-ঘাট, হাট-বাজার, বাসা-বাড়িতে ভোটারদের ভোট প্রার্থনা করছেন দলটির প্রার্থীরা।
বিএনপি প্রার্থীরাও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটের মাঠে প্রচার চালাচ্ছেন। তবে দুটি আসনে ‘বিদ্রোহী’ স্বতন্ত্র প্রার্থী শক্তিশালী থাকায় এই সুযোগ নিতে চায় জামায়াত জোট।
সব মিলিয়ে এবার জামায়াত কোনোভাবেই বিএনপিকে ছাড় দিতে চাচ্ছে না। তারা হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। প্রথমবারের মত সুনামগঞ্জে জয় পেতে চায় জামায়াত।
জেলার পাঁচটি সংসদীয় আসনে ২০ লাখ ৮০ হাজার ৩৩৫ জন ভোটার রয়েছেন। প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ২৩ প্রার্থী। ১২টি উপজেলার মধ্যে আটটিই হাওরবেষ্টিত। এর মধ্যে ৭২০টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৪৫১টিই দুর্গম বা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’। সুনামগঞ্জ পৌরসভার ১৯টি কেন্দ্রসহ ৪৭০টি কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা বসানোর কাজ চালাচ্ছে ইসি।
সুনামগঞ্জ-১: জোট ‘উপেক্ষিত’, দাঁড়িপাল্লায় ব্যস্ত জামায়াত
তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত সুনামগঞ্জ-১ আসনে বিএনপি প্রার্থী সাবেক ছাত্রদল নেতা ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুল। নির্বাচনের মাঠে খুবই জনপ্রিয় এই প্রার্থী। ২০০১ সালে নজির হোসেন নির্বাচিত হয়ে এই আসনে বিএনপির সাংগঠনিক শক্ত অবস্থান তৈরি করেন।
তবে ২০০৮ সালের নির্বাচন থেকে আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে চলে যায়। ওই সময় থেকেই বিএনপি প্রার্থী কামরুজ্জামান কামরুল মাঠে পড়ে আছেন। অন্তত এক ডজন মামলার আসামি হয়েও তিনি মাঠ ছাড়েননি। এবার দলে কোনো ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী না থাকায় তিনি আছেন সুবিধাজনক অবস্থানে। তার পক্ষে দলের মনোনয়নবঞ্চিতরাও কাজ করছেন।
এই আসনে জামায়াত জোটের প্রার্থী নেজামে ইসলামী পার্টির নেতা মাওলানা মোজাম্মিল আলী। তবে জামায়াত প্রার্থী মাওলানা তোফায়েল আহমদ মনোনয়ন প্রত্যহার না করায় তার পক্ষে দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা মাঠে কাজ করছেন। তিনি বিএনপি প্রার্থীকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে প্রচারে ব্যস্ত রয়েছেন।
বিএনপির দুর্বলতাগুলো ধরে জামায়াত সুবিধা নিতে চাচ্ছে বলে মনে করছেন সাধারণ ভোটাররা। যেখানেই বিএনপির দুর্বলতা দেখছেন সেখানেই জামায়াত প্রার্থীর সমর্থকরা কাজ করছেন। এই আসনে ৫ লাখ ১ হাজার ৫৩০ জন ভোটার রয়েছে।
সুনামগঞ্জ-২: হিন্দু ভোটে ‘নজর’
দিরাই ও শাল্লা উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত আসনটিতে ভোটারের প্রায় অর্ধেক হিন্দু সম্প্রদায়ের। সুরঞ্জিত সেনের আসন হিসেবে পরিচিত এই আসনে এবার তার সমর্থক ও ভোটারদের উপর চোখ রেখে প্রচার চালাচ্ছেন বয়সের ভারে ন্যুব্জ বিএনপি প্রার্থী ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক নাছির উদ্দিন চৌধুরী। তার সঙ্গে কোনো বিদ্রোহী নেই। দলের মনোনয়ন বঞ্চিতরাও তার পক্ষে প্রকাশ্যে কাজ করছেন।
১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে তিনি সুরঞ্জিত সেনকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। এই আসনে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে তারও গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা রয়েছে। সুরঞ্জিতের সঙ্গে প্রতিটি নির্বাচনে সামান্য ভোটে তিনি পরাজিত হতেন। তারপরও তিনি মাঠ ছাড়েননি।
বয়ষ্ক হলেও একজন জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য নেতা হিসেবে তিনি মাঠে ব্যস্ত আছেন। এবারও এই আসনে হিন্দু সম্প্রদায় ও আওয়ামী লীগের ভোট যারা পাবেন তাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হবে বলে সাধারণ ভোটাররা মনে করছেন।
এই আসনে জামায়াতে ইসলামী শক্তিশালী প্রার্থী তরুণ আইনজীবী শিশির মনিরকে প্রার্থী করেছে। তিনি আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকেই জাতীয় নির্বাচনের জন্য মাঠে আছেন। সিলেট বিভাগে জামায়াতের সবচেয়ে শক্তিশালী ও আলোচিত প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন তিনি। নানা কার্যক্রমের মাধ্যমে এলাকায় ভালো অবস্থান তৈরি করেছেন তিনি।
বিএনপির জন্য শিশির মনির মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তিনিও হিন্দু সম্প্রদায় ও আওয়ামী লীগের ভোট টানতে নানাভাবে কাজ করছেন। নির্বাচনি বিশ্লেষকরা এই আসনে তাকে শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে মনে করেন।
এ ছাড়া এই আসনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী এডভোকেট নিরঞ্জন দাস কাস্তে প্রতীক নিয়ে মাঠে আছেন।
সুনামগঞ্জ-৩: ‘বিদ্রোহে কুপোকাত’ বিএনপি
জগন্নাথপুর ও শান্তিগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত সুনামগঞ্জ-৩ আসন। এই আসনে সাতজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে বিএনপি প্রার্থী কয়ছর এম আহমদ দলীয় ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী এবং নিজ এলাকার শক্তিশালী দুই প্রার্থীর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন।
তার নিজ উপজেলা জগন্নাথপুরে বাড়ি জামায়াত জোটের প্রার্থী খেলাফত মজলিস নেতা মাওলানা শাহীনূর পাশা চৌধুরীর। একই জোটের এবি পার্টির প্রার্থী সৈয়দ তালহা আলমও উন্মুক্ত নির্বাচন করছেন। তাদের নিজস্ব ‘ভোট ব্যাংক’ রয়েছে।
অন্যদিকে শান্তিগঞ্জ উপজেলার প্রভাবশালী প্রার্থী বিএনপির মনোনয়ন বঞ্চিত নেতা ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেন। তিনি শান্তিগঞ্জ ও জগন্নাথপুরে তুমুল প্রচার চালাচ্ছেন। তার সঙ্গে জগন্নাথপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও পৌর মেয়র আখতার হোসেনও মাঠে নেমেছেন।
বিএনপির একটি অংশের ভোটের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের ভোটের দিকেও তার নজর রয়েছে। তার সঙ্গেই বিএনপি প্রার্থীর মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে মনে করেন নির্বাচনি বিশ্লেষকরা।
সুনামগঞ্জ-৪: বিএনপির বিরোধের সুযোগ নিতে চায় জামায়াত
সদর ও বিশ্বম্ভরপুর আসন নিয়ে বিস্তৃত সুনামগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট নূরুল ইসলাম নূরুল রাজপথের সক্রিয় ও সাহসী নেতা। তবে তার সঙ্গে শক্তিশালী ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী রয়েছেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও হাসন রাজার প্রপৌত্র দেওয়ান জয়নুল জাকেরিন। তার সঙ্গে দুটি উপজেলার বিএনপির কিছু নেতাকর্মীদেরও দেখা যাচ্ছে।
বিএনপির এই বিরোধকে কাজে লাগিয়ে সুযোগ নিতে চাচ্ছেন জামায়াত প্রার্থী বিশিষ্ট আইনজীবী মো. শামছ উদ্দিন। নতুন ভোটার ও নারী ভোটারদের লক্ষ্য করে মাঠে কাজ করছেন তার সমর্থকরা। তিনিও প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। এই আসনে পাঁচ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
সুনামগঞ্জ-৫:
ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত সুনামগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপি প্রার্থী দিয়েছে জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন আহমদ মিলনকে। এই আসনে পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
এখানে বিএনপির মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে ‘বিদ্রোহী’ হয়েছিলেন শক্তিশালী প্রার্থী মিজানুর রহমান চৌধুরী। পরে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাকে ডেকে নিয়ে কথা বলেন। এরপর তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। এখন তিনিও মিলনের পক্ষে মাঠে কাজ করছেন। এটি বিএনপি প্রার্থীকে ঝামেলামুক্ত করেছে।
জামায়াতে ইসলামী এই আসনে প্রার্থী দিয়েছে দীর্ঘদিন ধরে মাঠে থাকা মাওলানা আব্দুস সালাম আল মাদানীকে। ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলায় জামায়াতের ভালো সাংগঠনিক অবস্থানের কারণে তিনিও রয়েছেন সুবিধাজনক অবস্থানে। বিএনপিকে কোনোভাবেই ছাড় দিতে চান না তিনি ও তার সমর্থকরা।
