কষ্টে ফলানো পাকা বোরো ধান কেটে মহা বিপদে আছেন সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কৃষকগন। হাওরের গভীর থেকে খলায় আনার জাঙ্গাল( সড়ক) ভাঙা চুরা আর মাটির হওয়ায় বৃষ্টিতে ভিজে মরণ ফাঁদে পরিনত হয়েছে।
ফলে কোনো ধরনের যানবাহন চলাচল করতে পারছে না। সে কারনে হাওর থেকে ধান আনতে গিয়ে যেন প্রান যায় যায় অবস্থা কৃষকদের। হাওরের পাকা ধান মাঠের পছতে বসেছে। ফলে কৃষকগনের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।
জেলার ১২টি উপজেলার হাওর গুলোতে সড়ক পাকা না হওয়ায় চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে কৃষকগন। তাই সড়ক মেরামত করার জন্য হাওর নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন দাবী জানিয়েছেন। যেন মাঠের ধান গোলায় তুলতে কৃষকদের নাভিশ্বাস দশায় পড়তে না হয় আগামী দিন গুলোতে।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা ফতেপুর ইউনিয়নের অনন্তপুর গ্রামের বাসিন্দা ও শনির হাওর পাড়ের কৃষক শফিউল আলম জানান,আমাদের কষ্টের কথা কেউ শুনে না। কষ্টে ফলানো বোরো ধানের চারারোপন করা থেকে শুরু করে পাকা ধান কেটে ধান শুকানো খলায় নিয়ে আসতে গিয়ে চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন হাজার হাজার কৃষকগন পাকা সড়ক না থাকায়।
তিনি আরও জানান,হাওরের গভীর থেকে ধান কেটে আনার সময় সড়কে আনতে পারলেও ভাঙা চুরা আর মাটির থাকায় অনেক সময় দূর্ঘটনার শিকার হয়ে হা পা ভেঙে গুরুত্ব আহত হতে হয় কৃষক ও শ্রমিকদের। হাওরের মাটির সড়কে যানবাহন আটক থাকে দিন ভর। শ্রমিক ও পাওয়া যাচ্ছে না। বৈরী আবহাওয়ার কারনে যে শ্রমিক ও ট্রলি পাওয়া যায় তাদের মজুরী বেশি দিতে হয়,নিজেও কষ্ট করতে হয়। লাভের অংশে ভাগ বসাচ্ছে দুর্যোগ আর দূর্ভোগ। সড়ক পাকা করা হলে এত সমস্যা হতো না।
জেলার শনি, মাটিয়ান খরচার হাওর, পাগনার হাওর,আঙ্গারউলি হাওর সহ কয়েকটি হাওরের খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাওরের গভীর থেকে পাকা ধান কেটে সড়কের পাশে রাখা হয়। পরে হাওরের সড়ক দিয়ে ধান গুলো বাড়িতে ও খলায় নিয়ে যাওয়ার সড়ক(জাঙ্গাল) গুলো মাটির থাকায় বৃষ্টি হলে অটোরিকশা,ঠেলাগাড়ি, পিকআপ, ট্রলি সহ কোনো ধরনের যানবাহন চলাচল করতে পারছে না। এসব যানবাহন দিয়ে ধান পরিবহন করার সময় মাটির সড়কের কাঁদা ও গর্তে আটকে গিয়ে দিন পার হয়ে যায়। পরে বোঝাই করা ধান সড়িয়ে উঠাতে হচ্ছে যানবাহন গুলোকে। সড়ক মেরামত করে পাকা করার জন্য দায়িত্বশীলদের কাছে দাবী জানিয়ে আসলেও এর কোনো সুফল পাচ্ছেন না হাওরের কৃষকগন।
সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলার ছোট বড় ১৩৭টি হাওরের ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর বোরো জমিতে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ধান উৎপাদন করা হয়। এর এই ধান রক্ষায় সরকার গত ৯ বছরে প্রায় ৯ শত কোটি টাকা ব্যয় করেছে।
শেখ দেলোয়ার হোসেন সহ হাওর পাড়ের সচেতন মহল বলছেন, প্রতি বছরেই শত কোটি টাকা ব্যয় করে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করলেও ধান পরিবহনের জন্য হাওরের যে সড়ক গুলো রয়েছে তা মেরামত (জাঙ্গাল) ও পাকা করার জন্য কোনো বরাদ্দ হয় না আর পদক্ষেপ নিচ্ছে না দায়িত্বশীলরা। হাওর পাড়ে কৃষি রক্ষায় ও কৃষকদের স্বার্থে দ্রুত এর সমাধানের দাবী জানান। না হলে কৃষিতে কৃষকদের আগ্রহ কমে যাবে আগামী দিন গুলো।
শনির হাওরের আরেক কৃষক আব্দুল মুকিত জানান, মাটির সড়ক পাকা না হওয়ায় বৃষ্টিতে কাঁদা ও পিচ্চিল হওয়ায় মাথায় করে ধান নিয়ে পায়ে হাটাই দায় হয়ে পড়েছে। আর কোন ধরনের গাড়ি এই সড়ক দিয়ে গেলে গাড়ির চাকা সামনের দিকে এগোয় না। পিছলে সড়ক থেকে নিচে নেমে যায়। জমি করে লাভ হবে, এখন লাভের পরিবর্তে ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। হাওরের গভীর থেকে খলায়(ধান শুকানোর স্থান) পরিবহনের জন্য পাকা সড়ক না করলে আমাদের দূর্ভোগের শেষ থাকবে না।
আঙ্গারউলি হাওরের কৃষক সাইদ আহমেদ জানান, হাওর জাঙ্গাল (সড়ক) নিয়ে বংশ পরম্পরায় দূর্ভোগের শিকার হলেও কারও কোনো মাথা ব্যাথা নাই। বৈশাখের এই সময়ে যেখানে আনন্দ করার কথা সেখানে স্থবিতরা দেখা দিয়েছে। এর থেকে মুক্তির জন্য জনপ্রতিনিধিসহ দায়িত্বশীল কতৃপক্ষের কাছে দাবী জানানো হলেও সুফল পাচ্ছি না। ফলে পরিবহন খরচ বেড়েছে,একেই সাথে পরিবহনে শারীরিক কষ্টও হচ্ছে।
জেলার তাহিরপুর উপজেলার সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জুনাব আলী জানিয়েছেন, বৃষ্টি হলে হাওরের সড়ক (জাঙ্গাল) গুলো দিয়ে চলাচল করা কঠিন। ইউনিয়ন পরিষদের টিআর কাবিটা থেকে সড়ক মেরামত করা হলে পাকা সড়ক না হলে হাওর থেকে ধান সহজে বাড়ির সামনে খলায় আনতে যে দূর্ভোগের শিকার কৃষকগন হয় তা থেকে মুক্তি মিলবে না।
তাহিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শরীফুল ইসলাম জানিয়েছেন, হাওরে ধানের ভাম্পার ফলন হয়েছে আর কৃষকগন পাকা ধান কাটছেন। হাওরের সড়ক গুলো মাটির হওয়ায় কৃষকগন পাকা ধান কাটার পর খলায় আনতে গিয়ে চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে,একেই সাথে খরচ বেড়ে গেছে বলে কৃষকগন আমাদের কাছে অভিযোগ করছেন।
এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের সাথে কথা হয়েছে, এই সড়ক মেরামত ও পাকা করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে জানিয়েছেন। আর সড়ক পাকা হলে হাওরের গভীর থেকে ধান কেটে কৃষকগন সহজে খলায় আনতে পারতো খরচ ও কম হবে,এতে কৃষক লাভবান হবে।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আব্দুল মতিন খান জানান, হাওরের মাটির সড়ক গুলো চারারোপন থেকে পাকা ধান কেটে খলায় আনার জন্য কৃষকদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এবছর বৃষ্টি পাত বেশী হওয়ায় সড়ক গুলো বেশী খারাপ হওয়া কিছু মেরামতও করা হয়েছে। আর কৃষকদের সুবিধা জন্য পাকা করার জন্য এই বিষয় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
