গানের সুরে মিলে প্রাণের সন্ধান। আর সেই প্রাণের সন্ধানে সঙ্গীতের মহাসমুদ্রে চাষবাস করছেন বিথী। বিথী তার অন্তরের সন্ধানও করছেন কণ্ঠ ছেড়ে গান গেয়ে। গান গাইতে স্বাচ্ছন্ধ্য বোধ করা বিথী একজন জনপ্রিয় ও জননন্দিত সঙ্গীতশিল্পী হওয়ার লক্ষ্যে নিরলস সঙ্গীত সাধনা করে চলেছেন। গান গেয়েই বাকিটা জীবন কাটিয়ে দিতে প্রস্তুত সিলেটের অগণিত দর্শক-শ্রোতার প্রিয় সঙ্গীতশিল্পী বিথী।
পুরো নাম বিথী রাণী নাথ। সৌভাগ্যবান পিতা দিপেন্দ্র দেবনাথ ও মমতাময়ী মাতা দ্রৌপদী দেবনাথ-এর ঘর-সংসার আলোকিত করে সুনামগঞ্জ জেলায় বিথী জন্মগ্রহণ করেন ১৯৯৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর। দুই ভাই, এক বোনের মধ্যে সবার ছোট বিথী বিএসএস পরীক্ষা দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করেছেন। ২০০৫ সালে বিথী সঙ্গীতের মূল হাতেখড়ি নেন। পিতা দিপেন্দ্র দেবনাথ-এর কাছে সঙ্গীতে ‘সা, রে, গা, মা, পা, ধা, নি, সা’ শেখেন। তিনি তার গর্ভধারিণী মাতা দ্রৌপদী দেবনাথ-এর ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও প্রেরণায় গান নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। তিনি ২০০৯ সালে শেখ রাসেল জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার পর থেকে গানের বিভিন্ন রিয়েলিটি শোতে অংশগ্রহণ করা শুরু করেন। ২০১২ সালে পাওয়ার ভয়েস, ২০১৪ সালে চ্যানেল আই সেরাকণ্ঠ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তিনি দর্শক-শ্রোতা সমাজে দারুণ সাড়া জাগিয়েছিলেন। বিথীর অনেকগুলো গান ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত হয়েছে। তার জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে হলো- ‘কন্যা বিদায়’, ‘কিবা জাদু জানে রে বন্ধু, ‘বারাকুটি’, ‘তালইয়ের ঘরের ভাই’, ‘চাঁদবদনী কন্যা’ ও ‘রূপের বিয়াই’ উল্লেখযোগ্য। এসব প্রকাশিত গান দর্শক-শ্রোতাদের হৃদয়রাজ্য জয় করেছে। গানের কথা-সুর, সঙ্গীত ও কণ্ঠের সাবলীল মাধুর্য্যে বিথী স্বল্প সময়েই নন্দিত হয়েছেন।
গান গাওয়ার নেশায় অষ্টপ্রহর কাটানো বিথীর জীবনযাপন অন্য সকল মানুষের মতো নয়। সকল মানুষের মতো নয় তার স্বাভাবিক চলাচল। মাত্র দুই বছর বয়সে টাইফয়েড রোগে আক্রান্ত হয়ে বিথীর বাম পা দিয়ে চলাফেরায় সক্ষমতা হারান। সে সময় তার প্রিয় মা বিথীর হাতে হারমোনিয়াম তুলে দিয়ে বলেন, ‘বিথী তোর দুঃখ কষ্ট বিষাদ যন্ত্রণা ভুলিয়ে রাখবে গান, তুই গান গেয়ে মানুষের মন জয় করবি একদিন। গান তোকে শান্তি দেবে, সংগ্রাম করার সাহস যোগাবে’।
ছোটবেলায় বিথী তার পিতার কাছে তালিম নেবার পর জগন্নাথপুরের শিবু চক্রবর্ত্তী, সুনামগঞ্জের প্রীতিভূষণ চক্রবর্ত্তীর কাছে তালিম নেন। এরপর সিলেটের বিশিষ্ট নজরুল সঙ্গীতশিল্পী ও শিক্ষক হিমাংশু বিশ্বাস, দেশবরেণ সঙ্গীতজ্ঞ নকুল কুমার বিশ্বাস অর্জুন বিশ্বাস, আহম্মেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ও বারী সিদ্দিকীর কাছেও বিথী দীর্ঘদিন ধরে তালিম নিয়েছেন। এখনও গান শিখছেন তিনি। বাবা, মা, ভাই এবং পরিবারের সকল সদস্যের আন্তরিক উৎসাহে বিথী এগিয়ে চলেছেন মায়াময় সুরের খেয়ায়। সিলেটের নন্দিক সঙ্গীতশিল্পী বিথী বলেন, ‘সঙ্গীতশিল্পী না হলে তিনি ব্যারিস্টার হওয়ার চেষ্টা করতেন।’
সিলেটের অনেকগুলো নাটকে গান গাওয়া বিথী একটি গানের স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন। স্কুলের নাম হলো- ‘বিথী মিউজিক স্কুল’। এই স্কুলে বিথী আন্তরিক ভালোবাসা দিয়ে শিক্ষার্থীদের গান শেখান। বিথী বলেন, ‘সঙ্গীত হলো গুরুমুখী বিদ্যা। সঙ্গীত শিখতে হলে, জানতে হলে, বুঝতে হলে সঠিক গুরুর কাছে তালিম নিতে হয়। সঙ্গীত সাধনায় একাগ্রতা থাকতে হয়। সঙ্গীতকে হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করলে তবেই সঙ্গীত তার স্বমহিমায় আবির্ভূত হতে বাধ্য।
২০০৫ সালে শেখ রাসেল শিশু-কিশোর প্রতিযোগিতায় দেশাত্মবোধক গান ও নজরুল গীতিতে গান গেয়ে সম্মাননা অর্জন করেন বিথী। এছাড়া তিনি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে সফলতার সঙ্গে সম্মানজনক পুরস্কার অর্জন করেছেন। ২০০৫ সালে তিনি তার নিজ এলাকায় প্রথম মঞ্চে গান গেয়েছিলেন। তিনি তার মায়াময় স্নিগ্ধ কোমল কণ্ঠের সুরের মূর্ছনায় তখন হাজারো দর্শক-শ্রোতাকে মোহিত করেছিলেন। সেই মধুমাখা স্মৃতি আজও ভুলেননি বিথী। সে স্মৃতি তার জীবনপাতায় স্মরণীয় হয়ে রয়েছে এখনও। কিছুদিন আগে হাছন রাজা উৎসবে এবং সিলেটী উৎসবে (ঊ ঞ ঈ) সম্মাননা গ্রহণকারী বিথী বলেন, ‘আমি গান গেয়ে গেয়ে মানুষের মন জয় করতে চাই। সৃজনশীল মৌলিক লোকগীতি, গীত ও সিলেটের আঞ্চলিক ভাষার গানকে বিশ^সমাজে নান্দনিকতার আবহে তুলে ধরার অদম্য ইচ্ছা রয়েছে তার। সঙ্গীতের শৈল্পিক মহামিলনে ভ্রমণ করার স্বপ্ন সুরের মাঝি বিথী।
অসুস্থতাজনিত কারণে সঙ্গীতশিল্পী ও সঙ্গীত শিক্ষক বিথীর বাম পা-এ সমস্যা রয়েছে ছোটবেলা থেকেই। তিনি স্ক্র্যাচ দিয়ে চলাফেরা করে থাকেন। এই বিবর্ণতাকে নাগরিক সমাজের কিছু কিছু মানুষ অবহেলা এবং কটুক্তি করেন। এই অবহেলা ও কটুক্তিকে বিথী ভয় পান। বিষাদী কষ্টে অশ্রুপ্লাবনে ভাসেন। তখন তিনি সঙ্গীতের সাত রঙের বর্ণিলতাকে চোখের সামনে এনে এগিয়ে চলে দীপ্ত গৌরবে।
সিলেটের জননন্দিত সঙ্গীতশিল্পী বিথী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর নিকট আকুল আবেদন জানিয়ে বলেন, ‘আমার সঙ্গীতজীবনের পথচলা এবং পারিবারিক জীবনের অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নিতে আর্থিক সহায়তা করা জরুরি দরকার। মানবিক দিক সুবিবেচনা করে আমার প্রতি বর্তমান জনবান্ধব সরকার সহযোগিতার হাত প্রসারিত করবেন বলে দৃঢ় বিশ্বাস রাখি।
বিথীর প্রিয় ব্যক্তিত্ব তার গর্ভধারিণী মা দ্রৌপদী দেবনাথ। প্রিয় খাবার তার মায়ের হাতের যেকোন খাবার। যেকোন ধরণের পোশাক পরতে তার ভালো লাগে। প্রিয় গান ‘কন্যা বিদায়’। বসন্ত তার প্রিয় ঋতু। প্রিয় সঙ্গীতশিল্পীর তালিকায় রয়েছেন রুনা লায়লা ও শ্রেয়া ঘোষাল। ‘হাজার বছর ধরে’ চলচ্চিত্র তার খুব পছন্দ।
প্রেম-ভালোবাসার মহামিলনের সঙ্গীতের মহাসমুদ্রে বসবাসকারী বিথী রাণী নাথ তার কণ্ঠের নিবিড় সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ করুন কোটি কোটি দর্শক-শ্রোতার প্রাণ। গানের সুরেই মিলুক প্রাণের সন্ধান।
