স্বপ্নভঙ্গের করুণ গল্প, দরিদ্র পরিবারের শেষ ভরসাও নিভে গেল ভূমধ্যসাগরে

ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় ইউরোপগামী যাত্রা—কিন্তু সেই পথেই অনাহারে মৃত্যুবরণ করলেন সুনামগঞ্জের আরেক তরুণ। ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবি ও খাদ্যসংকটের ঘটনায় প্রাণ হারানোদের তালিকায় যুক্ত হয়েছেন ছাতক উপজেলার মহিবুর রহমান (২০)। তার মৃত্যুর খবর গ্রামে পৌঁছানোর পর শোকের মাতম নেমে এসেছে পুরো এলাকায়।

মহিবুর রহমান ছাতক উপজেলার ভাতগাঁও ইউনিয়নের ঘাগলাজুর গ্রামের বাসিন্দা। বাবা মো. নুরুল আমিন, মা মহিমা বেগম। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড় এবং রাজমিস্ত্রির কাজ করে পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। তার আয়েই চলত পুরো সংসার।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় চার মাস আগে গ্রিসে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি ছাড়েন মহিবুর। সৌদি আরব হয়ে লিবিয়া পৌঁছে দালালচক্রের মাধ্যমে ইউরোপ যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তাকে বিদেশে পাঠাতে প্রায় ১৩ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়—যার জন্য জমি বিক্রি ও সুদে টাকা ধার করতে হয়েছে।

গত ২১ মার্চ লিবিয়া থেকে একটি রাবারের নৌকায় করে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করেন মহিবুরসহ বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি। নৌকাটি পথ হারিয়ে গভীর সমুদ্রে ভেসে যায় এবং টানা ছয় দিন সাগরে থাকার সময় জ্বালানি, খাবার ও পানির সংকট দেখা দেয়। অনাহার ও তৃষ্ণায় একে একে অসুস্থ হয়ে পড়েন যাত্রীরা।

একই নৌকায় থাকা সুনামগঞ্জের আরেক যুবক মারুফ আহমদ, যিনি বর্তমানে গ্রিসের একটি শরণার্থী ক্যাম্পে আছেন, তিনি জানান—অনাহারে দুর্বল হয়ে প্রথমেই মারা যান মহিবুর রহমান। এরপর ধীরে ধীরে আরও অনেকের মৃত্যু হয়। সব মিলিয়ে ওই নৌযানে ২২ জন প্রাণ হারান, যাদের বেশিরভাগই সুনামগঞ্জের বাসিন্দা।

মহিবুরের মৃত্যুসংবাদ পরিবারে পৌঁছালে ভেঙে পড়েন তার স্বজনরা। মা মহিমা বেগম শোকে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন এবং শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছেন। ছোট ভাই অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। পুরো পরিবার এখন গভীর সংকটে।

মহিবুরের চাচাতো ভাই ও স্থানীয় ইউপি সদস্য মোহাম্মদ সুনু মিয়া বলেন, “পরিবারটি অত্যন্ত দরিদ্র। জমি বিক্রি করে, ঋণ করে ছেলেকে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল। এখন ছেলেও নেই, টাকাও নেই—সব শেষ হয়ে গেছে।”

বাবা নুরুল আমিনের আহাজারি থামছে না। তিনি অভিযোগ করে বলেন, দালালরা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নিরাপদ নৌযানের বদলে ঝুঁকিপূর্ণ প্লাস্টিকের বোটে তুলে দেয়। মাঝপথে খাবার-পানির সংকটে তার ছেলেকে না খাইয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

এই মর্মান্তিক ঘটনার পর দালালচক্রের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছে। ইতোমধ্যে সুনামগঞ্জের দিরাই ও জগন্নাথপুর থানায় ৯ জন দালালের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা দায়ের হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবৈধ পথে ইউরোপ যাওয়ার এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা বারবার প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। তবুও দারিদ্র্য আর স্বপ্নের তাড়নায় মানুষ একই পথে হাঁটছে।

ভূমধ্যসাগরের উত্তাল ঢেউ যেন আবারও মনে করিয়ে দিল—এই পথে পাড়ি মানেই অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, আর অনেক ক্ষেত্রে নিশ্চিত মৃত্যু।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন