
ঈদ-উল-আযহায় পশু কেনা-বেচা সহজ ও স্বাচ্ছ্যন্দময় করতে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার সীমান্ত এলাকায় ৪টি অস্থায়ী পশুর হাট স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু হাট গুলোতে আসা ক্রেতাগন অতিরিক্ত হাসিল (খাজনা)সহ চরম দুর্ভোগ ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান,হাট গুলো ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়নি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) যোগসাজশে একটি সিন্ডিকেটকে সুবিধা দিতেই এই লুকোচুরি করেছেন।
পশুর হাট গুলো হচ্ছে-উপজেলার ভারত সীমান্ত ঘেঁষে বাদাঘাট ইউনিয়নের লাউড়েরগড়,শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নের কলাগাও,বড়দল উত্তর ইউনিয়নের শান্তিপুর ও বড়দল দক্ষিণ ইউনিয়নের একতা বাজার।
হঠাৎ করেই গত শুক্রবার(২৩ মে) বড়ছড়া বাজারে আরেকটি পশুর হাট বসিয়ে পশু কেনা-বেচা শুরু করেছে আরেকটি পক্ষ। সবগুলো পশুর হাটই ভারত সীমান্ত ঘেঁষে অবস্থিত।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলার লাউড়েরগড় পশুর হাটটি ১৮ হাজার টাকা, একতা বাজার পশুর হাটটি ২০ হাজার টাকা, কলাগাঁও বাজার পশুর হাটটি ২৮ হাজার টাকা ও শান্তিপুর পশুর হাটটি ৪৮ হাজার ১০০ টাকায় ইজারা প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু এই সব বাজারের মূল্য কম হলে ৮- ১০ লক্ষাধিক টাকার বেশি বলে জানিয়েছেন বাজার গুলো পাশের স্থানীয় এলাকাবাসী। যারা ইজারা পেয়ে তারা সবাই বিএনপি নেতা ও বিভিন্ন পদ রয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে,এ সকল পশুর হাট নামমাত্র মূল্যে সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের ইজারা দেওয়া হয়েছে। পশুর হাটের ইজারার বিষয়টি না জানায় ইচ্ছুক অনেকেই ইজারায় অংশ নিতে পারেননি। কিন্তু গত দুই দিন থেকে উচ্চ হারে গরু প্রতি ১৫০০ টাকা থেকে ২০০০ টাকা ইজারা আদায় হচ্ছে। একটি বাজারেও ইজারা আদায়ের দৃশ্যমান কোনো সাইনবোর্ড বা তালিকা নেই। কোরাবানির পশু কেনা বেচাকে কেন্দ্র করে এমন অনিয়মের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ক্রেতারা।
এসব নিয়ে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তাছাড়া প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আমিন উর রশিদ গত ৩ মে সচিবালয়ে তাঁর সভা কক্ষে সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, অবৈধভাবে পশু প্রবেশ ঠেকাতে এবং দেশীয় খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় এবার সীমান্তবর্তী এলাকায় কোনো পশুর হাট ইজারা দেওয়া হবে না। তবে মন্ত্রীর এই ঘোষণা শুধু ঘোষণা হিসেবেই থাকছে,সুনামগঞ্জে সেটা কার্যকরের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান উপজেলা প্রশাসন কোনো ধরণের প্রচারণা ছাড়াই অস্থায়ী হাটগুলো ইজারা দিয়েছে নামমাত্র মূল্যে। সবগুলো পশুর হাটই উপজেলা বিএনপির নেতাকর্মীরা ইজারা পেয়েছেন।
একেই কায়দায় উপজেলার বৃহত্তর বাজার বাদাঘাট বাজারের পশুর হাটিও চলছে নামে খাস কালেকশন বলা হলেও নিয়ন্ত্রণ করছে একটি রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীগন বলে জানাগেছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ সরকার দলীয় একটি পক্ষকে সুবিধা দিতেই এমন লুকোচুরি হয়েছে পশুর হাট ইজারায়। এছাড়াও উপজেলার বাদাঘাট বাজার পশুর হাট নিয়েও লুকোচুরি খেলায় রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।
অভিযোগ উঠেছে, আনুমানিক ৮ লাখ টাকা মূল্যের এই চারটি হাট মাত্র ১ লাখ ১৪ হাজার ১০০ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে। কোনো ধরনের দরপত্র বিজ্ঞপ্তি বা ব্যাপক প্রচারণা ছাড়াই কেবল ‘মৌখিক প্রচারের’ মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও তাদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের এসব হাট দেওয়া হয়। ইজারাদারদের মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতাগন।
অনিয়মের চিত্র এখানেই শেষ নয়; হাটে খাজনা আদায়ের তালিকা সংবলিত কোনো সাইনবোর্ড নেই। ছিলানী তাহিরপুর গ্রামের আব্দুল আলীম বলেন, ‘গত বছর গরুর হাসিল (খাজনা) ছিল ৪০০ টাকা। এবার কলাগাঁও হাটে নেওয়া হচ্ছে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত। রশিদে কেনা দাম লিখলেও হাসিলের (খাজনা) পরিমাণ লেখা হচ্ছে না। ভুক্তভোগীরা একে সরাসরি ‘চাঁদাবাজি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে কলাগাঁও হাটের ইজারাদার আজিজুর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন,আমরা নিয়ম মেনেই হাট ইজারা নিয়েছি এবং নির্ধারিত হারেই খাজনা আদায় করছি। রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ সঠিক নয়।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান মানিক বলেন,অস্থায়ী পশুর হাটগুলো বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমেই ইজারা দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞপ্তির প্রচার না হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন,অনুমতি পাওয়ার পর একদিনের মৌখিক প্রচারের মাধ্যমে ইজারা দেওয়া হয়েছে। তবে এসব হাট পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার সুযোগ থাকে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।