টাঙ্গুয়ার হাওরে মাছের ‘অর্ধেক’ প্রজাতি ‘বিলুপ্তের’ নেপথ্যে কী

জীব-বৈচিত্র্যের সঙ্কটে থাকা দেশের দ্বিতীয় বিশ্ব ঐতিহ্য টাঙ্গুয়ার হাওরে প্রায় দুই দশকে ‘অর্ধেক’ প্রজাতির মাছই বিলুপ্ত হয়ে গেছে- মাঠ পর্যায়ের গবেষণায় এমন আভাস মিলেছে।

গবেষকরা বলছেন, অবৈধভাবে ‘চায়না দুয়ারি জাল’ ও ‘কিরণমালা চাঁই’ ব্যবহার, ইলেকট্রিক শক দিয়ে মাছ ধরা, হাওরের সংরক্ষিত এলাকায় পর্যটন ও বাণিজ্যিক নৌযান চলাচলের ফলে দূষণ, বিষের ব্যবহার, হাওরপাড়ে ব্যক্তি মালিকানাধীন হাঁসের খামার বেড়ে যাওয়ায় দেশি মাছের প্রজাতি দিনকে দিন নির্বংশ হচ্ছে।

এর ফলে গোটা হাওরের বাস্তুসংস্থান হুমকির মুখে পড়েছে; যাতে অন্যান্য প্রাণী ও জীববৈচিত্রের ওপরও প্রভাব পড়ছে। সঙ্কটের কারণে এখন টাঙ্গুয়ার হাওরে শীতের সময় পাখি আসাও বহুলাংশে কমে গেছে।

সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক মৃত্যুঞ্জয় কুণ্ডু তার ২০২৪ সালের একটি গবেষণার বরাতে বলছিলেন, “তখন আমরা টাঙ্গুয়ার হাওরে ৭৬টা প্রজাতির মাছ পেয়েছি। তবে সব প্রজাতি সচরাচর এবং সব জায়গায় পাওয়া যাচ্ছে এমন না। সব জায়গায় হয়ত ৩৫ থেকে ৪০টা প্রজাতি আছে। বাকিগুলো বিরল, খুব কম দেখা মেলে।

“এর আগে ২০২২ সালে ৯৩টা পেয়েছিলাম। এটাও কিন্তু একটা নির্দেশক। আস্তে আস্তে মাছের প্রজাতি কমে যাচ্ছে। এর আগে প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক জোট-আইইউসিএন ২০০৭ সালে একটা গবেষণায় দেখিয়েছে, ১৪১টা প্রজাতির মাছ আছে। তারা ২০১৫ সালে পেয়েছিল ১৩৪টি প্রজাতি। তার মানে, অনেক অল্প সময়ের ভিতরে ব্যাপকভাবে কিন্তু এই মাছ গুলো হারিয়ে যাচ্ছে।’’

আইইউসিএন এর ২০১৫ সালের সর্বশেষ ‘রেড ডাটা বুকে’ মাছের পাশাপাশি পাখি, সরীসৃপ, উভচর প্রাণী ও উদ্ভিদের তথ্যও দিয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, সেখানে ১৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ২১৯ প্রজাতির দেশি ও বিদেশি পরিযায়ী পাখি, ২৪ প্রজাতির সরীসৃপ, আট প্রজাতির উভচর প্রাণী এবং ১০৪ প্রজাতির উদ্ভিদ পাওয়া গেছে।

কিন্তু এক দশক পরে এসে সেই চিত্র অনেকাংশেই বদলে গেছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব, আইইউসিএন, ওয়ার্ল্ড বার্ড মনিটরিং ও বাংলাদেশ বন বিভাগের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত পাখি শুমারির তথ্য অনুযায়ী, টাঙ্গুয়ার হাওরে ৪৯ প্রজাতির ৪৩ হাজার ৫১৬টি পাখি বিচরণ করছিল। ১০ বছরের পরিসংখ্যানে টাঙ্গুয়ার হাওরে ৭৭ শতাংশ দেশি ও পরিযায়ী পাখি এখানে আসাই বন্ধ করে দিয়েছে।

‘নয় কুড়ি কান্দা, ছয় কুড়ি বিল’
সুনামগঞ্জের স্থানীয় মানুষের কাছে টাঙ্গুয়ার হাওর ‘নয় কুড়ি কান্দা, ছয় কুড়ি বিল’ নামে পরিচিত। অর্থাৎ মধ্যনগর ও তাহিরপুর উপজেলার মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই হাওরটি ১৮০টি কান্দা আর ১২০টি বিলের সমন্বয়ে তৈরি। দুই উপজেলার ১৮টি মৌজায় ৯ হাজার ৭২৭ হেক্টর এলাকা নিয়ে টাঙ্গুয়ার হাওর জেলার সবচেয়ে বড় জলাভূমি। এর মধ্যে পানিবহুল মূল হাওর ২৮ বর্গকিলোমিটার আর বাকি অংশ গ্রাম ও কৃষিজমি। শীত মৌসুমে পানি শুকিয়ে গেলে এখানকার বিলের পাড় (স্থানীয় ভাষায় কান্দা) জেগে ওঠে। তখন শুধু কান্দার ভেতরের অংশেই ‘আদি বিল’ থাকে। আর শুকিয়ে যাওয়া অংশে কৃষকরা রবিশস্য ও বোরো ধানের আবাদ করেন।

দীর্ঘ ৬০ বছরের ইজারা প্রথা বাতিল করে ১৯৯৯ সালে টাঙ্গুয়ার হাওরকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরে ২০০০ সালের ২০ জানুয়ারি এই হাওরকে ‘রামসার সাইট’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। আইইউসিএন এই হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কাজ করছে।

হাওর এলাকার মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন, সম্পদ সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও সুইজারল্যান্ড সরকারের মধ্যে ২০০১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। ২০০৩ সাল থেকে টাঙ্গুয়ার হাওরটি সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে আছে। একজন নির্বাহী হাকিমের নেতৃত্বে পুলিশ ও আনসার সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করেন।

গত বছরের ১৩ মে ঢাকায় ‘কমিউনিটি-ভিত্তিক টাঙ্গুয়ার হাওর জলাভূমি ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক একটি নতুন প্রকল্পের উদ্বোধন হয়। পাঁচ বছর মেয়াদী এই প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ দশমিক ০৫ মিলিয়ন ডলার; যা টাকার অংকে দাঁড়ায় প্রায় ৫০ কোটি টাকা। প্রকল্পের অর্থায়ন করছে গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি-জিইএফ। বাস্তবায়ন করবে পরিবেশ অধিদপ্তর, তত্ত্বাবধানে থাকছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি-ইউএনডিপি।

এই প্রকল্পের লক্ষ্য টাঙ্গুয়ার হাওরের জলাভূমি ও ‘বাস্তুতন্ত্রের’ টেকসই ব্যবস্থাপনা, বন ও জলজ পরিবেশ পুনরুদ্ধার এবং স্থানীয় জনগণের জন্য পরিবেশবান্ধব জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি করা। যার প্রধান কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে এক হাজার ৫০০ হেক্টরের বেশি বন ও জলজ বাসস্থান পুনরুদ্ধার, জীব-বৈচিত্র্য অভয়ারণ্য স্থাপন, নারী-সহনশীল মাইক্রো-এন্টারপ্রাইজ সহায়তা, জলাভূমি-ভিত্তিক কৃষি ও মাছচাষ এবং দায়িত্বশীল পর্যটনের প্রসার ঘটানো।

দেশি মাছের আকাল
টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের বাজারগুলো এক সময় হাওর-বিলের নানা রকমের দেশীয় মাছে ভরপুর ছিল। এসব বাজার থেকে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মাছ যেত। বর্তমানে দেশীয় মাছ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। বর্ষাকালে বাজারে মেলে চাষের পাঙ্গাস, কৈ আর তেলাপিয়া মাছ। তবে শীত মৌসুমে দেশীয় ছোট মাছের কিছুটা দেখা মেলে বাজারে।

মৎস্য অধিদপ্তর সুনামগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ১৩৭টি হাওর, ২৬টি নদী এবং ২০৭৬৯টি পুকুর রয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪৯টি পুকুরে নিয়মিত মাছ চাষ হয়। নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় এক লাখ ২১ হাজার ৭৪৩ জন। হাওর ও জলাশয় থেকে বছরে প্রায় ৩৮ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপন্ন হয়। চলতি অর্থবছরে জেলার মাছের বাজারমূল্য ১৪০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

হাওরপাড়ের পাঠাবুকা গ্রামের রিপছান হাবীব বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওরের ‘আলমের ঢোয়ার’ বিলে একসময় চিতল মাছের বসবাস ছিল; সঙ্গে ছিল ‘নানীদ’ ও ‘বাঘআইড়’- এই মাছগুলো এখন বিলুপ্ত বললেই চলে। এ ছাড়া হাওরের রূপাভই, তে-ক্ষুইন্ন্যা, চটাইন্ন্যা, হাতির গাদা- এসব বিলে রুই, কাতলা, মহাশোল, নানীদ এসব মাছে ভরপুর ছিল। এখন আর এই মাছগুলো চোখে দেখা যায় না। তিনি বলেন, “কাকিয়া (কাকিলা) মাছ ভাসান পানিতে অহরহ ঘুরে বেড়াত এখন আর নেই। কাংলা মাছও পাওয়া যায় না।”

হাওরপাড়ের ৪১টি গ্রামের জেলেদের নিয়ে গঠিত ‘টাঙ্গুয়ার হাওর কেন্দ্রীয় সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক আহম্মদ কবির বলেন, “অনেকদিন ধরেই এসব হচ্ছে, দেশি মাছের আকাল। আগে আমরা এক পট চাল দিয়ে পাঁচমিশালি ছোট দুই পট মাছ পেয়েছি। সেই আমরা এখন চাষের মাছের উপর নির্ভরশীল। এই হচ্ছে হাওরের অবস্থা।’’

হাওরপাড়ের জয়পুর গ্রামের বাসিন্দা হুমায়ুন কবির (৫৫) বলেন, “হাওরই তো শেষ। বর্ষাকালে বড় বড় কোনাজাল নিয়ে এসে হাওরের মাছ ধরা হচ্ছে। আমরা আগে মাছ মেরে খেয়েছি, এখন মাছ পাই না। অতীতে আমরা প্রচুর পরিমাণ মাছ মেরে নিজে খেয়েছি, বাজারে বিক্রি করে সংসার চালিয়েছি। এখন সেই দেশি মাছ নেই।”

তবে মৎস্য গবেষক অধ্যাপক মৃত্যুঞ্জয় কুণ্ডু বলছিলেন, “একটা সুখের কথা বলি। দুই-একটা মাছ আবার রিগেইন করছে। যেমন- বামোশ মাছ। এর আগে যখন আমরা গবেষণা করেছি, মানুষজন বলেছে যে, বহু বছর এই মাছটা পাওয়া যায় না।

“কিন্তু গত বছর আমি যে গবেষণা করেছি, ওখানে দেখেছি বামোশ মাছ পাওয়া যাচ্ছে। আবার রানী মাছ বা অন্যান্য মাছ কিছু কিছু যেগুলো কম পাওয়া যেত ইদানিং একটু বেশি পাওয়া যাচ্ছে। তবে প্রজাতির সংখ্যাটা আসলে আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে।’’

‘থাকি হাওরে, খাই পাঙাস’
হাওরপাড়ের মানুষদের প্রতিটি বাড়িতে আগে বাঁশ ও বেত দিয়ে তৈরি মাছ রাখার ‘চোপড়া’ পাওয়া যেত। এ নিয়েই মানুষ বাজারে যেতেন; ছোট-বড় মাছ কিনে আনতেন। এখন সেই ‘চোপড়া’ আর দেখা যায় না। কারণ, হাওরের মানুষ বাজার থেকে রশি দিয়ে বেঁধে পাঙাস, তেলাপিয়া, সিলভার কার্প বা কর্প জাতীয় মাছ কিনে বাড়ি ফেরেন।

আক্ষেপ করে ‘টাঙ্গুয়ার হাওর কেন্দ্রীয় সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক আহম্মদ কবির বলছিলেন, “আমরা থাকি হাওরপাড়ে, কিন্তু হাওর-বিলের মাছ আমরা খেতে পারি না। খাই পুকুরের চাষ করা পাঙাস আর তেলাপিয়া। অধিকাংশ দরিদ্র মানুষ এখানে পাঙাস মাছের উপর নির্ভরশীল।

পাঠাবুকা গ্রামের রীপছান হাবিব বলেন, “বর্তমানে আমরা হাওরপাড়ের মানুষ চাষের মাছের উপর নির্ভরশীল। পাঙাশ, তেলাপিয়া, কৈ, সিলভার এসব দিয়ে চাহিদা মিটাচ্ছি, তাও পর্যাপ্ত পাওয়া যায় না। কারণ, চাষের বড় মাছটাও শহরে চলে যায়।”

এমন অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন হাওরপাড়ের অনেক মানুষই। একটু বয়স্ক বয়সের মানুষের কাছে বসলে, ৩০-৪০ বছর আগেও হাওরে যে ব্যাপকভাবে ছোট-বড় দেশি মাছ মিলত তার গল্প শোনা যায়। হাওরে শীত বা বর্ষাকালে মাছ ধরার বেশ কিছু সনাতনি উৎসবও রয়েছে; যা এখন প্রায় বিলুপ্তের পথে।

অস্ত্রের নাম ‘চায়না দুয়ারি’, ‘কিরণমালা চাঁই’
সারাদেশের মত হাওরেও বিস্তার ঘটেছে চায়না দুয়ারি জালের; যা মাছের জন্য ক্ষতিকর এবং সরকারিভাবে নিষিদ্ধ। এই জালে মূলত ছোট ছোট মাছ আটকা পড়ে। একইভাবে আলোচনায় এসেছে চিংড়ি মাছ ধরার ‘কিরণমালা চাঁই’; যেটা দীর্ঘ সময় ধরে পানির নিচে তাকলেও সাধারণ পচে না। এ ছাড়া ইলেকট্রিক শক দিয়ে মাছ মারার প্রবণতাও হাওরে লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলে পরিবেশ-সংশ্লিষ্টরা বলছেন। তারা মনে করেন, যারা হাওরের দেখভালের দায়িত্বে আছেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ এসব অসৎ কাজের সহযোগিতা করে থাকেন।

স্থানীয় সংগঠক আহম্মদ কবির বলেন, “কয়েক বছর ধরে আমরা দেখতে পাচ্ছি হাওরে শীত মৌসুমে প্রতিটি বিলে ইলেক্ট্রিক শক মেশিন দিয়ে মাছ মারা হয়েছে। এ ছাড়া বিল শুকিয়েও বিষ প্রয়োগ করে মাছ মারা হয়। হাওরে থাকা গাছ, জলারবন কেটে নেওয়া হয়। শীত মৌসুমে পরিযায়ী পাখিও মারা হয়। এ ছাড়া শীত-বর্ষায় হাওরে কোজান জাল, বেড় জাল, কারেন্ট জাল, ‘চায়না দুয়ারি’ নামের এক প্রকার মাছ ধরার ফাঁদ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।”

একই কথা বললেন জয়পুর গ্রামের হুমায়ুন কবির (৫৫)। তিনি বলেন, “আগামী মাস থেকে হাওরে ‘চায়না দুয়ারি’ দিয়ে মাছ ধরা শুরু হবে। মূলত যারা দায়িত্বে আছেন, তারাই হাওরটি শেষ করেছেন। আমরা তো বাধা দিতে পারি না। দেখা গেছে মধ্যনগর থেকে বড় ইঞ্জিন নৌকা এসে মাছ মেরে নিয়ে যায়। তাদের বাধা দিলে আমাদের নিয়ে হাসাহাসি করে।’’

আরেক জেলে বলছিলেন, “চিংড়ি মাছ মারতে ‘কিরণমালা চাঁই’ ব্যবহার করা হচ্ছে অবাধে। এটি সব ধরনের প্রাণীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, এটির ভেতরে গেলে আর বের হতে পারে কোনো প্রাণী। ‘কিরণমালা চাঁই’ পচে না, শুকনো মৌসুমে ধান চাষের সময় জমিতে পাওয়া যায়।”

পরিযায়ী পাখি কম আসছে
এক সময় হাওরটি ছিল বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আবাসস্থল। সেখানে দিন দিন কমছে পাখিদের সংখ্যাও। শীত মৌসুমে আসা অতিথি পাখি দীর্ঘদিন ধরে শিকার করা হচ্ছে বিভিন্ন কৌশলে। এজন্য ব্যাপকভাবে পাখি কমছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বন্যপ্রাণী গবেষক সীমান্ত দীপু ২০২৫ সালের জরিপের বরাতে বলেন, “২০ বছরের মধ্যে এ বছর সবচেয়ে কম পরিযায়ী পাখি এসেছে। প্রতি বছরের জানুয়ারি মাসে যেখানে পাখি আসে ৫০ হাজার আর ফেব্রুয়ারিতে আসত দেড় লাখ পাখি; সেখানে এ বছর ২২ হাজার ৬০০ পাখি এসেছিল।’’

তিনি বলেন, “হাওরে চায়না দুয়ারি জাল, কারেন্ট জাল ব্যবহার ও বিষটোপ দিয়ে পাখি মারা হয়। আর রাতের বেলা হাওরে মাছ ধরার ট্রলারের চলাচল। হাওরে অবাধে গরু চরানো, পালা হাঁসের পরিমাণ বৃদ্ধি, পলি পড়ে বিলের পানি শুকিয়ে যাওয়া এসব কারণেও পাখি আসা কমেছে।’’

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে যেখানে প্রায় ৬০ হাজার পাখি ছিল। ২০২২ সালে সেখানে মাত্র ২৭ হাজারের কিছু বেশি পাখি দেখা গেছে। রাতে ট্রলার চালিয়ে মাছ ধরা এবং ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের আলোও পাখিদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নষ্ট করছে। মাঝে-মধ্যে উপজেলা প্রশাসন অভিযান চালালেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। জ্বালানির জন্য বন ধ্বংস এবং শুকনা মৌসুমে অন্য এলাকা থেকে আসা মহিষ ও গরুর অবাধ বিচরণও বনের পাশাপাশি পাখির আবাসস্থল নষ্ট করছে।

‘প্রধান কাজ স্থায়ী অভয়ারণ্য’
মৎস্যবিজ্ঞানী অধ্যাপক মৃত্যুঞ্জয় কুণ্ডু বলেন, “টাঙ্গুয়ার হাওরের টোটাল বায়োডাইভারসিটিকে আবার পুনরুদ্ধার করতে বা এখন যে অবস্থায় আছে সে অবস্থায় রাখতে চাই; তাহলে একটি প্রধান কাজ করতে হবে। সেটা হচ্ছে- আমাদের পাঁচটি মূল বিল আছে, সেগুলোকে ‘স্থায়ী অভয়ারণ্য’ ঘোষণা করা। এই পাঁচটা বিল যেন সংরক্ষিত অবস্থায় থাকে এবং কেউ যেন এই সেখানে মাছেদের বিরক্ত না করে। এটা হলো সবচেয়ে জরুরি একটা ইস্যু।

তিনি জানান, ‘‘হাওর দিয়ে কয়লা, পাথর-বালু পরিবহন হচ্ছে; প্রচুর পরিমাণে বেড়েছে হাউজবোট। এতে পানিতে প্রচুর এজিটেশন হচ্ছে এবং মানুষ বর্জ্য ফেলছে। এতে পানি-পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। কী পরিমাণ হাউজবোট এলাউ করলে হাওরে সবচেয়ে কম পরিমাণ ক্ষতির কারণ হবে সেটা একটা পরীক্ষামূলকভাবে আমরা এটা করতে পারি।”

ড্রেজিং করাতে হবে
সারাবছর পানি থাকে এ রকম বিলের সংখ্যা কমে গেছে। টাঙ্গুয়ার হাওরে ১৮০টা বিল আছে। ১৮০টা বিলের ভেতর হয়ত সারাবছর পানি থাকে ৭০-৮০টা বিলে। বাকিগুলো শুকিয়ে যায়। পানি ধরে রাখতে বিলগুলো ড্রেজিং করাতে হবে। শুধু বিলে না। বিলের সঙ্গে যুক্ত নদী এবং তার শাখা-প্রশাখা আছে; সেগুলো হাওরের প্রাণ। এগুলোও ড্রেজিং করতে হবে। এটা মাছ, পাখি ও জীববৈচিত্র্যের জন্য খুব জরুরি।

এ ছাড়া অপরিকল্পিতভাবে যেন রাস্তা না করা হয়। যেখানে পানি আছে সেখানে রাস্তাগুলো ফ্লাইওভারের মত এবং যেখানে মাটি আছে সেখানে মাটি দিয়ে রাস্তাগুলো করা যাবে। আর রাস্তাগুলোতে প্রচুর পরিমাণে কালভার্ট এবং সেতুর ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে পানি কমে গেলে মাছ চলাচল করতে পারে।

বিলুপ্ত প্রজাতি ফিরিয়ে আনা
মাছের যে প্রজাতি কমে গেছে সেগুলোকে ‘বিল নার্সারির’ মাধ্যমে ফিরিয়ে আনতে হবে। তারপরে হাওরের অনেক জায়গায় আছে আগাছা বা জলারবন। আগাছাও কিন্তু ব্যাপকভাবে কমে যাচ্ছে। আগাছা মাছের জন্য এক প্রকার ‘এ’ প্রোটিন ভেজিটেশন। হিজল-তমাল-করচ বাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এটা মাছের আশ্রয় এবং খাদ্যের জোগান দেয়।

শীতে পানি দূষণ বেশি
কয়লা পরিবহনের কারণে শীতে পানি বেশি দূষিত হচ্ছে। কয়লা উঠা-নামার পর পানিতে বস্তা ধুয়া হয়। সেই পানি হাওরে চলে যায়। এটা মারাত্মক। কার্গোগুলো কিন্তু প্রচুর কয়েল নিঃসরণ করে।

মৎস্য গবেষক মৃত্যুঞ্জয় কুণ্ডু বলেন, “বিশেষ করে আমরা গতবার যেটা দেখেছি, টাঙ্গুয়ার হাওর থেকে যে বউলাই নদী বেরিয়ে এসেছে, সেই বউলাই নদীটা আবার এসে রক্তি নদীতে মিশেছে। রক্তি নদী এসে মিশেছে আবার সুরমা নদীতে। এটা চক্রের মত।

“গত শীতে দেখেছি, রক্তি ও বউলাই নদীর পানি একেবারে পুরো কালো হয়ে গেছে। এটা আমাদের মাছের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকারক। এগুলোর উপরও আসলে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে। এখন তো যোগাযোগ ভাল। কিছু দূর নৌকায় এনে পরে সড়ক পথে নিয়ে গেলেন। তাহলেও হাওরের মাছ বাঁচবে।”

হাওরের পানি ধারণ ক্ষমতা কমেছে
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. আবুল কাশেম বলেন, “সিলেট অঞ্চলে ২১টা নদী আছে। হাওরের মধ্যে যে ২১টা নদী ওই পাড় (ভারত) থেকে ঢুকেছে। এই নদীগুলো দিয়ে যে পানি চলে আসে ভারত থেকে সেই পানিটা বের হওয়ার একমাত্র রাস্তা হচ্ছে তিতাস, পুরাণ ব্রহ্মপুত্র এবং মেঘনা। ভৈরবের ওই অঞ্চলে উঁচু হয়ে গেছে। একদিকে পানি ধারণ ক্ষমতা কমে গেছে আরেকদিকে উঁচু হয়ে গেছে। ফলে প্রায় প্রতি বছরই এখন বন্যা কবলিত হচ্ছে মানুষ। সব উদ্যোগ যদি সমন্বিতভাবে না নেওয়া হয়। তাহলে হাওরের জনগণের দুর্দশা মিটবে না।’’

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন