তারেক রহমানসহ যেসব নেতা বীরের বেশে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসেন

শাসকগোষ্ঠীর হাতে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের জুলুম, নির্যাতন, অত্যাচার ও নিপীড়নের ঘটনা বিভিন্ন দেশে সাধারণ চিত্র। বিশেষ করে উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশে এসব ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। এই খড়্গ ও দমন-পীড়ন থেকে বাঁচতে অনেক নেতাই পাড়ি জমান বিদেশে। স্বেচ্ছা বা জোরপূর্বক নির্বাসনে গিয়ে কেউ কেউ ফেরেন বীরের বেশে, বসেন মসনদে।

পৃথিবীতে এমন অনেক নেতা আছেন যারা রাজনৈতিক পরিস্থিতি বা সামরিক অভ্যুত্থানের কারণে দেশত্যাগে বাধ্য হয়ে নির্বাসিত জীবন কাটিয়েছেন। আবার অনেকে বছরের পর বছর কারাগারে বন্দি ছিলেন। তাদের মধ্যে সর্বশেষ বীরদর্পে দেশে ফিরে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়েছেন তারেক রহমান। তার নেতৃত্বাধীন বিএনপি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে।

লন্ডনে দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরেই তিনি অভূতপূর্ব সংবর্ধনা পান। এরপর মাত্র দেড় মাসের প্রচেষ্টায় তিনি তার দলকে এনে দিয়েছেন ভূমিধস বিজয়। তার ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই কেমন ছিল, একটু দেখে নেওয়া যাক।

তারেক রহমান

দেশের অন্যতম আলোচিত ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তারেক রহমান। তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ সন্তান।

২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বেশ কয়েকজন শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তারেক রহমানকেও গ্রেফতার করা হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে থাকা অবস্থায় তাকে অমানবিক নির্যাতন করা হয়। একপর্যায়ে ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি মুক্তি পান এবং চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান।

লন্ডনে প্রায় ১৭ বছর নির্বাসনে ছিলেন। এই সময়ে আওয়ামী লীগ প্রধান ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার জুলম-নির্যাতম ও দমন-পীড়নের মাত্রা এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে তারেক রহমানের দেশে ফেরাতো দূরের কথা, বিএনপি ও অন্য রাজনৈতিক দলের বহু নেতা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। একে একে দেশে ফেরেন বহু রাজনীতিক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী। জনগণ ফিরে পায় ভোটাধিকার। এক পর্যায়ে ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার দল বিএনপি নিরঙ্কুশ জয় পায় এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।

বেনজির ভুট্টো

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে শিক্ষাজীবন শেষ করে ১৯৭৭ সালে জন্মভূমি পাকিস্তানে ফেরেন বেনজির ভুট্টো। কিছুদিন পরই ক্ষমতা দখল করেন সেনাশাসক জিয়া উল হক। ওই বছর প্রেসিডেন্ট জিয়ার সময় বেনজিরের বাবা জুলফিকার আলী ভুট্টোকে একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। এরপরই পাকিস্তানের রাজনীতিতে পা রাখেন বেনজির।

জিয়া উল হকের সরকার তাকে বহুবার গ্রেফতার করে। দমন-পীড়ন থেকে বাঁচতে বেনজির ১৯৮৪ সালে লন্ডন চলে যান ও ১৯৮৬ সালে দেশে ফেরেন। সরকারবিরোধী আন্দোলনে বেনজির জনমত গঠন করেন এবং ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে মুসলিম বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। ১৯৯০ সালের ৬ আগস্ট তিনি বরখাস্ত হন।

১৯৯৩ সালের নির্বাচনে তিনি আবার জয়লাভ করেন ও দ্বিতীয়বারের মতো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের ৬ নভেম্বর তাকে পুনরায় বরখাস্ত করা হয়। পরে ১৯৯৭ সালের নির্বাচনে তিনি হেরে যান।

আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ মুসাভি খামেনি

আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ মুসাভি খামেনি ছিলেন একজন ইরানি ধর্মীয় নেতা, রাজনীতিবিদ, রাজনৈতিক তত্ত্ববিদ ও বিপ্লবী। মাত্র দুবছর বয়সে তার বাবাকে হত্যা করা হয়েছিল। মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভির হোয়াইট রেভল্যুশন বা শ্বেত বিপ্লবের বিরোধিতা করায় ১৯৬৪ সালে তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে তুরস্কের বুর্সায় নির্বাসিত করা হয়।

এর পর রুহুল্লাহ খামেনি ১৪ বছরেরও বেশি সময় নির্বাসিত জীবন কাটান। এই সময়ের সিংহভাগ তিনি ইরাকে অতিবাহিত করেন এবং তুরস্ক ও ফ্রান্সেও কিছুদিন ছিলেন। তিনি তুরস্কের বুর্সায় ১৯৬৪-১৯৬৫, ইরাকের নাজাফে ১৯৬৫-১৯৭৮ এবং ফ্রান্সের নফেল-লে-শাতো-তে ১৯৭৮-১৯৭৯ বসবাস করেছিলেন। নির্বাসিত জীবনেই তিনি তিলে তিলে গড়ে তোলেন ইসলামি বিপ্লব।

তিনি ছিলেন ইরানের ইসলামি বিপ্লবের প্রধান নেতা, যার মাধ্যমে মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভি ক্ষমতাচ্যুত হন এবং ইরান একটি ধর্মতান্ত্রিক ইসলামি প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত হয়। শাহের সরকারের পতনের পর ১৯৭৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি বীরের বেশে ইরানে ফেরেন খামেনি।

রুহুল্লাহ খামেনি ইরানে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯৭৯ সাল থেকে ১৯৮৯ সালে তার মৃত্যু পর্যন্ত দেশটির প্রথম সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

নেলসন ম্যান্ডেলা

দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা আক্ষরিক অর্থে দেশের বাইরে নির্বাসিত ছিলেন না, তবে ২৭ বছর কারাবন্দি থাকা অবস্থায় তাকে রাজনৈতিকভাবে নির্বাসিত হিসেবেই দেখা হয়। ১৯৯০ সালে মুক্তি পাওয়ার পর চার বছরের ব্যবধানে ১৯৯৪ সালের প্রথম অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

এছাড়া ফ্রান্সের নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ও চার্লস ডি গল, রাশিয়ার ভ্লাদিমির লেনিন, মিয়ানমারের অং সান সু চি প্রমুখ নেতা নির্বাসন বা বন্দিত্বের পর ফিরে এসে দেশের শীর্ষ ক্ষমতায় আসীন হয়েছিলেন।

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া ও ব্যক্তিগত প্রোফাইল।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন