- Dainiksylhet.com - https://dainiksylhet.com -

ট্রাম্পের ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতি’র প্রস্তাবে জেলেনস্কির সমর্থন, নীরব রাশিয়া

ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা বন্ধে ‘অবিলম্বে কার্যকর’ যুদ্ধবিরতির দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, রাশিয়া রাজি হলে কিয়েভও এ উদ্যোগে সমর্থন দেবে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি মস্কো। এর মধ্যেই ইউক্রেনের জ্বালানি স্থাপনায় রুশ হামলার অভিযোগ তুলেছেন জেলেনস্কি।

ট্রাম্প দাবি করেছেন, রাশিয়া ও ইউক্রেন একটি ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতিতে’ সম্মত হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি তিনি। মার্কিন প্রেসিডেন্টের ঘোষণায় প্রথমে বিস্ময় প্রকাশ করেন জেলেনস্কি। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্যের অপেক্ষায় রয়েছেন ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা।

জেলেনস্কি বলেন, ইউক্রেন রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা বন্ধ রাখতে প্রস্তুত। একই ধরনের প্রস্তুতি রাশিয়ার কাছ থেকেও প্রত্যাশা করছে কিয়েভ। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সম্মতিও চেয়েছেন তিনি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।

ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই ইউক্রেনকে রাশিয়ার তেল অবকাঠামোতে হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে আসছেন। কিয়েভের মতে, এসব হামলার লক্ষ্য রাশিয়ার যুদ্ধ পরিচালনার অর্থের জোগান কমানো। অন্যদিকে, রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহের ওপর নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করে যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ববাজারে ডিজেল সরবরাহের সুযোগ তৈরি করতে চাইছে ট্রাম্প প্রশাসন।

রাশিয়ার জ্বালানি আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করার এই ডিজেল চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে সমালোচনা চলছে। জেলেনস্কি চুক্তিটিকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য ‘উপহার’ বলে অভিহিত করেছেন। ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের কয়েকজন সদস্যসহ যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক রাজনীতিবিদও চুক্তিটির বিরোধিতা করেছেন।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানির দাম কমানো ট্রাম্পের এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। এর আগে ইরানকেন্দ্রিক যুদ্ধের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় তাকে দীর্ঘ সময় চাপের মুখে থাকতে হয়েছে। ওই সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের, বিশেষ করে ডিজেলের দাম বেড়েছে। উচ্চ জ্বালানিমূল্য ও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির কারণে মার্কিন জনগণের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, যা ট্রাম্পের ভাবমূর্তিতেও প্রভাব ফেলেছে।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম বলেছেন, জ্বালানি খাতে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধবিরতি অবিলম্বে শুরু করার বিষয়ে ট্রাম্পের আহ্বানকে ব্রিটেন জোরালোভাবে সমর্থন করে। ফ্রান্স, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নও এ উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। তবে এর আগে রোববার যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং বিবিসিকে জানান, যুক্তরাজ্য বিষয়টি সমর্থন করে না। শনিবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাসও এ বিষয়ে জেলেনস্কির সমালোচনার সঙ্গে একমত হন।

জেলেনস্কি অভিযোগ করেছেন, ট্রাম্প জ্বালানি যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়ার পরও রাশিয়া কিয়েভের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এতে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দেয়। এরপর উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতেও হামলা চালানো হয় বলে দাবি করেন। জেলেনস্কি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জ্বালানি যুদ্ধবিরতি নিয়ে বিবৃতি দেওয়ার পরই এসব ঘটনা ঘটেছে।

গত কয়েক মাস ধরে রাশিয়া ও ইউক্রেন পরস্পরের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে আসছে। মস্কোর দাবি, ইউক্রেনের যেসব স্থাপনায় তারা হামলা চালিয়েছে, সেগুলো দেশটির সামরিক কার্যক্রমে সহায়তা করছিল এবং তাই বৈধ লক্ষ্যবস্তু। অন্যদিকে, রাশিয়ার ভূখণ্ডের গভীরে হামলাকে জেলেনস্কি রাশিয়ার যুদ্ধ পরিচালনার অর্থায়নের সক্ষমতা কমানোর প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এসব হামলায় উভয় দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে।

ডিজেল চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের আইনপ্রণেতাদেরও সমালোচনার মুখে পড়েছে। তিনজন ডেমোক্র্যাট ও চারজন রিপাবলিকানসহ সাতজন সিনেটর এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, ট্রাম্পের চুক্তি রাশিয়ার জ্বালানি আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপকারী আইনের ‘সরাসরি পরিপন্থী’।

সিনেটররা বলেন, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে আগ্রাসন বন্ধ এবং ন্যাটো মিত্রদের হুমকি দেওয়া থেকে বিরত না হওয়া পর্যন্ত রাশিয়া থেকে তেল আমদানি না করার বিষয়ে কংগ্রেসের অবস্থান স্পষ্ট। ট্রাম্প প্রশাসনকে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানান। ওই সাত সিনেটরের একজন রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিস এনবিসি নিউজকে বলেছেন, এই চুক্তি নিশ্চিতভাবেই মার্কিন নাগরিকদের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলবে।

শনিবার ট্রাম্প অভিযোগ করেন, ডিজেল চুক্তি নিয়ে সমালোচনা করার পরও রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলার অনুমোদন অব্যাহত রেখে জেলেনস্কি ‘বিশ্বের জন্য সমস্যা সৃষ্টি’ করতে চাইছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ইউক্রেনের জন্য এখন নতুন একজন প্রেসিডেন্ট পাওয়ার সময় হয়েছে।

জবাবে জেলেনস্কি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, রাশিয়া যদি ৬০ দিনের জন্য পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়, তবে তিনি ইউক্রেনে নির্বাচন আয়োজন করবেন। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে দেশটির সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন স্থগিত রাখার বিধান রয়েছে। এর আগে নতুন নির্বাচনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে জেলেনস্কি বলেছিলেন, সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্র ও রাশিয়ার দখলে থাকা এলাকায় ভোট আয়োজন করা অত্যন্ত জটিল। তবে ট্রাম্প বারবার অভিযোগ করে আসছেন, ইউক্রেনীয় নেতা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য যুদ্ধকে ব্যবহার করছেন।

এদিকে, চার বছর ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে স্থলভাগে হামলা ও লড়াই অব্যাহত রয়েছে। আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, রোববার ইউক্রেনের দুটি শহরে হামলায় ছয়জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া ইউক্রেন সীমান্তবর্তী রাশিয়ার বেলগোরোদ অঞ্চলে একজন এবং রাশিয়ার দখলে থাকা দোনেৎস্ক অঞ্চলে ড্রোন হামলায় আরেকজন নিহত হয়েছেন বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন