- Dainiksylhet.com - https://dainiksylhet.com -

ভাই-বোনের সম্পর্ক জীবনের মূল্যবান বন্ধন

ভাই-বোনের সম্পর্ক এমন এক সম্পদ, যা টাকা দিয়ে কেনা যায় না। শৈশবের স্মৃতি, মা-বাবার ভালোবাসা, একই পরিবারের পরিচয়—সবকিছু মিলিয়ে এই সম্পর্ক জীবনের অন্যতম মূল্যবান বন্ধন।

কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্ব, অর্থসম্পদ, নতুন পরিবার, ভুল-বোঝাবুঝি ও অহংকারের কারণে সেই সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যেতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে—একটি সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া খুব সহজ, কিন্তু তা জোড়া লাগানো অনেক কঠিন। তাই সামান্য অভিমানকে বছরের পর বছর বহন না করে, পুরনো হিসাব খুলে না বসে, কে আগে ভুল করেছে তা না গুনে সম্পর্ক রক্ষার জন্য এগিয়ে আসাই উত্তম। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। সুতরাং তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করে দাও এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমাদের প্রতি রহমত করা হয়।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১০)

১. আগে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে

সম্পর্ক বাঁচানোর জন্য অপেক্ষা করা যাবে না—‘সে আগে আসুক।’ বরং যে বেশি আল্লাহভীরু, সে আগে এগিয়ে যাবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী সে নয়, যে প্রতিদানস্বরূপ সম্পর্ক রক্ষা করে; বরং প্রকৃত আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী সে, যার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা হলেও সে সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৯৯১)

অতএব ভাই ফোন না করলে বোন ফোন করতে পারে, বোন অভিমান করলে ভাই নিজে গিয়ে কথা বলতে পারে। এতে কেউ ছোট হয় না; বরং আল্লাহর কাছে মর্যাদা বাড়ে।

২. ক্ষমা করতে শিখতে হবে

সব ভুলের জবাব ভুল দিয়ে দিলে সম্পর্ক কখনো সুন্দর হয় না। কিছু কথা ভুলে যেতে হয়, কিছু আচরণ ক্ষমা করতে হয়। আল্লাহ বলেন, ‘তারা যেন ক্ষমা করে এবং উপেক্ষা করে। তোমরা কি পছন্দ করো না যে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন?’ (সুরা : নুর, আয়াত : ২২) নিজে আল্লাহর ক্ষমা চাইলে অন্যের ভুল ক্ষমা করার মানসিকতাও তৈরি করা উচিত।

৩. সম্পদের বিষয়ে ন্যায়বিচার করতে হবে

ভাই-বোনের সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার অন্যতম কারণ যেহেতু সম্পদ, তাই সম্পদের ব্যাপারে শরিয়তের বিধান মেনে চলা অপরিহার্য। উত্তরাধিকার বণ্টনে কারো অধিকার নষ্ট করা যাবে না, গোপন করে সম্পদ আত্মসাৎ করা যাবে না এবং দুর্বল আত্মীয়ের ওপর প্রভাব খাটানো যাবে না। ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হলে অনেক পারিবারিক বিরোধের দরজাই বন্ধ হয়ে যায়।

৪. নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে

সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে বড় কোনো আয়োজন সব সময় প্রয়োজন হয় না। একটি ফোন, একটি খোঁজ, একটি সালাম, একটি ছোট্ট বার্তা—এসবই হৃদয়ের দূরত্ব কমাতে পারে। ব্যস্ততার মধ্যেও ভাই-বোনের খোঁজ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে মা ও বাবা মারা যাওয়ার পর ভাই-বোনের সম্পর্ক আরো যত্নের সঙ্গে ধরে রাখা প্রয়োজন। কারণ তখন পারিবারিক বন্ধনের অনেকটাই তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে।

৫. গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে

ভাই-বোনের মধ্যে ব্যক্তিগত অনেক কথা আদান-প্রদান হয়। সেই কথাগুলো অন্যের কাছে প্রচার করা উচিত নয়। কারো পারিবারিক দুর্বলতা, আর্থিক সমস্যা কিংবা ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা করলে বিশ্বাস নষ্ট হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুসলিমের ওপর মুসলিমের ছয়টি অধিকার রয়েছে…’—এর মধ্যে সালামের জবাব দেওয়া, অসুস্থকে দেখতে যাওয়া এবং কল্যাণ কামনা করার বিষয়ও রয়েছে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২১৬২)

ভাই-বোনের সম্পর্কেও এই কল্যাণকামিতা থাকা উচিত।

৬. সন্তানদেরও আত্মীয়তার সম্পর্ক শেখাতে হবে

আজকের শিশুরা যদি চাচা, ফুফু, মামা, খালা এবং কাজিনদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে শেখে, ভবিষ্যতে পারিবারিক বন্ধন অনেক বেশি শক্তিশালী হবে। শুধু নিজের সন্তানকে বড় করা নয়; তাকে আত্মীয়তার মর্যাদা, বড়দের সম্মান এবং ছোটদের স্নেহ করাও শেখাতে হবে।

৭. মতভেদ থাকবে, সম্পর্ক ছিন্ন করা যাবে না

ভাই-বোনের চিন্তা, মত, পেশা, জীবনযাপন—সবকিছু এক হবে, এমন নয়। মতভেদ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু মতভেদ যেন সম্পর্কচ্ছেদের কারণ না হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলিমের জন্য তার ভাইয়ের সঙ্গে তিন দিনের বেশি সম্পর্ক ছিন্ন করে থাকা বৈধ নয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬০৭৬, সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৬০)

তাই মতের অমিল থাকতে পারে, কিন্তু সালাম, খোঁজখবর ও আত্মীয়তার সম্পর্ক বন্ধ করা উচিত নয়।

অতএব ভাই-বোনের সম্পর্ক শুধু রক্তের সম্পর্ক নয়—এটি আল্লাহর দেওয়া এক আমানত। সম্পদের জন্য সম্পর্ক নষ্ট নয়, বরং সম্পর্কের জন্য সম্পদের ন্যায্য ব্যবহার; অভিমানের বদলে ক্ষমা; দূরত্বের বদলে যোগাযোগ; প্রতিশোধের বদলে ভালোবাসা—এ পথেই পরিবারে ফিরে আসতে পারে শান্তি ও বরকত।

যে ভাই-বোন আজ পরস্পরের কাছ থেকে দূরে সরে গেছেন, তাদের জন্য হয়তো একটি ফোনকলই হতে পারে নতুন শুরুর প্রথম পদক্ষেপ। আজই সেই পদক্ষেপটি নেওয়া যাক।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন