মানুষের জীবনের প্রকৃত সার্থকতা নিহিত থাকে তার কর্মে। ভালো কাজ শুধু ব্যক্তির উন্নতি সাধন করে না, বরং সমাজকেও আলোকিত করে। আজকের প্রতিযোগিতামূলক পৃথিবীতে অনেকেই স্বার্থপরতার পথে হাঁটে, কিন্তু যারা মানবতার কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত করে, তারাই সত্যিকার অর্থে অগ্রগামী। তাই প্রতিটি মানুষের উচিত সংকীর্ণতা ও দ্বিধা দূর করে ন্যায়, সততা ও মানবিকতার পথে এগিয়ে যাওয়া।
কেননা আমরা কেউই জানি না কখন, কোথায় ও কিভাবে আমাদের মৃত্যু হবে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যখন তাদের নির্ধারিত (মৃত্যুর) সময় উপস্থিত হয় তখন তারা আর এক মুহূর্তও বিলম্ব করতে পারে না এবং এর চেয়ে একটু এগিয়েও আসতে পারে না।’ (সুরা : ইউনুস, আয়াত : ৪৯)
প্রতিনিয়ত আমাদের সামনে কত মানুষ সামান্য সময়ের ব্যবধানে সারাজীবনের উপার্জন সহায়-সম্বল অর্থবিত্ত সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায়। চোখের পলকে আকস্মিক দুর্ঘটনায় হাত-পা হারিয়ে ফেলে।
কিন্তু তখন আর তার ভালো কাজ করার ইচ্ছা থাকলেও সেটা সম্ভব হয়ে উঠে না।তাই সময় থাকতেই ভালো কাজে অগ্রগামী হওয়া জরুরি।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘সাতটি বিষয়ের পূর্বে তোমরা দ্রুত ভালো কাজে অগ্রগামী হও। তোমরা কি এমন দারিদ্র্যের অপেক্ষা করছ, যা তোমাদের সবকিছু ভুলিয়ে দেবে? না ওই ঐশ্বর্যের, যা তোমাদের দর্পিত বানিয়ে ছাড়বে? নাকি এমন রোগের, যার আঘাতে তোমরা জরাজীর্ণ হয়ে পড়বে? না সেই বার্ধক্যের, যা তোমাদের অথর্ব করে ছাড়বে? নাকি মৃত্যুর, যা আকস্মিক এসে পড়বে? নাকি দাজ্জালের, অনুপস্থিত যা কিছুর জন্যে অপেক্ষা করা হচ্ছে, সে হচ্ছে সেসবের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট? না কিয়ামতের অপেক্ষা করছ, যে কিয়ামত কিনা সর্বাপেক্ষা বিভীষিকাময় ও সর্বাপেক্ষা তিক্ত? (তিরমিজি, হাদিস নং : ২৩০৬) তাই আমাদেরকে আজকের দান আজকেই করতে হবে।
আজকের ভালো কাজ আজকেই করতে হবে। আগামীকালের অপেক্ষায় রেখে দেওয়া যাবে না কিছুই। আল্লাহ তায়ালার ইরশাদ, ‘তোমরা তোমাদের প্রভুর পক্ষ থেকে ক্ষমা এবং এমন জান্নাতের দিকে দ্রুত ধাবিত হও, যার প্রশস্ততা হবে আকাশসমূহ ও জমিনসম। তা মুত্তাকিদের জন্যে প্রস্তুত করা হয়েছে।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৩৩)
আরেক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা কল্যাণকর কাজে প্রতিযোগিতা করো।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৪৮)
মহানবী (সা.) আমাদের শিখিয়েছেন, যখন যে অবস্থাতেই থাকো, ভালো কাজ করতে থাকো। ভালো কাজের জন্যে নিজের অবস্থা পরিবর্তনের অপেক্ষায় থাকা মূলত শয়তানের ধোঁকা। এ অপেক্ষায় যারা থাকে, নেক কাজের সুযোগ তাদের আর হয়ে ওঠে না। যারা মূলত ভাবে আর কিছুদিন পরই ভালো কাজ শুরু করবো, আসলে তারা মানুষের একটি স্বভাবজাত চাহিদার কথা ভুলে যান। মহানবী (সা.) বলেন, ‘আদমসন্তানের যদি দুই উপত্যকা ভর্তি সম্পদ থাকে, তাহলে সে তৃতীয় আরেকটি তালাশ করবে। আদমসন্তানের পেট তো (কবরের) মাটি ছাড়া আর কিছুই ভরিয়ে দিতে পারবে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৬৪৩৬)
তাই অঢেল টাকা-পয়সা উপার্জন করার পর আল্লাহ তাআলার বন্দেগিতে মনোনিবেশ করার যে প্রতীক্ষা, তা শুধুই শয়তানের ধোঁকা। অল্প সম্পদ হাতে নিয়ে যে আল্লাহকে ডাকতে পারে না, সম্পদ বেশি হলে তার ইবাদত করার সুযোগ কোথায়? তখন তো বরং সম্পদের নেশা বেড়ে যাবে আরও বহুগুণে। তাই কমবেশি সম্পদ এখনই ভালো কাজে মনোনিবেশ করা জরুরি।
অনেকে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যৌবনে হজ করে না, পাছে আবার হজের পর গোনাহ হয়ে যায় কি না। তাই হজ করার জন্যে তারা বার্ধক্যকেই বেছে নেয়, যেন তখন একনাগাড়ে শুধু আল্লাহর ইবাদত করা যায়। তাদের উদ্দেশ্যে মহানবী (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহ তাআলার আরশের ছায়া ব্যতীত অন্য কোনো ছায়া থাকবে না, তখন সাত প্রকারের মানুষ সেই আরশের ছায়ায় স্থান পাবে। তাদের একজন হল, ‘এমন যুবক, যে তার প্রভুর ইবাদতে বেড়ে উঠেছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৬৬০)
সুতরাং ভালো কাজ বিলম্ব করা কোন বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তাই যখন যতটুকু সম্ভব ভালো কাজ করে নিতে হবে। আজকের সুযোগ আজকেই কাজে লাগাতে হবে। আগামীকালের অপেক্ষায় থেকে এ সুযোগ নষ্ট করা যাবে না। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘দুটি নেয়ামত এমন, যাতে অনেক মানুষই ধোঁকায় পড়ে আছে-সুস্থতা ও অবসর।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৬৪১২)
অতএব, দ্রুত ভালো কাজে অগ্রগামী হওয়া একজন মানুষের পরিচয়। এটি সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে এবং অন্যদেরও সৎ পথে চলতে অনুপ্রাণিত করে। আমাদের ছোট ছোট ভালো কাজই একদিন বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। তাই আসুন, আমরা সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভালো কাজে এগিয়ে এসে একটি সুন্দর ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলি।
